তারপর কুপি জ্বালায় গণি। রবা নবা হাই তোলে। শুকু ওঠে দাঁড়ায়। ফকির তখন সেজদার ভঙ্গিতে আসনের সামনে পড়ে আছে। মাহাজনরা এসে ফকিরের পিঠে বসে কেউ, কেউ আসনে বসে। সেই বিপুল ভার বহন করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ফকির। আসনের ওপর রাখা গেলাসের জল ছিটিয়ে তবে তার জ্ঞান ফেরে।
কুপি জ্বেলে গণি প্রথমে আসন থেকে গেলাসের জল ছিটিয়ে দেয় ফকিরের গায়ে। রবা নবা দরোজা খুলে বাইরে গেছে। শুকু চৌকির ওপর বাবার পাশে ওঠে বসেছে। মা তেমনি একঠায় বসে আছে বাবার সামনে। কুপির আলোয় বড় বিষণ্ণ দেখায় তার মুখ।
ঠিক তখুনি হোস করে বিদঘুঁটে একটা শব্দ করে ফকির। তারপর ওঠে বসে। ওঠে প্রথমেই আসন হাতড়ে টাকা আড়াইটা কোর্তার পকেটে পুরলো। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, রবা, তামুক হাজা।
ওরা ফিরে এসেছে ততক্ষণে। রবা দুটো টিকা বের করে দিয়েছে নবার হাতে। পোড়া দে।
নবা কুপির আগুনে চিমটা দিয়ে টিকা পোড়াচ্ছে।
গণি বলল, তেনারা আইজ তিনজন আইছিলেন।
ফকির জবাব দিল, হ।
রবা কল্কেতে টিকা ভরে ফুঁ দিতে দিতে বলল, কী নাম জানি তেনাগ?
ডাকিনি জুগিনী মধুমতি কণ্ঠমালা। আইজ কণ্ঠমালা আহে নাই। হেই জটঅলা। পা তমুক লম্বা জট। হাকরাইনের রাইতে আহে। জট দিয়া ঝারে।
ফকির কথা বলছে, বোটকা গন্ধ ওঠে ঘরের ভেতর। সেই গন্ধে নাক কেঁচকায় শুকু। বুড়ি পেচ্ছাব করে দিয়েছে। কী গন্ধ! সেয়ানা মেয়ের পেচ্ছাবে গন্ধ হবে না। যাক। ভালোই করেছে, এখন পেচ্ছাব করেছে। মাহাজনরা থাকলে করলেই হয়েছিল। ফকির এখন কথায় মশগুল। ওসব খেয়াল করার সময় নেই তার। গণি গেছে পুকুর ঘাটে। আসনের ফুল জলে ভাসিয়ে দিতে হয়। মাটিতে পড়লে গৃহস্থের অমঙ্গল।
রবা নবা অনর্গল বক বক কর যাচ্ছে ফকিরের সঙ্গে।
ফকির জিজ্ঞেস করল, তরা হেনে করস কী কী আজামের পোরা।
খেত খোত কোবাই। মাতবরের গাছ ফাড়ি।
বাপে কাম করে না।
করে। মাসে দুই মাসে এক আধটা। চোখে ছানি পইড়া গ্যাছে। মাইনষে নিতে চায় না। কান্দিপাড়ার খনকাররা কাম করইছিল। পোলাডার গাও আর হুগায় না। মাইনষে গাইল পারে।
শুকু ওসব খেয়াল করে না। ঘরের কোণে জালালী দুটো বকবকুম শুরু করেছে। কুকুরটা উঠোনে শুয়ে কুঁই কুঁই করছে। শুকুর বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। দুটো জালালী রোজ এসে বসত ঘরের চালে। বাবা দেখে বলল, আশ্রয় চায় সেদিনই একটা পুরনো টুকরি বেধে পশ্চিম কোণে, বারন্ত চালার সঙ্গে, জালালী দুটো বাসা নিল। ঘটনাটা ভাবতে অবাক লাগে। শুকুর বাবায় কি পশুপাখির ভাষাও বুঝত।
গণি ফিরে আসার পর ফকির বলল, দিয়াইছ?
হ।
গণি খোলা দরোজা বন্ধ করে না। বলল, ব্যাপারিগ গলার আওয়াজ পাইলাম। আডে যাইতাছে।
হকাল অইয়া গেছে। ঘুমাইবেন না?
