এর কিছুদিন পর বস্তির আলো, জল ইত্যাদির সুবন্দোবস্তের দিকে দৃষ্টি দেয়া হল। সরকারি কর্মচারীরা লাল ঝাণ্ডা নিয়ে রাস্তাঘাট মেরামত করার জন্য বড় বড় ইঞ্জিন চালিয়ে দিল সশব্দে।…
.
এভাবে কেটে গেল বিশটি বছর। বস্তি এখন ভরপুর শহরে রূপান্তরিত হয়েছে। রেলওয়ে স্টেশন থেকে শুরু করে টাউন হল, কোর্ট, জেলখানা সবই স্থাপিত হয়েছে এখানে। প্রায় আড়াই লক্ষ লোক এখন এই শহরের অধিবাসী। শহরে একটা কলেজ, ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক দুটো হাইস্কুল, আটটা অবৈতনিক প্রাইমারি স্কুল গড়ে উঠেছে। এছাড়াও খোলা হয়েছে ছ’টা সিনেমা হল, চারটা ব্যাঙ্ক। এসবের মধ্যে পৃথিবীর বড়-বড় দুখানা ব্যাঙ্কের শাখাও রয়েছে।
এই শহর থেকে দু’খানা দৈনিক, তিনখানা সাপ্তাহিক আর দশখানি মাসিক পত্রিকা নিয়মিত বের হচ্ছে। তার ভেতর চারখানা সাহিত্য সম্পর্কীয়, দু’খানা কৃষি সম্পৰ্কীয়, একখানা ডাক্তারি, একখানা মহিলা বিষয়ক ও একখানা ছোটদের পত্রিকা রয়েছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে বিশটা মসজিদ, পনেরটা মন্দির ও ধর্মশালা, ছয়টি এতিমখানা, পাঁচটি অনাথ আশ্রম আর তিনটি বড়-বড় সরকারি হাসপাতাল খোলা হল। একটা হাসপাতাল শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট।
প্রথম কয়েক বছর শহরটি এর বাসিন্দাদের ইচ্ছামতো হুসনাবাদ’ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু অনেকে এটাকে একটু রদবদল করে হাসনাবাদ’ রাখল। শেষে এটাও টিকল না। কারণ জনসাধারণ ‘হাসান’ আর হুসন-এর ভেতর কোনো পার্থক্য নির্ণয় করতে অপারগ। অতএব অনেক বড়-বড় বই-পুস্তক, দলিল-দস্তাবেজ ঘেটে এই বস্তির আসল নাম বের করা হল। হাজার-হাজার বছর আগের নামানুসারে এই শহরের নাম রাখা হল ‘আনন্দী নগরী।
এমনিতে সমগ্র শহরটাই ছিমছাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আর সুন্দর। কিন্তু সবচাইতে সুন্দর আর ব্যবসার আসল কেন্দ্রস্থল হচ্ছে–শহরের বেশ্যারা যেখানে থাকে সেই জায়গাটা।
.
‘আনন্দী নগরীর’ মিউনিসিপ্যালিটির সভা বেশ জমেছে। হল লোকে পরিপূর্ণ। অন্যান্য দিনের সাধারণ নিয়ম ভঙ্গ করে প্রতিটি সদস্যই আজ উপস্থিত রয়েছেন। আলোচনার বিষয় হল–শহরের মধ্যস্থলে অবস্থিত বেশ্যাদের শহর থেকে অপসারণ করা। কারণ এরা মানবতা, সংস্কৃতি আর আভিজাত্যের পরিচ্ছন্ন পরিবেশে কলঙ্কের মতো বিরাজ করছে।
একজন সুবক্তা বললেন–জানি না আমাদের পূর্বপুরুষেরা এমন কী দেখেছিলেন, যাতে করে এসব সমাজের কলঙ্কদের শহরের একেবারে মধ্যস্থলে স্থান করে দিয়েছিলেন?’
.
