–সতী-নকখি! কই পাতানো ভাইয়ের সঙ্গে গলাগলি করে যাওয়ার সময় এই হিসেব তো ছিল না। ওর সঙ্গে কীসের এত গুজগুজ ফুসফুস। ও শালাকে আজই মেরে তাড়াব।
দম নিল প্রাণকৃষ্ণ, ফের হতাশার ভঙ্গিতে হাত ঘুরিয়ে শুরু করল : আর কী, যা কিছু আশা-ভরসা ছিল, সব ফরসা হয়ে গেল। কী খোয়া যেত তোমার সুবোধের কথাটা রাখলে আর মাসখানেকের মধ্যেও একটা কাজ যদি জোটাতে না পারি, তখন কোথায় থাকবে তোর এত তেজ। বেশ্যাবিত্তি করেও কুল পাবিনি।
মেরে তাড়াতে হল না, কুঞ্জ সেদিন নিজে থেকেই সরে পড়ল। তারপরেও কিন্তু একদিন লুকিয়ে দেখা করতে এসেছিল বকুলের সঙ্গে। দেখল তালাবন্ধ।
মোড়ের কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, দেখল গাড়ি থেকে নামল বকুল।
ভাঙা চশমা জোড়া লাগেনি, নতুন চশমা সুবোধের চোখে। ভুরুর ওপর ছোট একটা ব্যান্ডেজ।
উল্টোদিকে মুখ ফিরিয়ে হন হন রাগে কুঞ্জ চলতে শুরু করল।
সব শুনে শশী বলল, রাগের কী আছে। বকুল ঠিকই করেছে কুঞ্জ। শশীর সব ঠাণ্ডামাথা বিবেচনা। বলল, স্বামীর ইচ্ছেই তো ইস্তিরীর ইচ্ছে। স্বামীর ভালোই তো ইস্তিরীর ভালো। তার আবার আলাদা সুখ কী, আলাদা ইজ্জৎ কী।
কুঞ্জ তবু বলল, তাই বলে পরপুরুষের–
শশী বলল,—পরপুরুষ আবার কী। স্বামী যার হাতে সঁপে দেন তার মধ্যেই তো স্বামীকে ধ্যান করতে হয়। গোপিনীরা যেমন করেছেন। নিজেদের শ্রীকৃষ্ণের কাছে সঁপে দিতেন, পড়িসনি? এর মধ্যে কোনো পাপ নেই কুঞ্জ। বকুলের কোন দোষ নেই।
দোষ তো নেই, কিন্তু মন বোঝে কই। মাঝে মাঝে বকুলের কাছে যায় বটে, কিন্তু গলির কাছাকাছি এসে নাকে হাত দেয়। এখানে কি সে কখনও ছিল!
এখন মনে হয় দুঃস্বপ্নের মতো। আঢাকা নর্দমার গন্ধ, ফুটো চালে উঁকি দেওয়া শত নেত্র ইন্দ্র আকাশ, আর শত ছিদ্র কাপড়ে রোগা-রোগা কতগুলো মেয়েমানুষের ঘোরাঘুরি।
ওখানে শুধু ফুলে ফুলে রামধনু, সবুজ ঘাস-গালিচা, ঝাউউদাস হাওয়া আর, আর মেমসাহেব।
একটি স্বপ্ন সুড়ঙ্গের মতো সম্মোহিত দিন-রাত্রি।
কোথায় কোন্ স্পোর্টসে বখশিস বিতরণ করে এসেছেনে মেমসাহেব। এসেই শুয়ে পড়েছেন বিছানায়। মাথা ধরেছে। একটু ওডিকোলন ছিটিয়ে দিলেন কপালে, তাতেও ব্যথা কমল না, অস্ফুট গোঙানি শুনতে থাকল কুঞ্জ, দুরে বসে। একটু পরে মেমসাহেব ওকে ইসারায় ডাকলেন, ছোট রুমালটা শুকিয়ে গিয়েছিল, আবার ভিজিয়ে আনতে বললেন।
শয়নকক্ষলগ্ন স্নানঘর। এটুকু পথ যেতে আসতে কুঞ্জর তিনমিনিট কেটে গেল। এতক্ষণ ধরে নিবিড় স্পর্শে ইন্দ্রাণীর কপালের সবটুকু তাপ আহরণ করেছে রুমালটা। সেই তাপটুকু কুঞ্জ শুষে নিতে চাইছে করপৃষ্ঠের রোমকূপ দিয়ে। বেসিনে জল ঝরছে, ঝরছে তা ঝরছেই, ইন্দ্রাণী কাতর গলায় ডাকলেন, কুঞ্জ! কী করছিস এতক্ষণ ধরে।
চকিতে সম্বিত ফিরে এল। থরথর হাতে ভিজে রুমালটা মেমসাহেবের হাতে কুঞ্জ তুলে দিল।
একটু পরেই ঘরে ঢুকেছেন চৌধুরী সাহেব। সুইচবোর্ডে হাত দিতেই ইন্দ্রাণী বলেছেন, প্লিজ, ডোন্ট।
মাথা ধরেছে?