ফকির মাথা নাড়ে। না, ঘুমান যাইব না। আডে যামু।
গণি তখন আসন থেকে বাতাসা নিয়ে বিলিয়ে দিচ্ছে সবাইকে। রবা নবাকে দেয়, শুকুরকে দেয়, মাকে দেয়। নিজে বাকিটা রেখে দেয় বউর জন্যে। ফকির আসনের বাতাসা খায় না। মাহাজনদের নিষেধ।
ফকির তারপর হুঁকা টানতে টানতে বলল, গণি মিয়া, তোমার বাপেরে আসনের দুধ খাওয়াও। জব খুলব।
ফকিরের কথায় ঘুম ঘুম ভাবটা কেটে যায় শুকুর। ফ্যাল ফ্যাল করে বাবার দিকে তাকায় সে।
বাবা কেমন টানটান হয়ে শুয়ে আছে।
গণি আসনের ওপর থেকে দুধের গেলাসটা নিয়ে মার হাতে দেয়। হাঁড়িপাতিল খুঁজে একটা চামচও দেয়। মা চামচে করে দুধ খাওয়াতে শুরু করে বাবাকে। গলায় পৌঁছায় না সেই দুধ। কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে।
শুকু দেখে বাবা কেমন নিস্তেজ, ঠাণ্ডা মেরে আছে। চোখ বন্ধ, মাথা কাৎ হয়ে পড়েছে বালিশ থেকে। হাত-পা টান টান।
চৌকির ওপর থেকে মা গণিকে ডাকে। গণি তুই আইয়া ইট্টু আ করা তো তর বাপেরে, আমি পারি না। দুধ পইড়া যায়।
গণি চৌকির ওপর ওঠে বাবাকে হা করাতে ব্যস্ত হয়। কিন্তু বাবার মুখে হাত ছোঁয়াতেই চমকে ওঠে সে। মাছের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে শরীর। গণির মুখে কথা সরে না। বাবার গায়ের চাদর সরিয়ে দ্রুত বুকে পেটে হাত দেয় সে। মা ব্যগ্র কণ্ঠে বলে, কী, কীরে গণি?
বাইরে তখন অন্ধকার রাত ফিকে হয়ে আসছে। পাখপাখালির ডাকে পৃথিবী ক্রমশ জেগে ওঠেছে। শুকুর বুকের ভেতরটা ধুগবুগ করে। হৃৎপিণ্ডের শব্দ পাল্টে যেতে থাকে। ঠিক তখুনি ডুকরে কেঁদে ওঠে গণি। মা, মাগো, হ্যায় নাই মা, হ্যায় নাই।
দরগাতলার জোড়া সাপ
দরগাতলার ইটপাজা থেকে মাথা বের করে সাপ দুটো দেখে চমঙ্কার জ্যোৎস্না ফুটেছে।
চারদিকের পৃথিবীতে অবিরাম ডাকছে কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় আর ঝিঁঝি পোকা। এ ছাড়া কোনো শব্দ নেই। রাত কী নিঝুম হয়ে এল।
দরগাতলার সামনে কানি দুয়েক পোড়ো জমি। বাজা। ফসল ফলে না। সেই জমির মাঝামাঝি জায়গায় বিশাল এক বটবৃক্ষ। বৃক্ষটা কতকাল ধরে আছে এখানে, কে জানে। মাথায় ঝাঁপড়ানো ডালপালা। শরীর থেকে নেমেছে গোঁফদাড়ির মতো শেকড় বাকড়, ঝুরি। তীব্র জ্যোত্সা গায়ের জোরে আটকে রেখেছিল গাছটা। ফলে তলায় পড়ে সাপ দুটো সেই অন্ধকারের দিকে তাকাল।
বটবৃক্ষের অদূরে কোদালের মতো চিরল একখানা নদী, নদীর নাম করতোয়া। আগে নদীটা ছিল বেশ দূরে। দিনে দিনে পাড় ভেঙে এগিয়ে এসেছে। এখন পাড়ে তার বেশ কিছু ঝোপঝাড়। দিনমান নিঝুম হয়ে পড়ে থাকে জায়গাটা।
