-হ্যাঁ, আজ সাত-আট মাস ধরে আমি অভিনয় করছি। কিন্তু খুব কাঁচা ভাবে, হেলাফেলা করে যাতে তুমি সেটা ধরে ফেলতে পার। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে হয় তুমি ধরতে পারছ না আমার ছদ্ম আচরণগুলো, আর নয়, ধরতে চাইছ না—ইচ্ছে করেই হয়তো।
—আমি কিন্তু সত্যি তোমার কথার মানে ধরতে পারছি না জয়ি—
–প্লিজ আমাকে নাম ধরে ডাকাটা বন্ধ কর।
–সে কি, কি বলে ডাকব তাহলে?
—কিছু বলেই ডাকতে হবে না।
–তার মানে।
—আমাদের মধ্যে ডাকাডাকির পর্ব শেষ হয়ে আসছে।
কিছুক্ষণের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল জয়ন্ত। সত্যি, সে এতখানি কল্পনা করেনি। অনেক গুজব কানে আসছিল। পথে-ঘাটে, অফিসে, দু-চার জন তথাকথিত বন্ধুর মুখেও কিছু কিছু কথা সে শুনে আসছিল। জয়িতার কিছু বেপরোয়া আচরণ এবং উত্তরোত্তর তার বৃদ্ধি কলায় কলায়, এবং পাড়ায় নানা বয়সি রাশি লোকেদের ফিসফিস—এমন কি কিছু রোয়াকের ছেলের মুখ ঘুরিয়ে ছুঁড়ে মারা পরোক্ষ মন্তব্য–সব কিছুই বলছিল—সামথিং ইজ রং।
তারপর এই ব্যাপারগুলো, হুইস্পার ক্যাম্পেন ইত্যাদি বেশ সোচ্চার এবং স্পষ্ট হয়ে উঠল। কিছু ‘চক্ষেণ পশ্যতি’ ব্যাপারও ঘটল। তবু জয়ন্তর মন বলছিলনা, অসম্ভব, এ হতে পারে না। সারাজীন অভাবে কাটিয়েছে জয়িতা, এখন একজনের কল্যাণে সে একটু সুখের মুখ দেখতে পাচ্ছে তাই সাড়া দিচ্ছে। এর বেশি কিছু নয়।
আজ পাঁচ বছরের বেশি হয়ে গেল—জয় শ্রীহীন সংসারের শ্রীবৃদ্ধির কোন সম্ভাবনাই ছিল না। গয়না, কসমেটিক্স দুরের কথা, একটা ভালো শাড়ি কোনদিন স্ত্রীর হাতে তুলে দিতে পারেনি জয়স্ত। তাই–
কিন্তু, তাই কি? জয়িতাকে তত বিয়ের পর থেকে টানা চার বছর একবারও মনে হয় নি টাকাপয়সার টানাটানিতে সে অসুখি! তাই সেই রাতে জয়ন্ত প্রশ্ন করেছিল—কেন, আমাদের ডাকাডাকির পর্ব শেষ হবে কেন?
জয়িতা জ্বলন্ত দৃষ্টিবাণ ছুঁড়ে বলেছিল–তুমি কি অন্ধ?
সত্যিই জয়ন্ত অন্ধ। নইলে আরও স্পষ্ট করে উত্তর শুনতে চেয়েছিল কেন? যে উত্তর শোনার আগে তার বধির হওয়া ভালো ছিল। চোখ এবং কান থাকতেও সে বোধহয় অন্ধ ও বধির হতেই চাইছিল।
—আমি কিন্তু সত্যি কিছু বুঝঝি না।
—তবে শোন, আমি শ্ৰীমন্ত মুখার্জীকে ভালবাসি।
ঘরে বজ্রপাত হয়েছিল। কিন্তু তাই বাজপড়া একটা গাছের মতো হয়ে গিয়েছিল জয়ন্ত। আর জয়িতাকে মনে হচ্ছিল একটা রূপোলী সাপ—যেটা বিদ্যুৎ হয়ে বাজটাকে ডেকে এনেছিল।
দোষটা তো জয়ন্তেরই। তার কারখানার মালিক শ্ৰীমন্ত মুখার্জির সাথে কোন প্রতিযোগিতার প্রশ্ন ওঠে না। মুখার্জি এন্টারপ্রাইজ-এর একমাত্র কর্ণধার শ্ৰীমন্ত সত্যি শ্রী ও শোভায় মস্ত। তার পাদনখকণা জয়ন্ত। তাই শ্ৰীমন্ত যখন জয়িতাকে আহ্বান জানিয়েছিল, বলেছিল— আমি কোন জোর করব না। দাবি জানাব না। শুধু আবেদন করব। তুমি আমার ঘরে এসো
—কিন্তু–চমকিত জয়িতা সেই সন্ধেবেলা চমকেছিল, আবার পুলকিত হয়েছিল। অপরাধবোধের সাথে চোখের সামনে ঝলকানি দিচ্ছিল এক অনন্ত সুখের জগৎ—বিশাল বাড়ি, অতি সুন্দর গাড়ি, আর শিক্ষিত রুচিশীল বড়লোক এক পুরুষের ডাক। হোক না তার বয়স একটু বেশি, কিন্তু তার দেহের সৌন্দর্য অটুট। মনের সৌন্দর্যও মুগ্ধ করার মতো। সত্যি শ্ৰীমন্ত।
—কিন্তু কি?
