আজ রাতেরবেলা মনীন্দ্র দুটো সবরিকলা নেয়, কাঁসার বড় বাটিতে একবাটি দুধ নেয়। এই তার রাতের খাবার। চৌধুরী থাকলে এসব মনীন্দ্রকে করতে হয় না। চৌধুরীই করে সব। কিন্তু মাসখানেক হল চৌধুরী গেছে কোলকাতা। ছেলেমেয়েরা সব কোলকাতায় চৌধুরীর। হিন্দুস্থান পাকিস্তান হওয়ার পর থেকেই। চৌধুরী দুবছর তিনবছর পর গিয়ে দেখা করে আসে তাদের সঙ্গে। বিষম লোভী মানুষটা। মনীন্দ্রর রক্ত সম্পর্কের কেউ না। তবুও এদেশে পড়ে আছে শুধু লোভে। মনীন্দ্র বলেছে চিতায় ওঠার আগে বাড়িটা চৌধুরীর নামে দলিল করে দিয়ে যাবে। সেই আশায়ই ছেলেমেয়ে ছেড়ে এদেশে পড়ে আছে চৌধুরী।
আজ রাতে রান্নাঘরে বসে দুধ কলা খেতে খেতে এসব কথা মনে পড়ে মনীন্দ্রের। মনে পড়ে হাসি পায়।
পাশের ঘরে মজিদ আবার হামানদিস্তা ঠুকছে। চুক চুক চুক। চারদিকের গাছপালায় রাত্রিকাল গম্ভীর হচ্ছে। অবিরাম ডাকছে পোকামাকড়। পশ্চিমের বাঁশঝাড়ে দুতিনটে শেয়াল সুর করে ডাকে। শুনে দুধকলা খেতে খেতে মনীন্দ্রর বুকের মধ্যে কেমন একটু কষ্ট হয়। বর্ষাকালে, শেয়ালদের অভাব যাচ্ছে। গোরস্থানে গিয়ে যে মরা খাবে, উপায় নেই। চারদিকে জল। শেয়ালের ডাকে অনাহারের গন্ধ পায় মনীন্দ্র। ভারী একটা কষ্ট হয় তার। গলা দিয়ে দুধকলা নামতে চায় না।
উঠোনের পরই ঘাট। খালিকালে ঘাটটা থাকে বেশ দূরে। বাড়ির নামার দিকে ছোট্ট গোল পুকুর। বর্ষা এসে, বর্ষায় জল ক্রমশ ফুলতে শুরু করলে ঘাটটা ক্রমশ ওপর দিকে ওঠে আসে। এখন যেমন উঠোনের সঙ্গেই ঘাট। রান্নাঘর থেকে চার কদম ফেললেই ঘাট। এবার জলের যে রকম জোর দেখা যাচ্ছে বোধ হয় মনীন্দ্রের উঠোনেই চলে আসবে বর্ষার ঢল।
বানবন্যায় ভেসে যাবে দেশ।
ঘাটের কাছে জিংলাগাছের সঙ্গে মনীন্দ্রের নাওটা বাঁধা। অন্ধকার করে জলের ওপর ভাসছে নাওটা। তার ওপর দিয়ে পাখায় পতপত শব্দ তুলে উড়ে যায় দুটো বাদুড়। কুপি হাতে নাওটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় মনীন্দ্র। অন্ধকার গাছপালার দিকে তাকিয়ে বাড়ি বন্ধ করার মন্ত্র পড়ে। তারপর ঘাটপাড় থেকে উঠোনের দিকে ওঠে আসে। হাতে কুপি, মুখে মন্ত্র। পায়ে বইলাঅলা খড়মের চটর চটর শব্দ তুলে উঠোনময় হাঁটে মনীন্দ্র। মন্ত্র পড়ে। মজিদ সেই ফাঁকে হামানদিস্তা থামিয়ে রান্নাঘরে শুতে যায়।
মজিদ ঘুমিয়ে পড়ার পরও অনেকক্ষণ জেগে থাকে মনীন্দ্র। উঠোনে পায়চারি করে। কখনো কুপিটা জ্বালিয়ে রাখে পুজোর ঘরে।
চারদিক খোলা। ছোট্ট চৌচালা ঘর, তার মাঝমধ্যিখানে কুপি জ্বালিয়ে রেখে নিজের ঘরে ফিরে যায় মনীন্দ্র। কত কী যে মনে পড়ে তখন! সনাতনীর কথা, পাশের বাড়ির মুসলমান মেয়েগুলোর কথা, মেয়েদের মার কথা।
