রাজা মিয়ার মা কথা বলবার আগেই কুট্টি বলল, আলফুর লগে আপনের দেহা অয় নাই?
দবির অবাক গলায় বলল, না।
বুজানে তো আলফুরে পাডাইছে আপনেরে ডাইক্কানতে!
আলফুর লগে আমার দেহা অয় নাই।
রাজা মিয়ার মা বললেন, তাইলে তুই আইলি কেমতে?
আমি তো নিজ থিকাই আইছি আপনের লগে বন্দবস্ত করতে! বুজান, আলফু যহন বাইত নাই তয় কুট্টিরে পাডান। এক দৌড় দিয়া দেইক্কাহুক আমি মিছাকথা কইছি কিনা!
রাজা মিয়ার মা মাথা দুলিয়ে বললেন, না তুই মিছাকথা কচ নাই। যা বোজনের আমি বুঝছি।
কুট্টির দিকে তাকালেন তিনি। ঐ কুট্টি দেকতো কূটনি মাগি আছেনি না ভাত খাইয়া গেছে গা?
কুট্টি গলা বাড়িয়ে সামনের দিককার বারান্দার দিকে তাকাল। তাকিয়ে দেখতে পেল ভয় পাওয়া শিশুর মতো টলোমলো পায়ে যত দ্রুত সম্ভব সিঁড়ি ভেঙে উঠানে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করছে ছনুবুড়ি। বারান্দায় পড়ে আছে তার শূন্য থালা। সেখানে ঘুর ঘুর করছে হোলাটা।
পালিয়ে যাওয়া ছনুবুড়ির দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক মায়ায় মন ভরে গেল কুট্টির। দুইমুঠ ভাতের জন্য এক মানুষের নামে আরেক মানুষের কাছে মিথ্যা কথা বলে বেড়াচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে, গালাগাল খাচ্ছে। হায়রে পোড়া পেট, হায়রে পেটের খিদা!
ছুনুবুড়িকে বাঁচাবার জন্য ছনুবুড়ির মতো করে ঠাইট না ঠাইট (জলজ্যান্ত) একটা মিথ্যা বলল কুট্টি। না, ছনুবুড়ি নাই বুজান। খাইয়া দাইয়া গেছে গা।
তবু ছনুবুড়িকে বাঁচাতে পারল না কুট্টি। নিজের বাজখাঁই গলা দশগুণ চড়িয়ে গালিগালাজ শুরু করলেন রাজা মিয়ার মা। ঐ রাড়ি মাগি, ঐ কৃটনির বাচ্চা, এমনু ভাত তর গলা দিয়া নামলো কেমতে? গলায় ভাত আইটকা তুই মরলি না ক্যা? আয় গলায় পাড়াদা তর ভাত বাইর করি।
কুঁজা শরীর যতটা সম্ভব সোজা করে, দ্রুত পা চালিয়ে মিয়াবাড়ি থেকে নেমে যেতে যেতে বুজানের গালিগালাজ পরিষ্কার শুনতে পেল ছনুবুড়ি। ওসব একটুও গায়ে লাগল না তার। একটুও মন খারাপ হল না। এইসবে কী ক্ষতি হবে ছনুবুড়ির! ভাতটা তো ভরপেট খেয়ে নিয়েছে! পেট ভরা থাকলে গালিগালাজ গায়ে লাগে না।
জীবনযাত্রা
ঠাক মশাই!
খাটের ওপর আড়াআড়ি শুয়েছিল মনীন্দ্র। চোখে চশমা, ধুতির ওপর হাতাঅলা কোরা গেঞ্জি পরা। মাথার কাছে পরিষ্কার কাঁচের হারিকেন। পোকা খাওয়া একখানা বই মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল মনীন্দ্র। ঘরের ভেতর. জনা চার পাঁচ লোক। একজন হাতাঅলা চেয়ারে বসা, বাকি কজন সার ধরে বেঞ্চে। কম্পাউন্ডার মজিদ জলচৌকিতে বসে ছোট হামানদিস্তায় কী কী সব গুঁড়ো করছিল। লঙ এলাচ আর দারুচিনির মিশ্র একটা গন্ধ হামানদিস্তা থেকে ওঠে আস্তেধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছিল ঘরের ভেতর।
বেঞ্চে বসা একজন আবার ডাকল, ঠাক মশাই!
