তখনই সিরাজার আওয়াজ মগনলালকে চমকে দিল, ‘হ্যালো সুইটি পাই।’
এমনিতে সিরাজা প্রায় অশিক্ষিত। কিন্তু ট্যুরিস্টের সঙ্গে থেকে থেকে সে এইসব ইংরেজি শব্দ শিখে ফেলেছিল। তার আওয়াজে মগন বুঝে নিল যে কীর্তি এসে গেছে।
সত্যি সত্যিই কীর্তি এসেছিল। বেঁটে, আঁটসাট বাঁধুনি, গভীর ভাঁজযুক্ত দেহ, বিষণ্ণ চেহারার যুবতী। তার রঙ ছিল পাকা। জাম রঙের শাড়ি পরত কীর্তি। সে এলে মনে হল আঁধারের কোনো টুকরো সাকার হয়ে সামনে এসেছে। কীর্তি সচরাচর রাতেই আসত। সে নিজেই নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাইত। সিরাজা দাঁড়িয়েছিল তার দোকানের সামনে। কীর্তি প্রায়ই তার দিকে না-তাকিয়ে কথা না-বলে চলে যেত। তা সত্ত্বেও সিটি বাজাত সিরাজা।
কিন্তু কীর্তি কথাই-বা বলত কোথায়। এর সঙ্গে, ওর সঙ্গে, তার সঙ্গে–কারুর সঙ্গেই না। কথা বলার জন্যে সে এমনি সওয়াল গড়েপিটে নিত্য যার জবাব হত হা’ বা না’। কেবল উপর থেকে নিচে অথবা ডাইনে থেকে বায়ে মাথা হেলিয়ে কথা সেরে নিত কীর্তি। তাকে সিরাজার বিরক্ত করা মগনলালের পুরোপুরি অপছন্দ ছিল। সিরাজা কয়েকবার মগনকে বলেছিল–
‘ইয়ার, তুমি প্রেমের গোলকধাঁধায় পড়ে যাওনি তো? যুবতী মেয়েটাকে টেনে নাও। যদি বেশি এদিক-ওদিক কর তো কবুতরের মতো মেয়েটি উড়ে যাবে।’
কিন্তু মগন তাকে ধমকে দিয়েছে।
আসলে মগন টকলার ধান্দা ছিল বড় ঝামেলার। কীর্তি কাঠের কাজ বা মূর্তি তৈরি করে বিক্রির জন্য তার কাছে নিয়ে এলে মগন লাল তাতে অনেক খুঁত বের করত। কখনো বলত, এই ধরনের জিনিসের চাহিদা আজকাল নেই। আবার কখনো বলত, শিল্পকলার কষ্টিপাথরের বিচারে এ কাজ নিখুঁত হয়নি। কীর্তি মুখ আরো নামিয়ে নিত। যদিও এইসব কথায় মগন লালের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল যাতে একশ’ টাকার জিনিস পাঁচ-দশ টাকায় কীর্তি দিয়ে যায় আর তা রেখে দিয়ে সে একশ টাকায় বেচে।
কোনো আর্ট স্কুলে কীর্তি এই কাজ শেখেনি। তার বাপ নারায়ণ ছিল শিল্পী। ভাউ দাজী আর জেমস বর্গের্স প্রভৃতির সঙ্গে সে নেপাল আর হিন্দুস্থানের নানান জায়গায় শিল্প-উত্তরাধিকারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াত। সেসব শিল্পকীর্তি এখন লন্ডনের যাদুঘর, নিউইয়র্ক আর শিকাগোর অ্যান্টিক-দোকানগুলোকে অলঙ্কৃত করছে। প্রতিবছর আমাদের মন্দির আর মূর্তিঘরের শত-শত মূর্তি গায়েব হয়ে যেত আর হাজার-হাজার মাইল দূরে কিউরিও প্রভৃতির দোকানে দেখা যেত। বিরতিহীন সফরে বিরক্ত হয়ে নারায়ণ ফিরে এসে ঘরে বসেই শিল্পকর্ম নির্মাণ শুরু করে দিল এক সময়। কীর্তি গভীর মনোযোগে তার কাজ দেখত আর কাজের মাঝে হাতে