সাপ দুটো নদী তীরের দিকে একবারও তাকাল না। বটবৃক্ষের তলার অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ইটপাজা থেকে প্রাচীন লম্বা শরীর টেনে বের করল। তারপর মাথা তুলে পোড়ো জমিটা বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখল। পোড়ো জমির সাদা মাটি জ্যোৎস্নায় চকচক করছে।
পোড়ো জমি ছাড়িয়েই ধানি মাঠ। দিগন্তব্যাপী। সেই মাঠে রাতের বেলা ধাড়ি সব মেঠো ইঁদুরের চলাচল। নাগালের মধ্যে দুটো ইঁদুর পেলেই দুজনের ভরপেট আহার হয়ে যাবে। চব্বিশ ঘণ্টা নিশ্চিন্ত। প্রাচীন লম্বা শরীর বিড়া পাকিয়ে দরগাতলার ইটপাজার আড়ালে পড়ে থাকা যাবে।
সাপ দুটো একত্রে জিভ বের করল। পর পর কয়েকবার। তারপর চলতে শুরু করল।
ধানি মাঠের দিকে যেতে হলে বটবৃক্ষের তলা হয়ে যেতে হয়।
জায়গাটা অন্ধকার। সেই অন্ধকারে চোখ চলে না। মুখের সামনে আহার থাকলেও দেখা যায় না।
তবুও আলগোছে অন্ধকার বটবৃক্ষ তলাটা পেরিয়ে এল তারা। পেরুবার মুহূর্তে দুজন একসঙ্গে দেখতে পেল নদীর তীরের ঝোপঝাড়ের সামনে একটি মানুষ বসে আছে। দূর থেকে মুখটা দেখা যায় না তার। হাতের বিড়িটা টানে টানে জ্বলছে, দেখতে পায়। মানুষটা একাকী কেন বসে আছে এখানে! কী মতলব তার!
সাপ দুটো ব্যাপারটা নিয়ে আর ভাবে না। পেটে চব্বিশ ঘণ্টার খিদে। বিশাল লম্বা, তেল চকচকে কালো শরীর জ্যোৎস্নায় সম্পূর্ণ মেলে, জ্যোৎস্না কেটে কেটে ধানি মাঠের দিকে এগোয় তারা।
.
দরগাতলার অদূরে নদীতীরের ঝোপঝাড়ের সামনে সন্ধ্যার পর থেকে বসে আছে গজু। এখন রাত এক প্রহর। চরাচর নিঝুম হয়ে গেছে। কেবল ঝিঁঝি পোকার ডাক, কেবল নদী নিরন্তর বয়ে যাওয়ার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। আর কোনও শব্দ নেই কোথাও।
নদী থেকে ওঠে আসছিল আবহমান হাওয়া। রাতের বেলা হাওয়াটা শীতল হয়। খালি গায়ে একটু একটু শীত টের পাচ্ছিল গজু। সেই শীতভাব কাটাবার জন্যে অবিরাম বিড়ি টেনে যাচ্ছিল সে।
কিন্তু মেয়েমানুষটা এখন আসছে না কেন?
গজু তো নিজ কানে শুনল, রতনকে বলল, বাড়িডা নিটাল অইলেই বাইর অমু। তুমি দরগাতলার সামনে গাঙপাড়ে বইয়া থাইকো। গজু কি ভুল শুনেছে?
এত বড় ভুল তো সারা জীবনেও হয়নি গজুর। জীবন কাটল কালু ওস্তাদের সাগরেদি করে। চোখকান বড় সজাগ গজুর। চোখে দেখা জিনিস কখন ভুল হয় না তার, কানে শোনা জিনিস ভুল হয় না।
তাহলে?
