মেমসাহেব জবাব দিলেন না, ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন। উঁকি দিয়ে কুঞ্জ দেখেছে, সোফায় ইন্দ্রাণী আধশোয় হয়ে। করপল্লবে দু’চোখ আচ্ছাদিত। অনেক পরে মেমসাহেব উঠলেন, চাবি দিয়ে খুললেন আলমারি। কুঞ্জ তখনো দেখছে। থরে থরে সাজানো শাড়ি, জামা, পেটিকোর্ট। ভাজ খুলে খুলে মেমসাহেব দেখছেন।
নিঃশ্বাস পড়ল না কুঞ্জর। সাহেব নেই। এই অবসরে তবে পলিয়ে যাবেন মেমসাহেব। বেছে নিচ্ছেন শুধু নিজের পছন্দমতো দু’চারখানা জামাকাপড়।
কিন্তু না। মেমসাহেব সবই ফেরএকে একে গুছিয়ে রাখলেন আলমারিতে। শুধু চোখ ঝলসানো এক প্রস্থ পোষাক নিয়ে গোসল কামরায় ঢুকলেন।
একটু পরে বেরিয়ে এলেন নবরূপে; আয়নার সমুখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরলেন কর্ণাভরণ, যাতে তাকে সবচেয়ে মানায়।
কুঞ্জর তলব পড়ল খানিকক্ষণ বাদে। আজ ক’জন লোক আসবে, মেমসাহেব বললেন, তুমি দরজা জানালাগুলো একটু ঝেড়ে-পুঁছে রাখ।
বেলা পড়তে না পড়তেই হোটেলের গাড়িতে খাবার এল। নার্সারির লোক পৌঁছে দিয়ে গেল গুচ্ছ গুচ্ছ শ্বেত পদ্ম। ধবধবে ঢাকনা পড়ল ছোট ছোট টেবিলে; ঝকঝকে চিনে-মাটির বাসন বেরুল অনেকদিন পর।
তারপরে বেলা গড়িয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে প্রাঙ্গণে ঘস ঘস শব্দ শোনা গেল কয়েকটা গাড়ির সিঁড়িতে একসঙ্গে অনেকগুলো ঠক ঠক জুতো।
কুঞ্জ দেখল, স্ব সিল্ক পালুন হাওয়াই কুর্তার দল।
বার সঙ্গে আলাপ করছে মেমসাহেব, হেসে হেসে করমর্দন করছেন। ওদের বার জন্যেই মেমসাহেব পিয়ানোতে একটা গৎ বাজালেন; তারপর,—চৌধুরী সাহেবের ইশারায় বেছে বেছে খেতে বসলেন এমন একটা লোকের পাশে, যার ভুঁড়ি ঠেকেছে প্লেটের কিনারে, রোমশ একটি হাতের চার আঙুলে চারটি আংটির ঝিকিমিকি।
কয়েকটি খাবার নিজের পাতে নিল লোকটা; কটা দিল মেমসাহেবের ডিশে। হাতে হাতে ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে গেল। মেমসাহেব হাত সরালেন না। সরেও বসলেন না পর্যন্ত। কুঞ্জর তখন চোখদুটো জ্বলছে।
তারপর কী একটা রসিকতা করল লোকটা, সবাই হেসে উঠল। চৌধুরী সাহেবও যোগ দিলেন। মেমসাহেব লাল হলেন, কিন্তু মুহূর্তমাত্র। যেন রাগ করলেন। তারপর নিজেও সেই হাসিতে যোগ দিলেন।
চৌধুরী সাহেব বললেন, এসব বলে ইন্দুকে তুমি লজ্জা দিতে পারবে না ছবিলাল। ও ‘ফ’ হয়ে গেছে কবে। স্টেজ সাই নয়। এম্পায়ারে নেচেছে ও তো কয়েকবার।।
রিয়েলি! ছবিলাল বলল,–আসুন না মিসেস চৌধুরী, এই ছবিতেই নেমে পড়ুন তবে।
মেমসাহেব বললেন। আই ওন্ট মাইন্ড অব ইফ আই ডু-হেসে উঠলেন খিলখিল করে। কুঞ্জ সরে এসেছে বাগানের এককোণে। শরীরের সব কটা রগ যেন সলতে হয়ে জ্বলছে।
