কামরা ঠিক করার সময় হঠাৎ তার থলেতে আমি চারটি বই দেখলাম : গ্যেটের ফাউস্ট, হাইনের কাব্য, রিলকে, ব্রেশট এবং পবিত্র ইঞ্জিল।
সন্ধ্যায় সে ভারি ক্লান্ত এবং বিবর্ণ হয়ে ফিরলে আমি বললাম, ‘অটো, কাল রাতে তুমি তো খোদার বিরুদ্ধে ছিলে–অথচ ইঞ্জিল সাথে নিয়ে ঘুরছ।’
একথা শুনে অটো খোদার ধ্যানে আবেগ-অন্ধ মানবিক বাধ্যতার ওপর এক সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়ে ফেলল।
‘অটো, তুমি এলিফ্যান্টা গিয়েছিল? সেখানকার ত্রিমূর্তি আর দেবতা–’
‘আমি কোথাও যাইনি। সারাদিন ভিকটোরিয়া গার্ডেনে বসে ভিড়-জমা মানুষদের দেখেছি। মানুষ–মানুষই সবচে বড় দেবতা।’
‘হ্যাঁ, তা তো বটে। কিন্তু তুমি খেয়েছ কোথায়?’
‘আমি এক ডজন কলা কিনে নিয়েছিলাম।
হঠাৎই আমি খুব লজ্জিত হলাম। যাবার সময় কিছু খাবার দিতে আমার কেন মনে ছিল না ভেবে লজ্জা লাগল। আসান মামুর কথাও মনে পড়ল, সম্ভবত ওর কাছে পয়সা-কড়ি নেই।
খাবার টেবিলে সে বলল, ‘আমি অনেক দিন পর পেটপুরে খাচ্ছি।’
আমি তার সঙ্গে জার্মানির আলোচনা করতে লাগলাম। বার্লিনের প্রাচীরের বর্ণনা দিতে গিয়ে সে জানিয়ে দিল যে, সে পাক্কা এন্টি-কমুনিস্ট।
বাড়িতে আমার মা আমার জন্যে মজার-মজার খাবার তৈরি করে। আপনি মাকে দেখলে খুব খুশি হতেন। মায়ের বয়স এখন বিয়াল্লিশ। নানান বিপদ-আপদ বেচারিকে অকালে বুড়িয়ে ফেলেছে। কিন্তু এখনো মা সুন্দরীদের একজন।
‘তুমি কি তার একমাত্র ছেলে?’
‘হ্যাঁ, আমার পিতা সৈন্যবিভাগের অফিসার ছিলেন। মায়ের বাড়ি প্রসা। মায়ের বয়স যখন সতেরো তখন বাবার সাথে বিয়ে হয় তার; এর কিছুদিন পরই বাবা পোল্যান্ডের যুদ্ধে নিহত হন। তার পরের মাসেই আমার জন্ম। বোমা বিস্ফোরণ থেকে বাঁচবার জন্যে মা আমাকে কাঁধে করে নানা জায়গায় ফিরতেন। আমাকে কোলে নিয়ে, মাথায় রুমালের ফলবুট পরে, সামান্য আসবাবপত্র প্রেম্বুলেটরে এঁটে গ্রামে-গ্রামে ঘুরতেন আর ক্ষেতখামারে লুকিয়ে থাকতেন। মা যখন পোল্যান্ডের এক গ্রামে লুকিয়ে ছিলেন তখন সৈন্যেরা ঘরে আসে। আমার বয়স তখন বছর চারেক। আমার শৈশবের অবিস্মরণীয় স্মৃতি এই ভীষণ রাতটা। ভয়ে আমি পালঙ্কের নিচে লুকালাম। লোকেরা যখন মাকে টেনে নিয়ে গেল আমি জোরে-জোরে কাঁদতে লাগলাম। মাকে ওরা টেনে-হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে গেল। এর পর মা ভয়ে ঝোপে-ঝাড়ে লুকিয়ে থেকে বেশ ক’দিন পর ফিরলেন। এদিকে আমি খালি ঘরে একা। বাইরের গোলাগুলির আওয়াজ ঘরের ভেতর ছমছম করে বেড়াত। বাবুর্চিখানা এবং ভাঁড়ারের আলমারি খুলে আমি খাবার তালাশ করতাম। যা কিছু পেতাম তাই ক্ষুধার জ্বালায় খেয়ে ফেলতাম। আলমারিগুলোর তাক ছিল অনেক উঁচুতে। সেখানে অনেক খাবারও ছিল। কিন্তু আমি নাগাল পেতাম না।’
