জবাব হয়ে যাবে শশীদা। কুঞ্জর শহর বাস বেশ কিছুদিন হয়ে গেল, গলায় আর তেমন আন্তরিকতা ফোটে না। এমন কি শশীর সুপারিশেই যে এখানে ঢুকেছিল সেটাও যেন ভালো মনে নেই কুঞ্জর।জবাব হয়ে যাবে শশীদা! কারুর পুত্র বিয়োগের খবর পেয়ে মেমসাহেব ফোন তুলে যে সুরে শোকাতুরাকে সান্ত্বনা দেন, কুঞ্জর গলাতেও সেই নিরুত্তাপ নাগরিকতা।
আসল খবর জানা গেল ক্রমে ক্রমে। শেয়ারের খেলায় ফকির হয়েছেন চৌধুরী সাহেব। কাঁচা টাকা প্রায় সবই খাঁচাছাড়া চিড়িয়ার মত উধাও, স্থায়ী জিনিসের মধ্যে এই বাড়ি, এই গাড়ি আর কিছু জমি—সেখানেও স্পেকুলেশন—সেও বঁড়শে বেহালার দক্ষিণে, নীচুডাঙ্গায় ভূমণ্ডলের মতো তারও তিন ভাগ জল একভাগ স্থল।
ভেজানো দরজার বাইরে কুকুরটা টা টা করে, কেউ ফিরেও চায় না, দরজার আড়ালে সাহেব-মেমের কলহ চলে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে ঝিমোয় কুঞ্জ, কী কথা হয় বোঝে না, শুধু চাপা গলার ক্রুদ্ধ তর্জন কানে আসে।
মাঝে মাঝে কুঞ্জ চমকে ওঠে, এই এক্ষুনি পর্দা ঠেলে মেমসাহেব বেরিয়ে আসবেন, একটি মাত্র আঙুলের ইশারায় ওর জবাব হয়ে যাবে। যে পথে গেছে বাগানের ফুল, লনের ঘাস, দেয়ালের কলি, সেই পথেই কুঞ্জকে যেতে হবে।
শক্ত করে টুলটা চেপে ধরে কুঞ্জ, চোখের পাতা ভিজে ওঠে। যাবে না, যেতে পারবে না। কাঁপা কাঁপা আঙুল দিয়ে কুর্তার পকেটটা হাতড়ায়, মুঠি করে ধরে। কে জানে কুঞ্জ ওখানে কী রেখেছে।
পা টিপে টিপে দরজায় চোখ রাখে। সাহেব দাঁড়িয়ে আছে টুলের ওপর পা রেখে। একটা হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে স্পষ্টই উত্তেজিত।
—দেখাবে না, দেখাবে না তুমি আমাকে তোমার হিসাব?
—না। সংসার খরচের টাকায় তোমাকে হাত দিতে দেব না; এটা আমার।
-তোমার। এমন স্বরে সাহেব হেসে উঠলেন যে কুঞ্জর মনে হল জানালার সার্সি ঝনঝন করে উঠল।—তোমার! তোমাকে কে চেনে ইন্দু। সবাই চেনে মিসেস চৌধুরীকে। এর কোন জিনিষটা তোমার? সংসার খরচের টাকার কথা ছেড়ে দাও। এই মুহূর্তে তোমার বাক্সের চাবি ছিনিয়ে নিতে পারি। দেখতে পারি কত আছে তোমার পাশ বইয়ে। এমন কি, এক টানে ছিঁড়ে নিতে পারি তোমার কানের ওই বার্লিংটনের বাড়ির জড়োয়া দুল—
কুঞ্জ শিউরে উঠল, দেয়ালটা ধরে, সামলে নিল, সরল না তবু। সভ্য মানুষটির মুখোশ বুঝি একেবারে খসে-খসে।
কিন্তু, না। সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইন্দ্রাণী, দেবী প্রতিমার মতো, সাহেবের মাথাও যেন ছাড়িয়ে গেছেন। দেবীর মতো অস্ত্র-শস্ত্র নেই হাতে কিন্তু ভঙ্গিটা এক। তাছাড়া দ্রুত ওঠা পড়া বুকের সাহস প্রোজ্জ্বল চোখের ঘৃণা, ওই তো তার আয়ুধ।
