অসিত বিশ্বাস বললেন (নামটা একটু আগে জেনেছি)–না, না, কবি নই। তবে ঈশ্বরের এই অদ্ভুত সৃষ্টির বৈচিত্র্য দেখতে ভাল লাগে–
তারপর কথার গতি পরিবর্তন করে বললেন–আপনারা কি কালই কাজের জায়গায় যাচ্ছেন? যান, ভাল লাগবে, খুব সুন্দর জায়গা–
—সুন্দর বলতে কী অর্থে? আপনি গেছেন সেখানে?
—অনেকবার। এখান থেকে কাঠ-ব্যবসায়ীদের লরি যায়, তাতে চড়েই গিয়েছি। সুন্দর মানে রামরেখা পাহাড়ের রূপ দেখলে আপনারা মোহিত হয়ে যাবেন। নিবিড় জঙ্গল পাহাড়ের ঢালুতে, কোথাও জনমানব নেই, এত নিস্তব্ধ পরিবেশ যে পাতা খসে পড়ার শব্দ শুনতে পাবেন। সারাজীবন ধরে গল্প শোনাবার মত জায়গা–
মেজকর্তা একটু কী ভেবে বললেন—অসিতবাবু, আপনিও কাল চলুন না আমাদের সঙ্গে। প্রিয় জায়গায় আপনারও আর একবার বেড়ানো হয়ে যাবে, আমরাও একজন ভাল ভ্রমণসঙ্গী পাব। যদি খুব জরুরী কাজ না থাকে তাহলে–
অসিতবাবুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বোঝা গেল বেড়াতে যাবার আমন্ত্রণ পেয়ে তিনি খুশি হয়েছেন। আমি বললাম–চলুন না, আমার তাবুতে দুজনে ভাগাভাগি করে থাকা যাবে–
অসিতবাবু বললেন—বেশ তো, তাই হবে তাহলে। সামনের দু-দিন ইস্কুল ছুটি আছে, দরকার হলে আরও বাড়িয়ে নেওয়া যাবে। ছুটি তো নেবার দরকার হয় না, জমে জমে পচে যাচ্ছে—
আমি মনে মনে পুলকিত হয়ে উঠলাম। মেজকর্তা আর সার্ভেয়ার সাহেব দুজনেই লোক ভাল, আমার সঙ্গে অত্যন্ত দ্র ব্যবহারও করছেন। কিন্তু হাজার হলেও তারা আমার ওপরওয়ালা, একেবারে খোলা মনে কাঁধে হাত রেখে কথাও বলা যায় না, পুরোপুরি সহজ হতেও বাধোবাধো ঠেকে। বিশ্বাসবাবু কবিপ্রকৃতির লোক, মাস্টারমশাই—ইনি সহজেই বন্ধু হতে পারবেন।
–কাল কখন রওনা হচ্ছেন আপনারা?
মেজকর্তা বললেন—সকাল আটটা নাগাদ। আপনি সাতটায় চলে আসুন, একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট খেয়ে বেরুনো যাবে–
অসিতবাবু সম্মতি জানিয়ে যাবার জন্য উঠলেন। বললাম চলুন, আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।
অসিতবাবু হেসে বললেন–আমাকে? আপনি তো এখানে নতুন লোক, ফেরবার সময় আবার আপনাকে পৌঁছে দিতে আমাকে না আসতে হয়। তা চলুন, মন্দ কী? টর্চ নিয়ে নেবেন একটা, ফেরবার সময় পুরোপুরি অন্ধকার নেমে আসবে।
গোধূলির শেষ পর্যায়। পশ্চিম আকাশ থেকে সূর্যাস্তের রঙ প্রায় মিলিয়ে গিয়েছে। পাশ রাস্তায় উঠে কিছুদূর হেঁটে আবার বাঁদিকের কাচা পথে নামলেন বিশ্বাসবাবু। ওদিক থেকে কে যেন আসছে আমাদের দিকে, সাদা আলখাল্লার মত পোশাক পরা, লম্বা-চওড়া মানুষ। কাছে আসতে অসিতবাবু হাতজোড় করে বললেন-নমস্কার ফাদার। ভাল আছেন?
