বললাম—এই ঘরে শান্তি বলে একজন থাকত, এই স্কুলের দারোয়ান। অনেকদিন আগের কথা বলছি। সে এখন কোথায় থাকে বলতে পারেন?
কাঁচাপাকা দাড়িওয়ালা সেই বুড়ো অবাক হয়ে একটু তাকিয়ে থেকে বলল—আমিই তো শান্তি!
ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম, হ্যাঁ, ছোটবেলায় যে শান্তিকে দেখেছি অনেকটা মিল আছে তার সঙ্গে। কিন্তু জরা তার পূর্বের চেহারাকে গ্রাস করেছে। শান্তি বলল–আপনি কে বাবু? আমাকে কেন খুঁজছেন?।
বললাম—আমি এই স্কুলে অনেকদিন আগে পড়তাম। তুমি টিফিনের সময় লুচি ভাজতে, মনে আছে? লুচি খাবার জন্য পয়সা জমিয়ে রাখতাম। ওঃ, তুমি বড্ড বুড়ো হয়ে গেছ শান্তিদা–
শান্তি হেসে বলল—তা হব না? বয়েস পঁচাত্তর হল। তোমার নাম কী খোকাবাবু?
নাম বললাম, আমাদের ব্যাচের দু-একজন ছেলের নাম বললাম। সে ভাল চিনতে পারল না। কিন্তু পুরনো ছাত্র মনে করে দেখা করতে এসেছে, এতেই সে ভারি খুশি। আর চাকরির বয়েস নেই, কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ ভালবেসে পুরনো দুটো ঘরের মধ্যে একটায় তাকে থাকতে দিয়েছে। সেখানেই বাকি জীবনটা সে কাটিয়ে দেবে। আমাকে সে আবার যেতে বলেছিল। আর যাওয়া হয়নি।
বিরমিত্রাপুর এসে গেল। গরম কচুড়ি আর জিলিপি পেট ভরে খেয়ে আবার পথে। গাড়িতে ওঠবার আগে নির্মলবাবুর মতই মেজকর্তাও বললেন—শুনুন ভাই, বাইরে কাজ করতে এসেছি, এখানে আর অফিসের ফর্মালিটি টেনে আনবেন না। সিগারেট খেলে ধরিয়ে ফেলুন—
সিগারেট ধরিয়ে গাড়িতে উঠলাম। পথের দুধারে প্রান্তর, কোথাও শ্যামল শোস্তীর্ণ, কোথাও প্রস্তরময়। কখনও বা নিবিড় বনভূমি, তার মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে আঁকাবাঁকা পাহাড়ী নদী। পথ কখনও চড়াই ভেঙে উঠছে, কখনও আবার নেমে আসছে সমতলে। এই আশ্চর্য সুন্দর পরিবেশের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি কী অদ্ভুত অভিজ্ঞতা আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আমার হবে।
পরের এক সপ্তাহের ভেতরেই উপলব্ধি করেছিলাম, তারানাথ আমার জীবনের সঙ্গে কতখানি জড়িয়ে গিয়েছে।
যাক, যেভাবে ঘটেছিল সেভাবেই ঘটনাটা বলি।
১৩. সিমডেগা একটি প্রায় ঘুমন্ত নির্জন শহর
সিমডেগা একটি প্রায় ঘুমন্ত নির্জন শহর। ছাড়া ছাড়া কিছু বাড়িঘর কয়েকটা সরকারি অফিস, কিছু দোকানপাট, একটা ইস্কুল—এই নিয়ে পুরো জনপদ। মূল নগরসীমানার বাইরে আরণ্য পরিবেশে হো, ওরাওঁ বা মুন্ডাদের গ্রাম। একটিই মাত্র পাকা রাস্তা শহরের মাঝখান দিয়ে রাঁচির দিকে চলে গিয়েছে। এই রাস্তারই অপর প্রান্ত দিয়ে আমরা সিমডেগায় ঢুকলাম।