এবার একটু নড়েচড়ে ওঠল মনীন্দ্র। কিন্তু বই থেকে চোখ ফেরাল না। বলল, ক। ইট্টু যাওন লাগে।
কই?
মনীন্দ্র চোখ তুলে তাকাল। খানিক তাকিয়ে থেকে বলল, তোমায় বাড়ি কই?
কুমারবুক। আমি পিয়ার খার পোলা।
ও। কি অইছে?
গুটি ওঠছে।
কয়জনের?
মার।
খালি তর মারই?
হ। দশা খুব খারাপ। চিনোন যায় না।
দেহাইছচ কারে?
ছেলেটি একটু থেকে থামে। মনীন্দ্রও। তারপর ছেলেটি কিছু বলার আগেই মনীন্দ্র বলল, কালা জাউল্লারে দেহাইছচ?
ছেলেটি মাথা নিচু করে বলে, মার অবস্থা খারাপ দেইক্কা ….
মনীন্দ্র বইটা মুড়ে মাথার কাছে রাখে। তারপর বিছানায় ওঠে বসে। কালা জাল্লারে আবার নে গা। আমি যামু না।
কালা জাউল্লা দুইদিন ধইরা যাইতাছে, কাম অয় না।
অইব। যা।
তারপর অন্যান্য লোকজনের দিকে তাকিয়ে মনীন্দ্র বলল, একজনের চিকিৎসা করা রুপি আমি দেহি না।
ছেলেটি তবুও কাইকুঁই করে। বাবায় কইছিল টেকা-পয়সা যা লাগে…
শুনে মনীন্দ্র এবার রেগে গেল। টেকা দিয়া মনীনরে পাওয়া যায় না। আমি যামু না। যা। ছেলেটি তবুও বসে থাকো। আড়চোখে মনীন্দ্র দেখে।
ছেলেটির দিকে আর তাকায় না মনীন্দ্র। একবার গলা খাকারি দেয়।
তারপর কম্পাউন্ডার মজিদকে বলে, অরে যাইতে ক মইজ্জা।
মজিদ হামানদিস্তা থামিয়ে ছেলেটির দিকে তাকায়। যাও, কর্তায় একবার না করলে হেই জায়গায় আর যায় না। তুমি যাওগা।
এবার ওঠে ছেলেটি। লুঙি আর ফুলহাতা শার্ট পরা। বগল পর্যন্ত হাতা গোটানো। উদ্ধত ভঙ্গিতে বেরিয়ে যায় সে। মনীন্দ্রকে আদাবও দেয় না।
উঠোনে নেমে কম্পাউন্ডার মজিদকে গাল দিয়ে যায় ছেলেটি। মজিদের ওপর দিয়ে গালটা আসলে মনীন্দ্রকেই দিয়ে যায়। নোয়াব অইয়া গেছ হালার পো! খাড়াও পাইয়া লই তোমারে!
মজিদ শুনতে পায় না। নিবিষ্ট মনে হামানদিস্তায় কবরেজি ওষুধের মশলা বানাচ্ছে। ঘাটের কাছে বর্ষার জলে একটা কোষা নাও ছেড়ে যায়, জলে বৈঠা পড়ার শব্দ হয়, কেউ খেয়াল করে না।
মনীন্দ্র বলল, রাইত অইতাছে, যা খাইয়া আয়গা মজিদ।
হামানদিস্তা রেখে ওঠে মজিদ। খালি গা, ধড়টা বিশাল তার। দাঁড়ালে পর বিশাল আকৃতিটা চোখে পড়ে মজিদের। দাঁড়িয়ে ঘরের লোকগুলোর দিকে একবার তাকায় মজিদ। তারপর হারিকেনের স্পষ্ট আলোয় ঘরের ভেতর দীর্ঘ ছায়া ফেলে উঠোনে নেমে যায়। পুকুরের ওপারে নিবিড় আমবাগান, সেই আমবাগানে একটা রাতপাখি কঁ কঁ করে ডেকে ওঠে ঠিক তখুনি।
মনীন্দ্র তাকিয়েছিল ওষুধের আলমারিটার দিকে। কাঁচের আলমারির ভেতর তিন রকমের ওষুধ সাজানো। এলপ্যাথি হোমিওপ্যাথি কবরেজি। মনীন্দ্র সবরকমের চিকিৎসা জানে। এমন কি ফকিরি টোটকা এসবও।