বিয়ের পর পরই সনাতনী জেনে গিয়েছিল পাশের বাড়ির মুসলমান বউটার সঙ্গে গোপন সম্পর্ক মনীন্দ্রর। এজন্যেই বউর ব্যাপারে উদাসীন মনীন্দ্র। স্বামীর ব্যাপারে সব জেনে শুনে কদিন খুব কাঁদল সনাতনী। তারপর এক রাতে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিল। মনীন্দ্র সে রাতে গিয়েছিল মেন্দাবাড়ি। মেন্দাবাড়ি ছিল গানের আসর। কৃষ্ণলীলা। ভারী জমজমাট আসর। সনাতনী পুড়ে মরে গেল, মনীন্দ্র টেরও পেল না। কৃষ্ণলীলায় বিভোর হয়ে রইল। রাতেরবেলা এসব কথা আজকাল প্রায়ই মনে পড়ে মনীন্দ্রর। কতকাল হয়ে গেল, পুরো ত্রিশ বছর, তবুও সনাতনীকে ভুলতে পারেনি মনীন্দ্র।
মনীন্দ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর দরোজা বন্ধ করে মাথার কাছে হারিকেন নিয়ে শুয়ে পড়ল। হোমিওপ্যাথির বইটা মেলে ধরল চোখের ওপর।
কিন্তু পড়তে ভাল্লাগে না মনীন্দ্রর। রাতেরবেলা শরীরের ভেতর ঘুরপাক খায় অসম্ভব এক যন্ত্রণা। বয়স হয়ে গেল তিন কুড়ির কাছাকাছি, তবুও কামটা মরেনি মনীন্দ্রর। রাতেরবেলা এখন শরীর আনচান করে। যুবক বয়স থেকেই মনীন্দ্র খুব কামপ্রিয়। এখন, এই বুড়ো বয়সেও তাগড়া পুরুষের মতন সঙ্গম করতে পারে সে। এসব কবরেজি ওষুধের গুণ। সনাতনী মারা গেছে ত্রিশ বছর। মনীন্দ্র আর বিয়ে করেনি। বামুনের পোলা বিয়ে করলে অধর্ম হয়। কিন্তু শরীর কি ধর্ম অধর্ম মানে! পাশের বাড়ির বউটার সঙ্গে ভাব ছিল মনীন্দ্রর। সনাতনী মারা যাওয়ার পর সুযোগ পেলেই বউটা এসে মনীন্দ্রর সঙ্গে খাটে ওঠত। অভাবের সংসার তার, স্বামী খেতখোলা করে, তাতে সংসার চলে না। মনীন্দ্র চালটা ডালটা দেয়, নেয় কেবল শরীরটা। দিন চলে যায়।
মনীন্দ্রর বড় দোষ ছিল এক নারীতে বেশিকাল সুখ পেত না সে। পাশের বাড়ির বউটাকে একসময় আর ভালো লাগেনি তার। ততদিন বউটার বড় মেয়ে পরী বেশ ডাগরডোগর হয়ে ওঠেছে। মনীন্দ্রর চোখ পড়ল পরীর ওপর। একদিন পরীও কেমন করে যেন ওঠে এল খাটে। মনীন্দ্র ডাক্তার মানুষ। গর্ভ না হওয়ার ওষুধ খাওয়াত। ফলে পরী নির্ভয়ে মনীন্দ্রর কাছে আসত।
পরীর মা অবশ্য জেনে গিয়েছিল ব্যাপারটা চেপে থাকত। মনীন্দ্র পরীকে তার মায়ের কথা বলেছে। ফলে মা মেয়ে দুজনই দুজনার কাছে অপরাধী। দুজনেই চেপে থাকত। তিন বছর পর বিয়ে হয়ে গেল পরীর। তখন তার ছোটটা নুড়ি ধরল মা বোনের পথ। সেও রাতে বিরাতে, দিন দুপুরে যখন সুযোগ পায় মনীন্দ্রর কাছে যায়। নুড়ি একটু দুর্বল শরীরের মেয়ে ছিল। কিন্তু মনীন্দ্র অতিরিক্ত কামুক। নুড়ির বেশ কষ্ট হত, শরীর বইতে চাইত না। তবুও যেত। মনীন্দ্রর চালটা ডালটায় সংসার চলে তাদের। বাবা খেতখোলা। করে ভরপেট খাওয়াতে পারে না। কী করবে! ভাতের চেয়ে কি শরীর বড়!
