বিশ্বাসবাবু বললেন-মনে আছে। কিন্তু এপিডেমিকের আগে পাখি মরার ব্যাপারটা জানতাম না!
ফাদার বললেন—যাই হোক, ঈশ্বর সব দুর্যোগ কাটিয়ে দেবেন। অপশক্তি যত বড়ই হোক, ঈশ্বরের শুভশক্তি তার চেয়েও বড়। আমি আজ থেকেই প্রার্থনা করব সকলের ভালোর জন্য–
ফাদার লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে শুরু করলেন। তাঁর দীর্ঘ চেহারা টর্চের সংক্ষিপ্ত আলোকবৃত্তের বাইরে মিলিয়ে এল। একটু এগিয়েই অসিতবাবুর বাড়ি, ভদ্রলোক বললেন—আসুন না ভেতরে, একটু বসে যান—
—নাঃ, আজ নয়। একটু কাজকর্ম বুঝে নিতে হবে কালকের জন্য। পরে একদিন বরং–
বাংলোতে ফেরবার পথে মনের ভেতর সকালের সেই প্রফুল্ল ভাবটা আর খুঁজে পেলাম না।
রাত্তিরে ভালই ঘুম হল। আলো ফোটবার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম ভেঙে বাইরের বারান্দায় এসে দেখলাম, কোথাও আশঙ্কার কোনো কালো ছায়া নেই, সব ঝকঝক করছে সকালের আলোয়। সার্ভে করার জিনিসপত্র, কুলিদের হাতিয়ার, আমাদের বাক্স-বিছানা, সবার জন্য রসদপত্র আর কুলিরা যাবে বলে এবার জিপের সঙ্গে একটা লরিও যাচ্ছে। কুলিদের মধ্যে কিছু আগে চলে গিয়েছে, কিছু পথে একটা গ্রাম থেকে উঠবে। লরি এর মধ্যেই এসে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ডহরু আর হলধর মিলে মালপত্র তুলছে। বেশ একটা সাজো সাজো ভাব।
স্নান সেরে বারান্দায় এসে দেখি মেজকর্তা আর সার্ভেয়ার সাহেবও তৈরি। ডহরু পুরি আর আলুর তরকারির থালা এনে টেবিলে রাখছে। আমাকে দেখে মেজকর্তা বললেন— আসুন, বসে যান। একেবারে হাতে-গরম পুরি। এই তো অসিতবাবুও এসে গিয়েছেন–
সবাই মিলে ব্রেকফাস্ট খেয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। কাঁটায় কাঁটায় আটটায় রওনা হওয়া গেল।
জিপ আগে চলেছে, পেছনে লরির। কারণ লরি আগে গেলে যে পরিমাণ লাল ধুলো উড়বে, তাতে প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে, জামাকাপড়ের কথা বাদই দিলাম।
অসিত বিশ্বাস বললেন—যেখানে আমরা যাচ্ছি, সেই রামরেখা জায়গাটা বিহার, উড়িষ্যা আর মধ্যপ্রদেশের সীমান্ত ছুঁয়ে আছে। একটা ঝরণা আছে খুব সুন্দর, অবশ্য এখন তাতে কতটা জল আছে জানি না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে জঙ্গলে ঘুরবেন, ভাল লাগবে।
রাস্তা কখনো উঠছে, কখনো নামছে। এক জায়গায় একটা তিনমাথার মোড়, আমরা সোজা চললাম। বিশ্বাসবাবু বললেন—বাঁদিকের পথটা গিয়েছে ছিন্দা নদীর ধারে কোঘাঘ নামে একটা জায়গায়। ছোট্ট নদী, কিন্তু বর্ষায় তার ভয়ঙ্কর রূপ হয়। পাহাড়ে বৃষ্টি হলে নদীতে ফ্ল্যাশ ফ্লাড আসে। নিয়ে যাব এখন আপনাকে একদিন।
—আর ডানদিকের পথ কোথায় গেল?