একটি কঠিন আঙুল তুললেন ইন্দ্রাণী, একটি নিশিত ছুরিকার মতো, রঞ্জিত নখাগ্রে বিজলী ঝলসে গেল-যাও, এক্ষুনি চলে যাও তুমি। যাও।
সেই মুহূর্তে ইন্দ্রাণীর পায়ের কাছে কুঞ্জ মূৰ্ছিত হয়ে পড়তে পারত। পেরেছেন, ইন্দ্রাণী পেরেছে। তার কুড়িবুড়ি বকুলদি যা পারেনি, একটি মাত্র নির্ভীক আঙুল তুলেই মেমসাহেব সেই অসাধ্য সাধন করেছে।
সাহেব বেরিয়ে যেতেই মেমসাহেব শুয়ে পড়লেন, আলো নিবিয়ে। পা টিপে টিপে সেই ঘরে ঢুকল কুঞ্জ। কী ঠেকল পায়ে। একটা কটা বোধ হয় মেমসাহেবের চুলের।
সেই যে বেরিয়ে গেলেন সাহেব, আর সাতদিনের মধ্যে ঘরমুখো হলেন না। বাগানতো কবেই শুকিয়েছিল, এমন ধুলোর সর পড়েছে বারান্দায়, পদায়, আসবাব। মেমসাহেবের ভ্রুক্ষেপ নেই! ঠোঁটের কোণের হাসিটুকু মিলিয়ে গেছে,এসেছে একটু কঠিন দৃঢ়তা। পোষাকের সেই ঝিমঝিম এসেন্স গন্ধটুকু নেই, এ ক’দিন মেমসাহেব মোটে প্রসাধনই করেননি। কাছেও ডাকেননি কুঞ্জকে। তবু দূর থেকে দেখেই কুঞ্জর বুক ভরে গেছে। ইন্দ্রাণী বিদ্রোহী, বন্দিনী, তবু বিজয়িনী।
সাতদিন পরে ফিরে ঘরের মধ্যে গুনগুন আলাপ শুনে কুঞ্জর অবাক লাগল। শশী বলল, সাহেব কাল ফিরেছে যে। অনেক রাত্তিরে গাড়ি এল, শুনিসনি? সাহেব গিয়েছিলেন বোম্বাইয়ে।
-কেন?—অর্থ নেই, তবু কুঞ্জ জিজ্ঞাসা করল।
পুরানো চাকর, কী করে সব খবরই যেন চটপট জানা হয়ে যায় শশীর। একটা ফিলিম কোম্পানী খোলার ইচ্ছে সাহেবের অনেক দিনের। এবার শেয়ার বাজারে মার খেয়ে সেই ইচ্ছেটা আরো প্রবল হয়েছে। যা কিছু ঝড়তি-পড়তি পুঁজিপাটা আছে সব একত্র করেছেন। বোম্বাই থেকে পাকড়ে এনেছেন জনকয়েক চাইকে। বেশির ভাগ টাকা তারাই দেবে, বাংলা বই কলকাতাতে ভোলা হবে।
—তারা সব কোথায়? কুঞ্জ জিজ্ঞাসা করল।
—তারা উঠেছে একটা বড় হোটেলে। আজ বিকেলে জোর একটা পার্টি।
সাহেব বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। শি দিলেন খানিকক্ষণ, নীল আকাশটার দিকে চেয়ে। লুপিকে কোলে তুলে আদর করলেন।
মেমসাহেবও এসেছেন পিছনে পিছনে। চৌধুরী বললেন, আমি তাহলে এখন চললুম। ছ’টার আগেই ওদের নিয়ে আসব। তুমি সব ব্যবস্থা এদিকে ঠিক করে রেখ, হোটেলে ফোন করলেই ওরা সব ঠিক ঠিক পৌঁছে দিয়ে যাবে।
—পারব না।
সাহেব চটলেন না, হাসলেন,–নটি গ্যল; সেম অ্যাজ এভর।
—বিকেলে আমার কাজ আছে; আর্টগ্যালারিতে সিম্পোসিয়ম।
—টু হেল উইথ ইয়োর সিম্পোসিয়ম। সাহেব বললেন, না না, এ কাজটা তোমাকে করতেই হবে ইন্দু; এটা হাসিল হলে আমার ভালো, তোমার ভালো। ইউ ক্যান ডু ইট, এ্যান্ড আই নো ইউ উইল।
