বকুলের সঞ্চয়ের শেষ কড়ি পর্যন্ত ক্ষয়ে ক্ষয়ে এল, কিন্তু প্রাণকৃষ্ণ আশা অক্ষয়। রোগা জিরজিরে বুকে চাপড়মেরে বলল, সবুর আর কটা দিন। একটা হদিশ পেয়েছি। ঠিক মতো গেঁথে তুলতে পারলেই ব্যস, পায়ের ওপর পা ধুয়ে বুঝলে বকুল। বকুল ভাষাহীন, ফ্যাকাশে মুখে তাকিয়ে থাকে। বোঝে কিনা বোঝা যায় না।
একদিন বিকেলে এসে তাড়া দিলে প্রাণকৃষ্ণ। চটপট তৈরি হয়ে নাও তো বকুল, সিনেমায় যাব। সিনেমা! সকালে শুধু মুড়ি খেয়ে কেটেছে, এ বেলার জন্যে তাও নেই। বকুল বলল সিনেমা!
ধমক দিল প্রাণকৃষ্ণ। হাঁ করে তাকিয়ে থেকোনা, যাও সাবান দিয়ে মুখ ধুয়ে এস, চটপট।
সাবান কোথায়?
কেন ললিতার কাছে ধার করে চালিয়ে নাও না। দেবে না? আলবৎ দেবে।
যতক্ষণ শাড়ি বদলাল বকুল, ততক্ষণ প্রাণকৃষ্ণ ওর প্লান উন্মোচন করল। আরে, জোর একটা টিপস পেয়ে গেছি। নিরুপমা পারফিউমারির নাম শুনেছ?
পারফিউমার কি বস্তু বকুলের জানা ছিল না।
সাবান, তেলের কোম্পানী আর কী। আজ ললিতা তোমাকে সাবান মাখতে দিতে খুৎ খুঁং করছিল, দুদিন বাদে তুমি ওকে বাক্স বাক্স সাবান দিতে পারবে। তবে আমরা এখানে আর থাকব না এই যা।
আঁচলটা বেড় দিয়ে সবে মাথার ওপর তুলছিল, বকুল, হঠাৎ ওর হাত আলগা হয়ে গেলে।—এখানে আর থাকব না?
বাহাদুর গলায় প্রাণকৃষ্ণ বলল, তবে আর বলছি কেন? নিরুপমা পারফিউমারির অর্গানাইজার সুবোধ চক্কোত্তির সঙ্গে আলাপ হয়েছে। আমাকে ওরা বাইরে পাঠাতে চায় বিহার উড়িষ্যার সোল এজেন্ট করে। মালটা চালাতে হবে আর কী। ট্রেনে ট্রেনে ঘোরাঘুরি করে।
এতক্ষণে কুল বুঝতে পেরেছে।–ফিরিওয়াল হবে তুমি?
কম্পোজিটারের বউ বকুল। সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে বড় হুঁশিয়ার।
ফেরিওয়ালা তো আরো একধাপ নিচে।
—আরে দূর দূর। ফিরিওয়ালা হতে যাব কেন? আমার অধীনেই কত ফিরিওয়ালা থাকবে দেখ। এই কুঞ্জ ছোঁড়াটাকেও আমি একটা কাজ দিয়ে দেব। এ সব কাজে বহুৎ দায়িত্ব কুল, বিস্তর টাকা জমা দিলে তবে জোটে। নেহাৎ সুবোধ চক্কোত্তির আমাকে খুব মনে ধরেছে তাই–
তাই সুবোধ চক্রবর্তীর পয়সায় সিনেমা যেতে হল।
.
সিনেমায় কী হয়েছিল, সেদিন বোঝেনি কুঞ্জ। ফিরে এসে বকুল ভালো মন্দ কিছুই বললে না। কেমন গল্প, ক’টা গান, কিছু না। কুঞ্জ জিজ্ঞাসা করতে সাহল পেলে না।
দিনতিনেক বাদে প্রাণকৃষ্ণ বলল, চটপট তৈরি হয়ে নাও। বিকেলে বেড়াতে যাব। সুবোধ চক্কোত্তি আসবে গাড়ি নিয়ে।
বকুলের মুখ মড়াফ্যাকাসে হয়ে গেল, প্রাণকৃষ্ণ সেটা নজর করল কি না বোঝা গেল না, কিন্তু কুঞ্জ দেখে নিয়েছে ঠিক।
—আজকে? আবার!