-ওটা আবার ঘুরে শহর ছাড়িয়ে কোলেবিরার কাছে রাঁচি যাবার পাকা রাস্তায় পড়েছে। কোলেবিরা থেকে আপনি গুগুমলা, লোহারডাগা হয়ে রাঁচি যেতে পারেন, কিম্বা খুঁটি হয়েও যেতে পারেন। তবে খুঁটিত হয়ে গেলে রাস্তা অনেকটা কম পড়লেও ওদিকে আজকাল নানা গোলমাল চলছে বলে সবাই ঘুরপথেই রাঁচি যায়।
—কী গোলমাল?
—ওদিকে মুন্ডারা বিদ্রোহ করেছে। বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে তারা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। পরিবেশ ঠাণ্ডা থাকলে ওই পথে আপনাকে কোয়েল নদী দেখিয়ে আনতাম।
মাইল দশ-বারো গিয়ে সাম পাহাড়টোলি নামের একটা গ্রামে জিপ আর লরি থামল। এখান থেকে কুলিরা উঠবে। জলধর পথের পাশের গ্রাম থেকে তাদের ডেকে আনতে গেল।
আমি জিপের পেছন দিয়ে নেমে হালকা হবার জন্য পথ থেকে জঙ্গলে ঢুকলাম। বিশ্বাসবাবু ডেকে বললেন—কোথায় চললেন, ও মশাই?
পেছন ফিরে হেসে বাঁ হাতের কড়ে আঙুলটা দেখালাম।
কয়েক পা হেঁটেই চোখে পড়ল একটা শালগাছের গোড়ায় পড়ে থাকা দুটো মরা ঘুঘু।
১৪. সকালের আলো হঠাৎ যেন নিভে এল
সকালের আলো হঠাৎ যেন নিভে এল চারপাশে। নতুন কাজে নতুন জায়গায় যাচ্ছি, মনে কত আনন্দ নিয়ে বেরিয়েছিলাম। মনের ভেতরে একটা খোলা ছাতা কে যেন স্প্রিং টিপে বন্ধ করে দিল। ফাদার ও ব্রায়েনের আশঙ্কাই কি তাহলে সত্যি? অমঙ্গলজনক কিছু ঘটতে চলেছে অদূর ভবিষ্যতে?
ফিরে এসে নিজে উঠে বসলাম। কুলিরাও উঠছে লরিতে। অসিতবাবু যেন কেমনভাবে তাকিয়ে আছেন আমার মুখের দিকে। ভেতরের অশান্তি বোধহয় মুখেও ফুটে উঠেছে কিছুটা। কিন্তু উনি বুদ্ধিমান মানুষ, সকলের সামনে কোনও প্রশ্ন করলেন না। বাকি পথ পার হতে লাগল গাড়ি।
মানুষের মন বিষণ্ণ হয়ে থাকতে ভালবাসে না। দুঃসময় কাটিয়ে ওঠার জন্য মনের একটা নিজস্ব স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি আছে। প্রকৃতির যে আশ্চর্য সৌন্দর্যের প্রকাশ দেখতে দেখতে চলেছি তা অচিরেই আশঙ্কার মেঘ কাটিয়ে স্নিগ্ধ প্রফুল্লতা ফিরিয়ে আনল। একটা মজার ঘটনাও ঘটল প্রায় তক্ষুণি।
দু’দিকে ঘন বন, তবে ঝোপঝাড় কম, বড় বড় গাছই বেশি। মাঝখান দিয়ে মোরাম ছাওয়া লাল রাস্তা বেয়ে গাড়ি চলেছে। হঠাৎ ডানদিকের ঢালু জমি থেকে বড় বড় গাছের ফঁক দিয়ে বেরিয়ে এল একটা বিশাল হরিণ। আকারে মোষের বাচ্চার চেয়েও বড়। মাথার দু’দিক দিয়ে শাখা-প্রশাখাওয়ালা গাছের মত শিং উঠেছে। হরিণটা বোধহয় ঢালু জমি বেয়ে দ্রুত নেমে আসছিল, যখন জিপটা দেখতে পেল তখন তার আর গতি সংযত করবার উপায় নেই—হুড়মুড় করে রাস্তায় এসে উঠল। ড্রাইভার ব্রেক কষল প্রাণপণে, খানিকটা চাকা ঘষটে থামল গাড়ি। আমরা হুমড়ি খেয়ে এ ওর গায়ে পড়লাম। মেজকর্তার কপাল ঠুকে গেল উইন্ডস্ক্রিনে।
