কিন্তু কী আশ্চর্য, লোকটার হাত তো কই নড়ল না। তার বদলে নড়ল কেবল ঠোঁট দুটো। সেই ঠোঁট দিলাওয়ার খানের একেবারে কানের কাছে নিয়ে এসে লোকটা জিগ্যেস করল মোলায়েম করে, ‘খান সাহেব, মাল-টাল লাগবে?’
‘আখো! কিসের মাল! কেমন মাল।’ কিছুতেই বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করল দিলাওয়ার। ‘খান সাহেব, যেমন বলবেন, তেমনি মাল। একেবারে টাটকা মাল। কাশ্মিরি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, হিন্দুস্তানি, বাঙালি, পাঠান মাল, পাহাড়ি মাল। একেবারে বেড়ে খাসা মাল।’
দিলওয়ার খানের মনে হল, গোটা একটা বিরাট পাহাড় যেন দেখতে দেখতে ব্যাঙে পরিণত হয়ে গেল। রাগে তার সর্বশরীর কাঁপতে লাগল থরথর করে। সারা শরীরের শিরা-উপশিরা টানটান হল। একটা কথা না বলে সে রাস্তায় এপাশে-ওপাশে তাকাতে লাগল। অমনি চোখে পড়ল চুল-কাটা সেলুনটা। পাগলের মতো হয়ে লাফাতে লাফাতে সেখানে গিয়ে ঢুকে পড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে চেয়ারের উপর গিয়ে বসল। ভয়ে ভয়ে গোঁফের দিকে তাকাতে তাকাতে ক্ষৌরিক দাঁড়াল কাছে এসে। তারপর, সম্ভ্রমে প্রশ্ন করল, ‘বলুন, খানসাহেব, দাড়ি কাটবেন?’
‘আখো! দাড়ি চলে গেছে জাহান্নাম। তুমি আগে আমার গোঁফ মুড়িয়ে দাও। এদিকে শালার কেবল খেমটাউলির ভেড়ুয়ারাই গোঁফ রাখে।’
ক্ষৌরিক ক্ষুর চালাবার আগেই দিলাওয়ার খানের দুচোখ বেয়ে দরদর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। কিন্তু বহু কষ্টে সে সংবরণ করে নিল তার বুক-ভাঙা কান্নার জোয়ার।
মৌন – শফিকুর রহমান
বছরের শেষ দিন। শেষ দিনের শেষ রাত।
ফ্রন্ট থেকে কয়েক শো মাইল দূরে কোনো এক হোটেলে আমরা নাচ দেখছি। আমি, ডন আর নিক। আমরা এই তিনজন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। হোটেলের এক কোনার এই টেবিলটা সবসময় ব্যবহার করি আমরা। এই টেবিল আমাদের পছন্দ, আমাদের খুবই প্রিয়।
চারটা চেয়ারের তিনটায় আমরা বসেছি। একটা খালি পড়ে রয়েছে। ওটা জিফের। জিফ ফ্রন্ট থেকে ফিরে আসেনি। জিফের জাহাজ নিখোঁজ রয়েছে। কিছুদিন আগে জিফকেও নিখোঁজ ঘোষণা করা হয়েছে।
মাত্র কয়েক বছর হল গড়ে উঠেছে আমাদের বন্ধুত্ব। কিন্তু এ বন্ধুত্ব সুদৃঢ়। যুদ্ধের ভয়াবহতা দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ দিয়েছে ঘুচিয়ে। জিফ এখন আমাদের সঙ্গে নেই; কিন্তু আমরা এই চারজন যেন এক সত্তা।
নিউজিল্যান্ডের ডন, ক্যানাডার নিক, আমেরিকার জিফ আর আমি একসঙ্গে চলাফেরা করি, একসঙ্গে খাই এবং যথাসম্ভব একসঙ্গে ছুটি নেওয়ারও চেষ্টা করি। ছুটি পেলেই আমরা এই হোটেলে এসে উঠি। এখানকার নাচ উপভোগ করার জন্য এই নির্দিষ্ট টেবিলটায় বসি। এবারেও বড়দিনের ছুটি পেয়ে আমরা এখানে চলে এসেছি। আর, পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করব বলে এখানে এসে জুটেছি। আমরা সবাই এসেছি, কেবল জিফ আমাদের সঙ্গে নেই।