—জয়রে কি দোষ?
—ওর দোষ ওর অযোগ্যতা। ওর দারিদ্র। তোমাকে যেখানে ঠাই দেওয়ার কথা, সেটা দেবার ক্ষমতা ওর নেই।
সেটা ছিল শ্ৰীমন্ত মুখার্জীর চতুর্থ আগমন। জয়ন্ত জয়িতার দীর্ণজীর্ণ ঘরে। জয়ন্ত তখন দোকানে মিষ্টি কিনতে গেছে। হঠাৎ বসে’র গাড়ির হর্নে বিস্মিত হয়ে আপ্যায়নের সাধারণ নিয়মটুকু মানবার জন্য তাকে ছুটতে হয়েছিল বাইরে—পকেটের সামান্য কয়েকটা টাকা সম্বল করে, বিশাল বিমূঢ়তা নিয়ে।
জয়িতা ব্যস্ত হয়েছিল রান্না ঘরে যেতে। চা করতে। কিন্তু জয়িতার একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরেছিল শ্ৰীমন্ত। শ্ৰীমন্তর কঠিন মুঠোতে জয়িতার হাত যেন বন্দী হয়ে হারিয়ে গিয়েছিল।
-এখুনি চা করতে ব্যস্ত হতে হবে না।
–বসুন, পাখাটা পাড়ি।
–না, তারচেয়ে আমরা বারান্দায় দাঁড়াই। সুন্দর হাওয়া আসছে।…. আচ্ছা একেই কি ‘দখিনা পবন’ বলে?
কারখানার মালিক-এর মধ্যে এত কবিত্ব!
জয়িতার মুগ্ধতা স্বাভাবিক।
এবং ঠিক যে সময়ে সিঙ্গাড়া-আর রসগোল্লা কিনে, পকেটের পাই-পয়সা উজাড় করে বাড়ির দিকে ছুটছিল জয়ন্ত, হাঁটাপথে এখনও প্রায় দশ মিনিট—তখনই শ্ৰীমন্ত জয়িতাকে কাছে টেনে নিয়েছিল। সেই অন্ধকার বারান্দায়। বলেছিল— কোন ভয় নেই, আমি তোমায় চিরকালের জন্য চাই। সামাজিক মর্যাদা দিয়ে চাই। আমার অতীত ভুলিয়ে দাও। আমার কাছে এসো।
—কিন্তু আমার এই ঘর—
এ ঘরে তোমাকে মানায় না।
শ্ৰীমন্তের আলিঙ্গনাবদ্ধ জয়িতা বাকরুদ্ধ। শ্ৰীমন্ত এখন প্রতিশ্রুতি চাইছে—
—তুমি কথা দাও—
ঠিক তখুনিই কি উত্তর দিত জয়িতা তা সে নিজেও জানে না। তাই বোধহয় ‘ঠুং’ করে কলিং বেলটা বেজে উঠল। খাবারের প্যাকেট হাতে জয়ন্ত দ্বারের ওপারে। মালিকের আপ্যায়নের জন্য মরিয়া। যদিও মালিক ইতিমধ্যেই নিদারুণ অ্যাপায়িত বোধ করেছেন। পকেটের শেষ পয়সা দিয়ে জয়ন্তের আনা সিঙ্গাড়া রসগোল্লা তাই মূল্যহীন।
শ্ৰীমন্ত মুখার্জী শুধু হেসে বলেছিলে—তুমি আবার ছুট মারলে কোথায়? আমি চা-ছাড়া কিছু খাব না।