এবার বুঝলাম মানুষটি বিলিতি সাহেব, প্রায় সাড়ে ছ-ফিট লম্বা। পরণে ক্রীশ্চান ধর্মযাজকের পোশাক। তিনি নমস্কার করে বললেন—ভাল আছি। ইনি কে?
আলাপ করিয়ে দিয়ে অসিতবাবু বললেন—ইনি কলকাতা থেকে মাসখানেকের জন্য এসেছেন অফিসের কাজে, উঠেছেন নাথমল শরফের বাংলোতে। আর ইনি হচ্ছেন ফাদার ও’ব্রায়েন, এখানকার সেন্ট বার্থোলোমিউ ক্যাথলিক চার্চের যাজক–
—যাজক বোলো না, বিশ্বাস, যাজক বোললা না। বল ঈশ্বরের কর্মী–
ও’ব্রায়েনের কণ্ঠস্বর মৃদু এবং ব্যক্তিত্ব-উষ্ণ। তিনি বললেন—আচ্ছা, চলি। আবার দেখা হবে।
হাঁটতে শুরু করে টর্চ জ্বালতেই পথের একপাশে চোখ পড়ে আমার মুখ দিয়ে বিস্ময়সূচক একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল। সেদিকে তাকিয়ে অসিতবাবুও বলে উঠলেন—আরে! এটা কী?
রাস্তার ঠিক ধারেই একটা ছাতারে পাখি মরে পড়ে আছে!
ও’ব্রায়েন আমাদের কথা শুনতে পেয়ে আবার ফিরে এলেন। কী হল? কী হয়েছে? তারপর টর্চের আলোকবৃত্তির মধ্যে মরা পাখিটাকে দেখতে পেয়ে বললেন-আঃ, পুওর ক্রিয়েচার! বেশিক্ষণ না, একটু আগেই বেচারা মারা পড়েছে—
বললাম-কী করে বুঝলেন ফাদার?
ও’ব্রায়েন বললেন-বেশি আগে হলে কুকুরে কিম্বা শেয়ালে টেনে নিয়ে যেত। পাখির মৃতদেহ দেখলে আমার বড় খারাপ লাগে। জানেন, আমরা যারা ক্রীশ্চান ধর্মে দীক্ষিত, তারা পাখিদের দেবতার দূত বলে মনে করি। উইং অ্যাঞ্জেল–
এটা অবশ্য জানতাম না। বললাম-তাই নাকি?
-হ্যাঁ। সেন্ট ফ্রানসিস অফ আসিসির কথা জানেন তো? যাঁর নামে ব্রাদারহুড অফ দি ফ্রানসিসকান অর্ডার গড়ে উঠেছিল? তাঁর মৃত্যুর সময় পাখির দলের ছদ্মবেশে দেবদূতরা এসেছিলেন তাঁর আত্মাকে স্বর্গে নিয়ে যেতে। পাখি মারা গেলে আমার বড় খারাপ লাগে–
বললাম—এখানে কিন্তু খুব পাখি মরছে। কোনো রোগ বা কিছু ওদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েনি তো?
অসিতবাবু সকালে জলধরের সঙ্গে আমাদের আলোচনার ব্যাপারটা জানতেন না। তিনি অবাক হয়ে বললেন—আপনি কী করে জানলেন? আপনি তো আজ এসেছেন–
—আজ সকালে জলধর বলছিল। আমরা যেখানে আছি, সেই বাড়িটার পেছনের বাগানে, বেরুবার গেটের সামনে নাকি পরপর দুদিন দুটো মরা পাখি পাওয়া গিয়েছে মা আমার কথা শুনে ফাদার ও’ব্রায়েন কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন—তার মানে এটা নিয়ে তিনটে হল। আরো হয়ত এদিক-ওদিক মরেছে, আমাদের কাছে খবর নেই। ভেরি, ভেরি ব্যাড ওমেন! জানতাম না এমন শুরু হয়েছে–
অসিতবাবু বললেন—আপনি কি এর আগে এরকম ঘটতে দেখেছেন?
—দেখেছি, একবার। বছর দশ-বারো আগে। তারপরেই স্মল-পক্সের মহামারী শুরু হয়। মনে আছে সেই এপিডেমিকের কথা? তখন তো আপনি এখানে এসেছেন–