পাশ ফিরে শুয়ে ইন্দ্রাণী বলেছেন, ইয়েস, বীষ্টলি।
তখনকার মতো কেটে গেছে বটে, কিন্তু সেই স্বপ্নমোহ বারবার ফিরে এসেছে কুঞ্জর।
আর্ট একজিবিসনে যাবেন, বিছানা থেকে উঠে মেমসাহেব চোখে জল দিতে গেছে, বিছানাটা ফের ঠিক করতে গিয়েও কুঞ্জর হাত সরেনি। চাদরে বালিশে একটি দিব্যদেহের ছাঁচ, একটি অস্পষ্ট মধুর সুরভি।
জুতো পালিশ করতে গিয়েও দেরী হয়েছে, ধমক খেয়েছে, তবে কুঞ্জর হুঁস হয়েছে।
আরেক দিন।
দামী শাড়িখানা কুঞ্জই ধুতে দিয়েছিল। ভাজ খুলেই মেমসাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন, এ কী, এমন করে আঁচলটা কাটলে কে।
তলব পড়ল কুঞ্জর।
—এটা কে ধুতে দিয়েছিল, তুমি?
কুঞ্জ স্বীকার করল। তৎক্ষণাৎ ওকে শাড়িটা দিয়ে ইন্দ্রাণী বললেন—যাও, এক্ষুণি এটা ওদের দোকানে দেখিয়ে নিয়ে এস। বল পুরো দাম কাটব আমি।
কুঞ্জ তবু নড়ে না।
মেমসাহেব ধমক দিলেন আবার—যা-আও! দাঁড়িয়ে আছ যে।
পলক পড়ছে না কুঞ্জর চোখের। ওর পেছনের দেয়ালে বিজলী আলো,সামনে মেমসাহেব। হঠাৎ কুঞ্জর নজরে পড়েছে, মেমসাহেবের গায়ে ওর সম্পূর্ণ দেহের ছায়া। কুঞ্জর চিনতে ভুল হয়নি, সে ছায়া ওর নিজের। নিনখ শুভ্র পায়ের আঙুল আঙুল ছুঁয়ে সাপেরমত বেয়ে বেয়ে উঠেছে সে ছায়া শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে বাধা পেয়ে পেয়ে, বাধা না মেনে, ছায়া করাঙ্গুলি থরথর করে কাঁপছে ইন্দ্রাণীর দুঃশাসন উচ্চচূড়। স্তনে, কুঞ্জর রুগ্ন, ধুকধুক বুক ছায়া হয়ে মিশে আছে ইন্দ্রাণীর অবারিত গ্রীবামূলে, আর ইন্দ্রাণীর ঈষৎভিন্ন অধরোষ্ঠ কুঞ্জর ছায়া কণ্ঠে আসক্ত।
মাথায় কুঞ্জ ইন্দ্রাণীর চেয়ে ছোট, কিন্তু ছায়া হয়ে ছাড়িয়ে গেছে।
ইন্দ্রাণী ফের অসহিষ্ণু ধমক দিলেন, কই গেলে না? যাও!
যাবে, কুঞ্জ এবার যাবে। কায়া দিয়ে যার পায়ের পাতাটুকু ছোঁবারও অধিকার কোনোদিন পাবে না, ছায়া হয়ে তার সর্বদেহের নিবিড় স্পর্শ পেয়েছে। কুঞ্জর আর আফশোস নেই।
কিন্তু কোথায় যেন সুর কেটে গেছে। কদিন ধরে স্পষ্ট টের পেয়েছে কুঞ্জ।
বাগানে জল দেওয়া বন্ধ। ঘাস বিবর্ণ, হলিহক, ভায়োলেট, পপি আর প্রিমরোজ নির্জীব। গাছগুলো ঝাঁকড়া চুল হল, তবু ছট নেই।
শশী বলল; এ বছর আর ফুল হবে না, বাড়তি খরচ সাহেব সব বন্ধ করে দিয়েছেন। একটু থেমে ক্ষুণ্ণকণ্ঠে আবার বলল, আমারও জবাব হয়ে যাবে কুঞ্জ।
