কথাটা এমন করে বলে ছেলেটা, গগনবাবুর বড় মায়া হয়। ছেলেটার নিশ্চয় কাঁঠাল খাওয়ার সাধ হয়েছে।
আনবেন, নিশ্চয় গগনবাবু আজ একটা কাঁঠাল আনবেন। ছেলের মাথায় হাত রেখে গগনবাবু বললেন, আনব বাবা। আনব।
তারপর কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে ঘর থেকে বেরোন।
বাইরে বেরিয়ে গগনবাবু টের পান বেজায় রোদ ওঠেছে আজ। বেজায় গরমও পড়েছে। সনাতনী বলেছে, এই গরমে গাছের সব কাঁঠাল পেকে যায়। সেই কথা শুনেই বুঝি কাঁঠালের বায়না ধরেছে ছেলেটা। আজ অফিসে গোটা দশেক টাকা উপরি পেলেই হয়। বিকেলবেলা অফিস থেকে বেরিয়ে বড়সড় একটা কাঁঠাল কিনবেন গগনবাবু। কাঁঠালটা কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। কাঁঠাল দেখে ছেলেমেয়েরা বড় খুশি হবে। সনাতনী বড় খুশি হবে। ছেলেমেয়ে এবং স্ত্রীর মুখ খুশি দেখা পুরুষ জন্মের শ্রেষ্ঠ উপহার। আজ সেই উপহারটা পাবেন গগনবাবু। কিন্তু অফিসে আজ সকাল থেকেই কিছু কিছু ভুল হতে থাকে গগনবাবুর।
সাধারণত এমন কখনও হয় না তার। আজ কেন যে হচ্ছে।
কাজ থামিয়ে গগনবাবু একটা সিগ্রেট ধরান। তারপর উদাস হয়ে সিগ্রেট টানতে থাকেন। গগনবাবুর পাশের টেবিলে বসে অল্পবয়সী নজরুল। ভারি ফূর্তিবাজ লোক নজরুল। মাথায় উত্তমকুমারের মতো চুল। সুযোগ পেলেই পকেট থেকে কাকুই বের করে চুল আঁচড়ায় সে। এখন তাই করছিল। তবে চুল আচিড়াতে গগনবাবুর উদাস ভঙ্গিতে সিগ্রেট টানাটা খেয়াল করল সে। বলল, কী হইছে দাদা? অমন কইরা সিগ্রেট টানতাছেন?
কথাটার জবাব দিলেন না গগনবাবু। বললেন, খাবেন একটা?
দেন।
কাকুই পকেটে রেখে গগনবাবুর টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল নজরুল। সিগ্রেট নিয়ে ধরাল। তারপর একাকী যেন নিজের কাছে বলছে এমন স্বরে বলল, শালা আজব আদমি। আসতেছে না কেন?
গগনবাবু উদাস গলায় বললেন, কে?
আছে এক মক্কেল। একটা কাজ কইরা দিছি। পঞ্চাশটা টেকা দেওনের কথা। পাত্তা নাই হালার।
গগনবাবু আস্তে করে বললেন, আসবে। অস্থির হচ্ছেন কেন?
নজরুল লোকটা ঝোঁকের মাথায় কথা বলে ঝোঁকের মাথায় কাজ করে। বলল, আপনে কইলেন দাদা, আইব!
হ্যাঁ আমার মনে হয়।
পঞ্চাশটা টেকা তাইলে আমি পামু?
পাবেন।
নজরুল আঙুল তুলে বলল, পাইলে দশ টেকা আপনের। ওয়ার্ড ইজ ল।
নজরুলের কথা শুনে ভারি একটা উত্তেজনা বোধ করেন গগনবাবু। দশটা টাকা পেলে কাঁঠালটা কেনা হবে। লাঞ্চ আওয়ারেই হেডক্লার্কের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যাবেন। মনটা ভালো লাগছে না। থেকে থেকে স্বপ্নের কথাটা মনে হয়। মনটা বড় উদাস লাগে গগনবাবুর।
সিগ্রেট শেষ করে আবার কাজে মন দেন গগনবাবু।
দেড়টার দিকে নজরুলের সেই মক্কেল এসে হাজির। এসেই নজরুলকে ডেকে নেয় বারান্দায়। দেখে গগনবাবু বুঝে যান দশটা টাকা তিনি পাবেন। উত্তেজনায় চেয়ার ঠেলে ওঠে দাঁড়ান তিনি। মিনিট পাঁচেক পর দামি সিগ্রেট মুঠো করে ধরে, ভারি একটা কায়দা করে টানতে টানতে ফিরে আসে নজরুল। এসে গগনবাবুর হাতে গুঁজে দেয় সবুজ একখানা দশ টাকার নোট। মুখটা একটু গম্ভীর তার। টাকা গুঁজে দিতে দিতে বলল, ওয়ার্ড ইজ ল।
টাকাটা হাতে পেয়ে পরিকল্পনাটা কাজে লাগিয় ফেলেন গগনবাবু। হেডক্লার্কের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। হেডক্লার্ক বুড়ো মানুষ। চুলদাড়ি সব সাদা হয়ে গেছে। তার। মুখে দাঁত আছে গোটা পাঁচেক। খুবই ভালো ধরনের মানুষ। খানিক আগেই বাড়ি থেকে আনা রুটি আর ডিমভাজা দিয়ে লাঞ্চ করেছেন। এখন তারিয়ে তারিয়ে চা খাচ্ছেন। গগনবাবুকে দেখে বললেন, কী?