জিফ আমাদের সঙ্গে নেই। এমন দিনে তার অনুপস্থিতি আমাদের মনে বড় বাজছে। এখানে এসেই নিকের কাছে জিফের খবরটা প্রথম শুনলাম। আমি তার জন্য আমার বরাদ্দ চকোলেট সঞ্চয় করে রেখেছিলাম। সেই চকোলেট আমি সঙ্গে এনেছি। কিন্তু জিফ নেই। জিফ চকোলেট খেতে খুব ভালোবাসে।
বছরের শেষ রাত। একই রাত্রে একটা বছর শেষ হয়ে অন্য বছর শুরু হবে। হোটেল সেই জন্য বিশেষভাবে আলোকসজ্জিত। এত আলো যে, দিন না রাত, বুঝবার উপায় নেই। ইতালীয় বালা মাইক্রোফোনে গান গাচ্ছে। অর্কেস্ট্রায় সুরের ঝঙ্কার। গান শেষ হলে একে একে দেশ-বিদেশের নাচিয়ে মেয়েরা নাচ দেখাচ্ছে। কখনো একা। কখনো একসঙ্গে অনেকে। এত আলো, এত আনন্দ, এত উল্লাস– অল্পক্ষণের জন্য হলেও মানুষ সব দুঃখ-বেদনা নিঃশেষে ভুলে যায়। আজকের গানের সুর ভিন্নতর। আজকের নাচের ছন্দ অনেক বেশি প্রাণ-উচ্ছল।
আজকে নাচ-ঘরে যারা এসেছে, তাদের বেশির ভাগই আমাদের মতো সৈনিক।
ডন বলল, ‘আমাদের কাছে এমন একটা ছবি নেই, যাতে একসঙ্গে আমরা চারজন রয়েছি। কোনোটাতে দুজন, কোনোটাতে তিনজন। জিফকে নিয়ে আমাদের চারজনের একটা গ্রুপ-ফোটো তুলে রাখা উচিত ছিল।’
নিক বলল, ‘আমার মন বলছে, জিফ মরেনি। জিফ বেঁচে থাকার জন্যেই এ দুনিয়াতে এসেছে। জিফ মরবার মতো ছেলে নয়। আমার মন বলছে, জিফ আবার আসবে।’
তারপর, জিফকে নিয়ে আমাদের আলোচনা অনেক দূর গড়িয়ে গেল। এক-এক সময় মনে হতে লাগল, জিফ যেন আমাদের মধ্যেই বসে রয়েছে। তার হাসবার, হাসবার কায়দা, তার কথা বলবার ঢং, তার বাঁধ-ভাঙা প্রাণের জোয়ার, তার নাক-চোখ-মুখ, তার দুর্বার সাহসের কথা– সবই একে একে আমাদের চোখের সামনে দিয়ে ছায়াছবির মতো ভেসে যেতে লাগল।
ডন বলল, ‘জিফকে আমি কোনোবারই কিছু দিতে পারলাম না। একবার দোকানে একটা দামি ঘড়ি দেখে তার খুব লোভ হয়েছিল। কিন্তু তার কাছে অত টাকা নেই। আমার কাছে সে টাকা চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, এত দামি ঘড়ি কেনার কোনো মানে হয় না। আমি তাকে টাকা দিইনি। আজকে আমার মনটা কেমন খচ্খচ্ করছে। আজকে যদি সে এখানে থাকত, ঘড়িটা কিনে আমি তাকে দিয়ে দিতাম বড়দিনের উপহার হিসেবে।’
নিক বলল, ‘জিফের মতো বন্ধু হয় না। কতবার রুষ্ট হয়েছি, কতবার গালাগালি দিয়েছি, কতবার এমন হয়েছে যে, মাসের পর মাস চিঠি লিখিনি, কিন্তু জিফ কখনো তা মনে রাখেনি। দেখা হলেই তেমনি উদার হাসি দিয়ে সে আপায়ন করেছে।– এমনি দিনে কোথাও বসে বসে জিফও হয়তো আমাদের কথা ভাবছে।’
