—আবার! কোথায় দেখলি?
সকালবেলা সবজি তুলতে বাগানে গিয়েছিলাম। খিড়কির দরজার একেবারে সামনে মরে পড়েছিল। আমি তুলে বেড়ার বাইরে ফেলে দিয়েছি–
—কী পাখি? সেদিনের মত কাক?
—না, শালিক। দু-চারটে পালকও ছেড়া ছিল। সব গুছিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছি।
—আচ্ছা, যা এখন তুই। ডাল, ভাজি আর আন্ডার ঝোল হবে দুপুরে—
ডহরু চলে গেলে মেজকর্তা বললেন—এই পাখি মরার ব্যাপারটা কী জলধর?
—আইজ্ঞাঁ, কিছু না। পরশুদিন বাড়ির ফটকের সামনে একটা কাক মরে পড়েছিল। আর আজকে নাকি একটা পেছনের বাগানে পেয়েছে। ও কিছু না বাবু, বেড়াল-কুকুরে কামড়ে মেরেছে আর-কি। পালক ছেড়া ছিল শুনলেন তো–
কথাটা সেইখানেই তখনকার মত চাপা পড়ে গেল। কিন্তু কেন যেন এই ধরনের কী একটা ব্যাপার আমি আগে শুনেছি। সেখানে এমনই মরা পাখি দিয়ে একটা ভয়ঙ্কর অমঙ্গলের পর্ব শুরু হয়েছিল। কোথায়? কোথায়?
তারপরেই বিদ্যুচ্চমকের মতো মনে পড়ে গেল তারানাথের কাছে শোনা সেই মাকালীর কৌটোর গল্প। সেখানেও চণ্ডিকাপ্রসাদ মিত্রের বাড়িতে ঢোকবার পথে মরা চড়ুই পাখি দেখে তারানাথ ভাবী অমঙ্গলের আভাস পেয়েছিল। অবশ্য–
অবশ্য সর্বদাই কোথাও পাখি মরলে সেখানে খারাপ কিছু ঘটবে এমন মনে করাটা যুক্তিসিদ্ধ নয়। পাখি তো মরেই, নইলে সমস্ত পৃথিবী পাখিতে ভরে যেত না!
কিন্তু যতই ভোলবার চেষ্টা করি না কেন, মনের কোণে চিন্তাটা রয়েই গেল। কাক বা শালিক খুব চতুর পাখি, হঠাৎ তাদের ওপর লাফিয়ে পড়ে পালক ছিঁড়ে মেরে ফেলা বেশ কঠিন কাজ।
মেজকর্তা বললেন—নির্মলবাবু, আজকের দিনটা আমরা ছুটি করি, কেমন? সকলেই ক্লান্ত, নতুন জায়গায় এসে খাপ খাইয়ে নিতেও একটু সময় লাগে। আজ শুয়ে বসে কাটিয়ে কাল থেকে কাজ শুরু করা যাবে। জলধর, যে সাইট সার্ভে হবে সেটা এখান থেকে কতদূর?