ওর কুর্তার পকেটে হাত দিতেই সযত্নে রাখা কটা জিনিস বেরুল। কুঞ্জ একটার পর একটা ছুঁড়ে ফেলে দিল—যতদূর পারে।
শাড়ির আঁচলের কটা টুকরো, চুলের কাটা। চিরুনি থেকে ফেলে দেওয়া কয়েক গাছি দীর্ঘ চুল, কয়েকটি রঞ্জিত নখাগ্র।
দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরেছে কুঞ্জ। ওর এতদিনের গোপন সংগ্রহ, এত দিনের চুরি, পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাড়িয়ে দিতে দিতে অস্ফুট ক্রুদ্ধ স্বরে বলল, বাঁদি, সব বাঁদি।
ছায়া গোধূলি – উত্তম ঘোষ
…অনেক ভেবে মনস্থির করে ফেলেছি। তোমার দুই চোখের অতলগভীর দৃষ্টির আহ্বানকে ফিরিয়ে দেবার শক্তি আমার নেই। কাল তোমার জন্মদিনের সানন্দক্ষণে তুমি আমাকে আপন করে নিয়ে একান্ত নিভৃতে যে শপথ গ্রহণ করবে, সেই হবে আগামী দিনে আমাদের মিলন স্বর্গ রচনার শুভ সূচনা। …কোন ভয়, কোন সংকোচ আর নেই। কথা দিলাম, আমি আসছি, তোমার কাছে, চিরদিনের জন্য। …
‘তোমার, এবং এখন একমাত্র তোমার জয়িতা’—
এই কথা ক’টাও লেখা হয়ে গেল।
রাত একটা।
টেবিল ল্যাম্পের আলোর নীচে জয়িতার লেখা মুক্তোর মত অক্ষরগুলো হাল্কা নীল রাইটিং প্যাডে মনে হতে পারে সন্ধের আকাশের গায়ে কতগুলো ছেঁড়া ছেঁড়া কালো মেঘের টুকরো। কালো, কিন্তু উজ্জ্বল। কালো। জগতের আলো।
পাশের ঘরেনা, ঠিক পাশের ঘর বললে ভুল হবে, ঘরের বাইরে লাউঞ্জে একটা সোফা কাম-বেডের ওপর জয়র চাদরমুড়ি দেওয়া অস্তিত্বটাকে এখুনিই একটু খোঁচা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ হচ্ছে। যদিও অনেক রাতে খাটাখাটুনির পর শুয়েছে। বেচারা, হ্যাঁ, জয়িতার এই মুহূর্তে সব মিলিয়ে জয়ন্তকে একটু বেচারা’, দ্য পুওর ফেলো, মনে হচ্ছে বৈকি!
–কিছু বলেই ডাকতে হবে না।
–তার মানে।
—আমাদের মধ্যে ডাকাডাকির পর্ব শেষ হয়ে আসছে।
কিছুক্ষণের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল জয়ন্ত। সত্যি, সে এতখানি কল্পনা করেনি। অনেক গুজব কানে আসছিল, পথে-ঘাটে। অফিসে, দু-চার জন তথাকথিত বন্ধুর মুখেও লাউঞ্জে সোফাঁকাম-বেডে জয়ন্তের শয্যাগ্রহণ শুরু হয়েছে প্রায় একবছর আগে। ভালোই মনে আছে জয়িতার—এবং জয়ন্তেরও কবে শেষ তারা এক শয্যায় নিশিযাপন করেছিল। এবং কবে শেষবারের মতো—এই বিশাল সুন্দর আধুনিক দ্বি শয্যার আশ্রয়ে তারা একত্র হয়েছিল নিতান্ত দ্বিধাগ্রস্ততার মধ্যে! এবং সেই নিতান্ত মেকানিকাল এক উপভোগ্যতার শেষে তাদের বাকি রাতের কথাবার্তাগুলো দুজনের কারুর পক্ষেই এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাবার নয়।
—আর অভিনয় করতে পারছি না—জয়িতা আক্ষেপের সুরে স্পষ্টই বলে ফেলেছিল।
—অভিনয়?—জয়ন্ত বোধহয় বুঝেও না বোঝার ভান করছিল। অর্থাৎ সে-ও অভিনয় করছিল। অন্তত জয়িতার তাই মনে হয়েছিল।