শরীরটা ভালো নেই স্যার।
বাড়ি যাবেন?
জি স্যার।
চলে যান, চলে যান।
হেডক্লার্ক সাহেব এত সহজে ছুটি দিয়ে দেবেন ভাবেননি গগনবাবু। খুবই খুশি হলেন, তিনি। হাত তুলে হেডক্লার্ক সাহেবকে একটা আদাব দেন। তারপর অফিস থেকে বেরোন।
ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের কাছে এসে অনেক দরদাম করে সাড়ে চার টাকায় লম্বা মতন বিশাল কাঁঠাল কেনেন গগনবাবু। কাঁঠালটা বেশ পাকা, বেশ ভারি। শিক দিয়ে পাকানো হয়নি। একদম গাছপাকা। দুজায়গায় খারার মাঠের মতো ইরল চিরল ফাটা। সেই ফাটা দিয়ে ভুর ভুর করে বেরুচ্ছে তীব্র গন্ধ। গালা কাঁঠাল হবে। মুড়ি দিয়ে গালা কাঁঠাল, আহা বড় স্বাদের। টাকা তো পকেটে আছেই, সেরখানেক মুড়িও কিনে নেবেন গগনবাবু। তারপর রাতের বেলার সব ছেলেমেয়ে নিয়ে গোল হয়ে বসে কাঁঠাল মুড়ি খাবেন। হাতে সামান্য সরষের তেল মাখিয়ে অতিশয় যত্নে কাঠালের কোয়া খুলে খুলে দেবে সনাতনী।
বনগ্রামের কাছাকাছি এসে গগনবাবু টের পান কাঁঠাল বহন করা কাঁধটা বড় ব্যথা হয়ে গেছে। কাঁঠালটা বেশ ভারি। দশ বার সেরের কম হবে না।
কাঁধ বদল করার জন্যে দুহাতে কাঁঠালটা শূন্যে তুলে ধরেন গগনবাবু। তারপর কায়দা করে অন্য কাঁধে বসাতে যান। হাত দুটো কি মুহূর্তের জন্যে সামান্য কেঁপে যায় গগনবাবুর। কাঁঠালটা ধপ করে পড়ে রাস্তায় তারপর গড়গড় করে গড়িয়ে যায় রাস্তায় একেবারে মাঝে। রাস্তায় ম্যালা গাড়িঘোড়া ছিল, গগনবাবু খেয়াল করেন না। পাগলের মতো দিশেহারা হয়ে ছুটে যান কাঁঠাল ধরতে। ঠিক তখুনি বুনো মোষের মতো গোঁ গোঁ করতে করতে ছুটে আসে ট্রাক। গগনবাবু দুহাতে কেবল ধরেছেন কাঁঠালটা। ট্রাক এসে দলাইমলাই করে দিয়ে যায় কাঁঠালটাকে, গগনবাবুকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গগনবাবু দেখতে পান ধুধু কালো একটা পথ নির্জনে পড়ে আছে। পথের দুপাশে সার ধরা গাছপালা। কোথাও কোন শব্দ নেই, হাওয়া নেই। পাতলা বার্লির মতো ম্লান একটা আলো ফুটে আছে চারদিকে। সেই আলোয় কালো পথটা বড়ো অলৌকিক মনে হয়। দূরে বহুদূরে পথের একেবারে শেষ মাথায় সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা একটা মানুষ। ছোট্ট পাখির মতো ধীরে হেঁটে যায়। কোথায় কোন প্রান্তরের দিকে যায়, গগনবাবু বুঝতে পারেন না।
গাছপালার ভূমিকা
ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে মাথা বের করে সাপটা দেখে চারদিকের ঘন গাছপালায় সকালবেলার রোদ খেলা করছে। ডালপালার ফাঁকফোকর দিয়ে গাঁদা ফুলের পাপড়ির মতো রোদের টুকরো এসে ছড়িয়ে পড়েছে বনভূমিতে। চারদিকে পোকামাকড় ডাকছে, কীটপতঙ্গ ডাকছে। ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে মধুপোকা, প্রজাপতি আর দু-একটা ফড়িং। কাছে কোথাও কোন ঝোপের আড়ালে কিংবা কোন গাছের ডালে, পাতার আড়ালে বসে মিষ্টি সুরে ডাকছে একটা পাখি। মোলায়েম বাতাসটা আছে। গাছের পাতায় মৃদু কাঁপন তুলে, ফুলের গন্ধ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বনময়। কোথাও কোনও বিপদের সম্ভাবনা নেই দেখে সাপটা তার প্রাচীন লম্বা শরীরটা ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে টেনে বের করে। সামনে কোমল দুর্বাঘাসের ছোট্ট একটা মাঠ উদাস, বিষণ্ণ ভঙ্গিতে পড়ে আছে। মাঠের পাশে হলুদ ফুলের ঝোপটার কাছে দীর্ঘকায় কী একটা প্রাণী খানিক এদিক যাচ্ছে খানিক ওদিক যাচ্ছে। স্থির হয়ে প্রাণীটার দিকে তাকায় সাপটা। তারপর বুঝতে পারে, প্রাণীটা মানুষ। মানুষ দেখে মেজাজটা বিগড়ে যায় তার। এই সময় অন্য কোনও বিপজ্জনক জীব দেখলে মাথায় রগ চড়ে যায়। খানিকটা ভয়ও হয়। মানুষকে বিশ্বাস নেই।