—ছাব্বিশ মাইল আই। জিপে একঘণ্টা। পাহাড়ি পথ—
–সেখানে লোজন, তবু এসব পাঠাবার কী ব্যবস্থা করেছ? কাল আমরা সাইট দেখতে যাব, পরশু বা তার পরের দিন থেকে তো গিয়ে সেখানে বাস করতে হবে
–সব ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে। তিনদিন আগে তোক পাঠিয়ে দিয়েছি, তারা জঙ্গল কেটে সাফ করে তাঁবু খাটিয়ে রাখবে। ইচ্ছে করলে কাল থেকেই থাকতে পারেন–
মেজকর্তা বললেন—দেখি।
সারাটা দিন আলস্যে কেটে গেল। বাড়িটায় পাঁচ-ছখানা ঘর, আমি একটা আলাদা ঘর পেয়েছি। কলকাতার মেসে চারসিটের ঘরে থাকার পর এটাও আমার কাছে বড় বিলাসিতা। দুপুরে খাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, যখন উঠলাম তখন রোদুর পড়ে এসেছে। জলধর পণ্ডা এসে বলল—বাইরের বারান্দায় চা দিয়েছি বাবু। আর বিশ্বাসবাবু এসেছেন আপনাদের কথা শুনে। আসুন বাবু–
চায়ের টেবিলের পাশে আর একখানা বেতের চেয়ার বাড়তি পাতা, তাতে ধুতিপাঞ্জাবি পরা একজন সৌম্য চেহারার মানুষ বসে আছেন। বয়েস বছর পঞ্চাশেক হবে, কিন্তু চেহারায় প্রৌঢ়ত্ব শুরু হবার বিশেষ কোনো ছাপ পড়েনি, রগের পাশে দু-একগাছা পাকা চুল ছাড়া। চোখের চাউনিতে বিবেচনার প্রকাশ।
মেজকর্তা বললেন—এই যে, আসুন। ইনিই হচ্ছেন বিশ্বাসবাবু, যাঁর কথা আজ জলধর সকালে বলছিল। এখানকার ইস্কুলের ইংরিজির মাস্টারমশাই—
নমস্কার এবং প্রতিনমস্কারের পর বসলাম।
বাইরের প্রান্তরে আর অরণ্যে একটু একটু করে দিনাবসানের ছায়া নামছে। সকাল আর দুপুরের ঝকঝকে আলোয় যে জায়গাটা উজ্জ্বল, কবিত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছিল, এখন তারই ওপরে যেন কেমন একটা স্লান বিষণ্ণতা নেমে আসছে। কলেজজীবন থেকে কলকাতার জাঁকজমক আর বিদ্যুতের আলোর মধ্যে বাস করে অভ্যেস, সন্ধের মুখে সিমডেগার রূপ মনকে একটু দমিয়ে দিল। দুপুরে খাওয়ার সময় জলধরকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছি শহরে এখনো বিদ্যুৎ আসেনি, দু-একজন ধনী ব্যবসায়ী পরিবার জেনারেটর চালিয়ে নিজেদের বাড়িতে ইলেকট্রিক আলো জ্বালায়।
বিশ্বাসবাবু বেশ অমায়িক আর মিশুকে মানুষ। চা শেষ করে টেবিলে কাপ নামিয়ে রেখে বললেন—অরিজিনালি আমার বাড়ি মেদিনীপুর জেলায়। পানিপারুল নাম শুনেছেন? সেই পানিপারুলে আমার জন্ম হয়। এগরা নয়তো রামনগর দিয়ে যেতে হয়। কলকাতায় রিপন কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়ে এখানে কাজ নিয়ে চলে আসি। এক আত্মীয় ব্যবসার সূত্রে সিমডেগায় যাতায়াত করতেন, তিনিই যোগাযোগ করিয়ে। দিয়েছিলেন। তখন স্কুল নতুন হয়েছে, শহরেরও পত্তন হয়েছে সবে। সামান্য কিছু বাড়িঘর, দোকানপাট—এই। তারপর রাঁচি জেলার সাবডিভিশন হওয়ার পর থেকে চটপট বসতি গড়ে উঠল, ব্যবসা জেঁকে উঠল—
নির্মলবাবু জিজ্ঞেস করলেন—এখানে বেশ মন বসে গিয়েছে আপনার?
—তা গিয়েছে। এখন তো এই আমার দেশ, ঘরবাড়ি—
–কেন, মেদিনীপুরে আপনার বাড়িতে কেউ নেই এখন?
—কেউ না। বাবা-মা মারা গিয়েছেন, ভাই গুজরাটে চাকরি করে আজ বিশবছর, তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই বললেই চলে। ব্যস, দেশের সঙ্গে সম্পর্ক মিটে গিয়েছে। তাছাড়া কী জানেন, হৈ-হট্টগোল থেকে দূরে থাকতে থাকতে একটা অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। এই বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত নির্জনতা আর পাখির ডাক-মানুষের আদি বাস তো এর মধ্যেই ছিল, তাই না? সেকথা যখন ভাবি তখন কোনো কষ্ট হয় না–
মেজকর্তা নিজে একটু ভাবুক ধরনের মানুষ, বিশ্বাসবাবুর কথাগুলো বোধহয় তার ভাল লাগল। তিনি বললেন—বাঃ, আপনি তো দেখছি রীতিমত একজন কবি! সুন্দর বলেছেন–