খোদাইযন্ত্র এগিয়ে দিয়ে ‘রাফ ওয়ার্কে সাহায্য করত। ঘরে বসে গিয়ে নারায়ণ ভুলেই গিয়েছিল যে, লুপ্ত প্রাচীন শৈলীর শিল্পকর্ম বেশি দামে বিক্রি হয় আর সেসবের মূল্য দু’গুণ-চৌগুণ নয়, শতগুণ পাওয়া যায়। হয়তো সে তা জানত কিন্তু নারায়ণ ছিল সেই দলের মানুষ যারা পয়সার আশু প্রয়োজনই কেবল বুঝতে পারে, তাকে জীবনের প্রসারিত পটে দেখতে পারে না। সে শিল্পকর্ম তৈরি করে কষ্টে-সৃষ্টে রুটির পয়সা উপার্জন করত। শেষে একদিন রুটির পয়সা জোগাড় করতে-করতেই মৃত্যু হল নারায়ণের। তখন সে জগদম্বার মূর্তি বানাচ্ছিল। সে হঠাৎ ভুল করে তার খোদাইযন্ত্র দিয়ে নিজের হাতে আঘাত করায় তার ধনুষ্টঙ্কার হয়ে যায়। সে মারা যায় কাছেরই সামরিক হাসপাতালে। লোকেরা কানাকানি করত এই বলে যে সে নাকি কুকুরের মতো মরেছে। এইরকম মৃত্যু তার হবে নাই-বা কেন? সে যখন দেবীমূর্তি বানিয়েছে তখন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস দেবীর স্তনযুগল, নিতম্ব আর জঙ্ঘার ওপর-নিচে আটকে থেকেছে। ছোট মূর্তিতে স্তনযুগল শূন্যে ঘূর্ণায়মান লাটুর মতো দেখায়, কিন্তু বড় মূর্তিতে পা আর স্তনযুগল এক রকম ছোট ঘড়ার মতো দেখায়। আসল কথা, দুধের বড়-বড় বাটি যেন বুকের পরে রাখা হয়েছে, আর হস্তিনীর মাথার মতো নিতম্ব, যার নিচে একটি শুড়ের বদলে দুটি শুড় বেরিয়েছে। সে দুর্গামূর্তি বানাচ্ছিল। দুর্গা বড় জাঁকজমকভরা দেবী। এইরকম দেবীর মূর্তি যে বানাতে যাবে সে কুকুরের মতো মরবে না তো কি আমার-আপনার মতো মরবে?
‘কী এনেছ?’ মগন টকলা কীর্তিকে জিজ্ঞেস করল। কীর্তি শাড়ির আঁচল থেকে কাঠের কাজ’ বের করে মগনের সামনে টেবিলের ‘রোল টপে’র উপর ধীরে-ধীরে রাখল। উপরের ল্যাম্পের আলো ওখানেই কেন্দ্রীভূত ছিল বলে রাখল। কাজটা দেখার আগে মগন কীর্তির দিকে এক পুরনো কাজ-করা চেয়ার এগিয়ে দিল, কিন্তু কীর্তি আগের মতোই দাঁড়িয়ে রইল।
‘তোমার মা কেমন আছে?’
কীর্তি কোনো জবাব দিল না। সে একবার পেছন ফিরে যেখানে সড়ক নিচের দিকে নেমে গেছে, সেদিকে তাকাল। তারপর যখন মগনের দিকে ফিরে দাঁড়াল তখনও তার চোখদুটি আনত।
কীর্তির মা তখন সামরিক হাসপাতালে। সেখানেই তার বাপ নারায়ণ মারা গিয়েছিল। বুড়ির ‘কিডনির রোগ ছিল। তার পেট ঘেঁদা করে নল লাগিয়ে একটা বোতল বেঁধে দেয়া হয়েছিল যাতে করে মলমূত্র নিচে যাবার বদলে ওপরের বোতলে চলে যায়। বোতল কোনো কারণে খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এখন অন্য বোতলের জন্য পয়সা চাই। যদি সে মগনকে এ-কথা বলে দিত তো মগন অন্যভাবে কথা শুরু করত, কিন্তু ওই কাঠের কাজ দেখে সে চমকিত হয়ে গেল।