সামান্য এগিয়ে বাঁদিকে একটা মোরামে ঢাকা পথে ঢুকল গাড়ি। পথের দুপাশে বেগুনি-সাদা-কমলা ফুলওয়ালা পুটুস গাছের ঝোপ। পাহাড়ি অঞ্চলের একটা বিশিষ্ট প্রভাতী আমেজ আছে, কড়া রোদ্র উঠে তা এখনো নষ্ট হয়নি। রাস্তার ধারে টালিছাওয়া পাকা দেওয়ালের একখানা বাংলো প্যাটার্নের বাড়ির সামনে এসে আমরা থামলাম। জলধর তাড়াতাড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে হাতজোড় করে গৃহস্বামীর মত সবাইকে বলল—আসুন। বাবুরা, আসুন। থাকার ঘর সব এদিকে, ওদিকে রান্নাঘর, গোসলখানা আর ভাড়ার। আসুন–
আধঘণ্টার মধ্যে পোশাক বদলে হাতমুখ ধুয়ে তিনজনে এসে বসলাম বারান্দায় পাতা চেয়ারে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এসে গেল গরম চা। কোম্পানি কাজের কোনও অসুবিধা যাতে না হয় তার জন্য রান্নার লোক, ঘরদোর পরিষ্কার বা বাজার করার কর্মী সব নিয়োগ করে রেখেছে। নিজের বাড়ি গ্রামে, থাকি কলকাতার মেসে, তার তুলনায় একে রাজকীয় আরাম বলা যেতে পারে। কাজ করি বিলিতি মার্কেন্টাইল ফার্মে মধ্যমবগীয় করণিকের পদে, সেটা এমন কিছু গৌরব করে বলে বেড়াবার মত কিছু নয়। কিন্তু সদর দপ্তরের বাঁধাধরা নিয়মনীতির বাইরে এখানে এসে এই প্রথম চাকরির একটা স্বস্তিজনক মৃদু আরাম অনুভব করলাম। বাংলোবাড়ির বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে চা খাচ্ছি, দুজন ওপরওয়ালার সঙ্গে সমানে সমানে আচরণ করছি, কাছে-দূরে শাল-সেগুনের সারি, নীলচে পাহাড়শ্রেণী। আঃ! সুখের আর কী বাকি রইল!
জলধর পণ্ডার পেছনে যে লোকটি ট্রে-তে করে চা নিয়ে এসেছিল, সে বিনীত মুখে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। মেজকর্তা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন-তোমার নাম কী?
লোকটির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলল—আমার নাম ডহরু লোহার।
বাঃ, বেশ। তুমি অনেকদিন আছ এখানে?
—আজ্ঞে, বাপ-পরদাদার সময় সময় থেকে আছি। বহুদিন হল–
জলধর বলল-এরা সব স্থানীয় লোক বাবু। চারদিকে সব পাহাড় দেখছেন না? ওই পাহাড়ের ভেতরে অনেক গ্রাম আছে। এরা সেই গ্রামে থাকে। তুমি তো মুন্ডা, না ডহরু?
ডহরু বলল—আজ্ঞে হ্যাঁ–
তার কথায় হিন্দি বাংলা ওড়িয়া এবং আমাদের অপরিচিত-সম্ভবতঃ মুন্ডারি ভাষার–মিশ্র একটা টান। জলধরকে জিজ্ঞাসা করলাম—এখানে কি বাঙালীও আছে নাকি?
–আইজ্ঞাঁ, আছে কয়েক ঘর। সবকারি অফিসে কাজ করে। আর আছে বিশ্বাসবাবু, এখানকার ইস্কুলের মাস্টারমশাই। খুব ভাল লোক, আলাপ হয়ে যাবে আস্তে আস্তে—
ভারতের যে কোনো দুর্গম প্রত্যন্ত প্রদেশের মতই সিমডেগাতেও কিছু বাঙালী এসে বাস করছে বুঝতে পারলাম। তাদের সংস্পর্শে এসে ডহরুর ভাষায় বাংলার টান লেগেছে।
চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, কাপ-ডিশগুলো আবার ট্রে-তে তুলে চলে যেতে গিয়ে হঠাৎ ফিরে দাঁড়িয়ে ডহরু বলল—জলধরদা, আজ সকালে আবার একটা মরা পাখি দেখলাম–