এতটুকু বলে সে চুপসে গেল। খেতে থাকল নীরবে।
‘চালের খাবার খুব ভালো লাগে। কয়েক মিনিট পর সে আস্তে করে বলল, এই জন্যে পারলে আমি যুদ্ধের ধ্বংসকাহিনী পড়ি না। বড়দের কাছ থেকে শোনা এমনি আরো অসংখ্য বীভৎস কাহিনী শুনেছি। আমার সেই ফরাসি মেয়েটির কথা মনে পড়ছে, যে এই অটোরই স্বজাতি জার্মানদের মৃত্যুলীলার কাহিনী শুনিয়েছে। এই পোল্যান্ডেই যেখানে অটো এবং তার মায়ের এই দুরবস্থা হয়েছিল, নাৎসিরাও রাতদিন সেখানে কাজ করছে। সেখানে রোজ হাজারো ইহুদিদেরকে নিষ্ঠুর মৃত্যুযন্ত্রে নিক্ষেপ করা হত। ব্রিটিশের গোলা-বারুদ এ-অঞ্চলকে করে দিয়েছিল একেবারে ধ্বংসস্তূপ। আমার সেই রুশ বালিকার কাহিনীও মনে পড়ল। কে যেন শুনিয়েছিল কাহিনীটি। নিজের গোটা পরিবারকে জার্মানদের নির্মম মেশিনগানের সামনে আহুতি দিতে দেখে ভয়ে-বিভীষিকায় পলকের মধ্যে তার মাথার সব চুল শাদা হয়ে গিয়েছিল।
অথচ এরা সবাই উনিশ শ পঁয়তাল্লিশোত্তর ইউরোপের নবীন বংশধর।
মানবতার সেবক যিশুর অনুসারী পশ্চিম ইউরোপ তার সন্তানদেরকে উত্তরাধিকার সূত্রে কী দিয়েছে!
‘তোমার মা এখন কী করেন?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘তিনি এখন হাউস-কিপার। সামরিক বিধবা হিসেবে পেনশন পান। আমাদের দু কামরার ছোট ঘর। আমি সন্ধের শিফটে এক ফ্যাক্টরিতে কাজ করি। আমার মা খুব ভালো। এসট্রলজিতে পূর্ণ বিশ্বাসী, রীতিমতো গির্জায় যান। গত বছর আমি সাইকেলে সারা জার্মানি ভ্রমণ করেছি। জার্মানি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেশ।
‘সব দেশই তার বাসিন্দাদের কাছে সুন্দর। কিন্তু তুমি নব্য-নাৎসি যেন না-হয়ে ওঠ।’
‘না আমি নাৎসি হব না। ইহুদিদের প্রতি আমার কোনো ঘৃণা নেই।’
সে সহজে বলল। আমার হাসি পেল।
‘আমার মাতুলরা এখনো পূর্ব জার্মানিতে রয়েছে। যেমন আপনাদের কিছু লোক এখানে, আর কিছু পাকিস্তানে।’ সে ম্যাপ দেখিয়ে বোঝাল।
দ্বিতীয় দিন সে কথা দিয়েছিল শহরের দর্শনীয় সব কিছু দেখবে। কিন্তু সে দিনও সারাক্ষণ সে রানিবাগে বসে কাটাল।
চতুর্থ দিন ছেলেটা ওয়ার্ডেন রোডে ভুলা ভাই দেশাই ইন্সটিটিউটের বারান্দায় বসে লাওস যুদ্ধ সম্পর্কিত প্রবন্ধ পড়ে দিনটা কাটিয়ে দিল।
ভেতরে মেয়েরা নাচ শিখছিল আর হলঘরে হুসেনের নতুন চিত্র প্রদর্শনী হচ্ছিল।
বোম্বের সব দূরত্ব সে পায়ে হেঁটে পার করত। ওয়ার্ডন রোড থেকে ফ্লোরা ফাউন্টেন অবধি সে পায়ে হেঁটে গেছে। আমার মনে হত, জার্মান জাত নিঃসন্দেহে জীন বা দেও জাত-সম্ভূত।