এবার এদের জন্য যে স্থানটি নির্ধারণ করা হল তা শহর থেকে বার ক্রোশ দূরে অবস্থিত।
চড়ুইপাখি – খাজা আহমদ আব্বাস
লোকটির নাম রহিম। রহিম খান। নামের বিপরীত তার কাজ। নিষ্ঠুরতায় তার জুড়ি নেই : এ অঞ্চলে। তার ভয়ে গ্রামটাও যেন কাপে। মানুষ বা পশু-কারো প্রতি বিন্দুমাত্র দরদ নেই তার। একদিন কর্মকারের ছেলেটা রহিম খানের বলদের লেজে কয়েকটা কাঁটাগাছ বেঁধে দিয়েছিল। ছেলেটাকে কী মার! মারের চোটে যখন রক্তারক্তি অবস্থা, রহিম তখন ছেড়ে দিয়েছিল ছোঁড়াটাকে। গাঁসুদ্ধ বলাবলি করে, ‘খোদার একটু ভয়ডর নেই দজ্জালটার। কচি বাচ্চাদের মারে যে, মূক পশুগুলোকে যে পিটুনি দেয়, এমন পাতকের কপালে নির্ঘাত দোজখ-বাস আছে।’
যত বলাবলি সবকিছু রহিম খানের পেছনে–অগোচরে। তারা সামনে কেউ খুলুক তো মুখ! বেচারা বুলু একদিন শুধু বলেছিল, ‘আহা, বাচ্চাদের এমন করে মারতে নেই আব্বা। আর যাবে কোথায়! রহিম ঝাঁপিয়ে পড়ে বুন্দুর ওপর। এমন মার খেল বুন্দু যে, পাড়ার প্রতিটি লোকে চমকে উঠল। পাছে রহিম বিরক্ত হয় তাই বুন্দুর কাছে কেউ সান্ত্বনা দিতেও ঘেষল না। গাঁ-সুদ্ধ সবাই বলাবলি করল ‘ও বেটার মাথা খারাপ হয়েছে; ওকে পাগলা গারদে পাঠাও।’ কিন্তু এ-সব কথাবার্তাও রহিম খানের পেছনে, নিভৃতেসামনে কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না।
গ্রামের কেউ রহিম খানের সঙ্গে কথা বলে না। না-বলুক, রহিমের তাতে বিন্দুমাত্র আসে যায় না। কাঁধের উপর লাঙল নিয়ে সকালে সে মাঠে যায়। পথে কারো দেখা পেলে রহিম না-দেয় সালাম, না-করে কুশল জিজ্ঞাসা। দুটো বলদ তার। রহিম ওদের নাথু আর ছিদু বলে ডাকে। মাঠে পৌঁছে সে বলদদুটোর সঙ্গে কথা শুরু করে হাল দিতে-দিতে। হয়তো এক সময় চিৎকার করে ওঠে–
‘এই শালা নাথু, সোজা লাইন ধর, ধর বলছি। তোর বাপ এসে চাষ দিয়ে যাবে রে হারামজাদা? এই ছিদু। তোর আবার কী হল রে হারামি?’
হাতের পাঁচনটা দিয়ে তারপর রহিম দমাদম ছিদু-নাথুকে পেটাতে থাকে। প্রহারে-প্রহারে বলদদুটোর সারা পিঠে শুধু ক্ষতের চিহ্ন।
সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে বউ আর ছেলেদুটোকে নিয়ে রহিম খিস্তি শুরু করে। শাক-সবজি বা ভাজাভুজিতে বউ লবণ দিতে ভুলে গেছে তো আর রক্ষা নেই। কোনো ছেলে কোনো অপকর্ম করল তো রহিম তাকে পা উপরে বেঁধে গরুপেটা লাঠিটা দিয়ে পেটাতে থাকবে। বেহুশ না-হওয়া পর্যন্ত ছেলের নিস্তার নেই। প্রতিদিন এমনি একটা-না-একটা কিছু ঘটবেই ওই বাড়িতে। প্রায় প্রতি রাত্রে বউ-বাচ্চাদের ওপর গাল-খিস্তি মার-ধোর, …যন্ত্রণায় ওরা চিৎকার করতে থাকে। পাড়া-পড়শিরা দেখে-শুনেও কেউ আসে না। এগিয়ে এসে যে রহিমকে থামাবে, সে সাহস হয়ে ওঠে না কারো।