পারু যে রতনারে কইল, তুমি থাইকো।
গজু কি ভুল শুনল।
কিন্তু ওস্তাদ যে কইত, তুই না থাকলে আমার দল ভাইঙ্গা যাইত গজু। হারা জীবন ডাকাতি করণ লাগত না। এতদিন জেলে পইচ্চা মরতাম। বরবাদ অইয়া যাইতাম। কথাটা সত্য। গজু টো না রাখলে, চোখকান সজাগ না রাখলে, কালু ওস্তাদের দল থাকত না। বহু আগে ভেঙে ছারখার হয়ে যেত। তাহলে আজ এতকালের সজাগ চোখকান কী করে গজুর সঙ্গে বেইমানি করে।
নাভির কাছে, লুঙ্গির কোচর থেকে বিড়ির প্যাকেটটা বের করে গজু। ম্যাচ বের করে। নদীর হু হু হাওয়াটা আছেই। সেই হাওয়া বাঁচিয়ে কায়দা করে বিড়ি ধরায় তারপর বিড়ির প্যাকেট আর ম্যাচ জায়গামতো রাখতে গিয়ে আনমনে কোমরের সঙ্গে বাঁধা লাল গামছার আড়ালে যত্নে গুঁজে রাখা ভোজালিটা একবার ছুঁয়ে দেখে।
জিনিসটার উত্তাপই অন্যরকম। একবার ছুঁয়ে দিলেই শরীরে ফিরে আসে দশ মরদের বল। সাহস। ভোজালিটা কোমরে থাকলে পৌষ মাসের শীতেও খালি গায়ে নদীতীরে বসে থাকা যায়। শীত লাগে না। কিন্তু মেয়েমানুষটা?
নদীর দিকে তাকিয়ে পারুর কথা ভাবে গজু। ভাবে আর ফুক ফুঁক করে বিড়ি টানে। চারদিকের জ্যোৎস্না তখন এতটা তীব্র হয়েছে, নদীর জলে মুহূর্তের জন্যে উয়াস ছাড়তে ওঠা মাছও বুঝি দেখা যাবে। চাঁদখানা গোল হয়ে আছে মাথার ওপর। নদীর জলে জ্যোৎস্না পড়ে চকচক করছে। সেই জ্যোৎস্নার দিকে, জলের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মাথা খারাপ হয়ে যায়।
গজু চোখ তুলে নদী তীরের ঝোপঝাড়গুলো দেখে। তারপর মোটা গর্দানটা ঘুরিয়ে দেখে বটবৃক্ষটা। তলায় গাঢ় হয়ে ছায়া জমে আছে গাছটার। ম্যালা দিনের পুরোনো গাছ। বয়স কত কে জানে! সারা গায়ে খোড়ল। অজস্র ঝুরি নামিয়ে দিয়েছে চারদিকে। যেন বুড়ো মানুষের লম্বা দাড়িমোচ। বাতাসে পাতাগুলো ঝিরঝির করে নড়ছে। তার ওপর পড়েছে জ্যোৎস্না, দেখতে বেশ লাগে।
গজু খানিকক্ষণ গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আবার মুখ ফেরায় নদীর দিকে। নদীটিও! করতোয়া যার নাম। ভাঙে বছর বছর। আগে বটগাছটা ছিল নদীর পোয়া মাইল দূরে। ভাঙতে ভাঙতে কতদূর এগিয়েছে নদী। বটের গোড়া প্রায় ধরে ফেললো আর কী! এবার বর্ষায় কি এতকালের পুরোনো গাছটাও খাবে নদী?
গজু মনে মনে বলল, রেহাই নাই। আর রেহাই নাই।
কিন্তু পারুর হইল কী। মাগিডা বাইর অয় না কেন অহনতরি?
ঝোপঝাড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে তাঁতীপাড়াটার দিকে তাকাল গজু। নদীর পাড় ঘেঁষে কয়েক ঘর তাঁতীর বাস। বছর দশেক হল দরগাতলায় এসে ঘর বেঁধেছে। দরগাতলার এখন যিনি পীর সাহেব তিনি খুবই দয়ালু ব্যক্তি। নদী তীরে নিজের বিরান জমি ছিল। বিশ-পঞ্চাশ কানির মতো। সেই জমির বেশির ভাগটা দিয়ে দিলেন তাঁতিদের। লোকগুলো থাক এখানে।
বড় দিলদরিয়া মানুষ পীর সাহেব। ফেরেশতার মতো উদার। হাত পেতে, বিপদে পড়ে সাহায্য চাইতে এসে কোনও মানুষ কখনও ফিরে যায়নি তার কাছ থেকে। তাঁতীরা এসে বলেছিল, হুজুর, আমরা গরিব হিন্দু। দয়া করেন। আমাগো জাগা দেন।