বিবর্ণ মুখ প্রাণকৃষ্ণ দেখতে পায়নি কিন্তু বিরস গলা শুনল ঠিক। চটে গিয়ে বলল, কী রাজকাৰ্য্য করছ এখানে বল দেখি। সুবোধ চক্কোত্তির মেলা পয়সা বকুল, খাবার লোক নেই, লোকটা তাই মনমরা হয়ে থাকে। নইলে টাকাকে টাকা জ্ঞান করে না। আজ ডায়মণ্ডহারবার যাবে।
–যাক না। বকুল বলল, যত খুশি বেড়িয়ে বেড়াক। আমাদের নিয়ে টানাটানি কেন।
কথার ছিরিতে প্রাণকৃষ্ণ ক্ষেপে গেল—টানাটানি আবার কীরে যেতে ইচ্ছে হয় যাবে, না হয় যাবে না।
স্থির চোখে একবার স্বামীর মুখের দিকে তাকাল বকুল, বলল, বেশ চল।
ফিরে এসে সটান শুয়ে পড়ল। কুঞ্জ আগেই মুড়ি বাতাসা খেয়ে নিয়েছিল। সেদিন আর উনুন জ্বলল না।
নাটকীয় সেই ঘটনাটা ঘটল আরো দিন চারেক পরে।
একটা টাকা দিয়ে লোকটা ওকে ফরমাস করল, যাওতো থোকা, এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে এস, দুখিলি পান।
ঝাঁ ঝাঁ দুপুর—দোকানের ঝাঁপ বন্ধ, ফিরে আসতে কুঞ্জর মিনিট পনেরো লাগল। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতে যাবে, পারল না।
রুদ্ধশ্বাস বকুলদি, আরক্তমুখী বলছে, যান, এখনি বেরিয়ে যান আপনি। নইলে
মিটিমিটি হাসছে সুবোধ।–নইলে কী।
–নইলে উনি এসে আপনাকে ঘাড় ধরে বার করে দেবেন।
—প্রাণকেষ্টর কথা বলছ?—তেমনি হাসছে সুবোধ-আরে না সে আসছে না বকুল, তোমার ভয় নেই। প্রাণকেষ্টকে মোড়ের দোকানে বসিয়ে এসেছি—সে এখন চিংড়ির কাটলেটের কাঁটা চুষছে।
সেই মুহূর্তে কী হল কুঞ্জর, ঘরে ঢুকল ঝড়বেগে, অন্ধের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সুবোধের গায়ে, হাতের কাছে কিছু না পেয়ে শুধু নখে রক্তক্ষত করে দিতে লাগল।
ছিটকে পড়ল অবশ্য মুহূর্তেই। সুবোধ চক্রবর্তী লিকলিকে হলেও কুঞ্জর মতো পুঁচকেকে কায়দা করার জোর রাখে। মেজেয় ঠোকর খেয়ে কেটে গেল কপালের খানিকটা, আর, তখন আর জ্ঞান রইল না কুঞ্জর। হাতের মুঠোয় ছিল ক’আনা পয়সা, দেশলাই, সিগারেটের প্যাকেট। সব আবীর ছোঁড়ার মত ছুঁড়েদিল সুবোধের চোখ লক্ষ্য করে। চশমাটা চুরমার হয়ে পড়ল মাটিতে, তারই দু’এক টুকরো বিধে থাকবে সুবোধের চোখে। দু’হাতে মুখ ঢেকে সুবোধ মাথা হেট অপমানে ঘর থেকে সুড়সুড় বেরিয়ে গেল।
কিন্তু সে তো শুধু প্রথমাঙ্কের যবনিকা। প্রাণকৃষ্ণের প্রবেশ হল বেলা গড়িয়ে যেতে। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, সুবোধ আসে নি?
হাঁটুতে মুখ গুঁজে, বসেছিল বকুল, এতক্ষণে ভেঙে পড়ল কান্নায়। গোঙানির সঙ্গে বিনিয়ে বিনিয়ে কী বললে, বাইরে দাঁড়িয়ে শুনতে পেল না কুঞ্জ।
প্রাণকৃষ্ণ ততক্ষণে কঠিন হাতে ঠেলছে বকুলকে।—যাওনি? যাওনি তবে সুবোধ চক্কোত্তির সঙ্গে?
মিনমিনে স্বরে বকুল একবার বলতে চেষ্টা করল, তুমি ছিলে না—
