কিন্তু শুধু খেতে পেলেই কি সুখী হত বকুল। প্রাণকৃষ্ণ খেয়ে উঠে গেছে, পারে কাছে বসে বকুলদিকে শুকনোমাছের কাঁটা চুষতে দেখে কুঞ্জর তাই মনে হয়েছিল বটে, কিন্তু ভালো করে নজর করে মাঝে সন্দেহ হয়েছে, শুধু খাওয়া পরা আর বিশ্রামের অভাবই কুলদির আসল অসুখ নয়, আরো কিছু আছে।
প্রাণকৃষ্ণর এঁটো তুলে নিতে এসে থালার চারপাশে লেগে থাকা দু’চারটে ভাত কুড়িয়ে কুড়িয়ে খেত বকুলদি। কোনো কোনো দিন কুঞ্জর চোখে ধরা পড়ে গেছে।
-তোমার বুঝি আজ খাওয়া হয়নি, বকুলদি?
একরকম হাসি ফুটত কুলদির মুখে। লজ্জা ঢাকে হাসি, কিন্তু হাসির দৈন্য ঢাকে কিসে।
–হবে না কেন, তাই বলে জিনিষ নষ্ট করব কেন। তোর একদম বুদ্ধি নেই। কুঞ্জ।
বুদ্ধি আছে প্রমাণ করবার জন্যেই কুঞ্জ মাঝে মাঝে পাতে অর্ধেকটা ভাত রেখে উঠতে গেছে। বকুল তা হতে দেয়নি।
–ভাত নষ্ট করছিস যে?
–খিদে নেই। তাছাড়া নষ্ট হবে কেন?
—কে খাবে তোর পাতেরটা?
ভয়ে ভয়ে, কতকটা চোখ বুজে কুঞ্জ বলেছে, কেন তুমি।
বকুল চটে উঠেছে, কিংবা ভান করেছে।—এই বুদ্ধি হয়েছে তোমার এত বয়সে। সোয়ামীর প্রসাদ খেলে পুণ্যি হয়, তোর পারেটা খেলে আমার কী।
কুঞ্জ বলতে চেয়েছে আমার পুণ্য হবে কিন্তু কথা সরেনি। কিন্তু আসলে তো খেতে পাওয়ার দুঃখই শুধু নয় বকুলের, আরো একটা আছে। ভয়।
এই ভয় স্পষ্ট নয়, প্রত্যক্ষ নয়, লু আছে। বাতাসের মতো; প্রাণকৃষ্ণর মতো। অজানিতে চোখের পলক পড়ার মতো।
বিকেলে গা ধুয়ে এসে ভালো একখানা কাপড় পরে বৈকি বকুল, প্রাণকৃষ্ণর গলার আওয়াজ শুনলেই মুখে কেমন একটা ছায়া নামে।
সে ছায়া অবশ্য মিলিয়ে যায় মুহূর্তেই। একটু পরে হাসে বকুলদি, বকুলদিকে হাসতে হয়। আজ এত দেরি?
সারাদিন পরিশ্রমের পর মেজাজ তিরিক্ষি প্রাণকৃষ্ণের। ঘর্ঘর গলায় কী বলে বোঝা যায় না। তারপর হাত মুখ ধুয়ে ঠাণ্ডা হয়ে দু’একটা ঈয়ার্কি দেয় বৌয়ের সঙ্গে। বকুলদি হাসে, হাসতে হয়। তবু সে হাসি, কুঞ্জ ঠিক ধরতে পারে, পেতলের কলসির কানার মতো, অন্তরের ছায়া লুকিয়ে যায়, ঘোঘাচে না।
শুধু বকুলদি কেন স্বামী স্ত্রী সম্পর্কে কুঞ্জর অভিজ্ঞতাই এমনি। এই বস্তিতে আরো তো ক’ঘর পরিবার আছে। ও-পাশে ললিতাদি এ পাশে নীলুদিরা। এমনিতে বেশ আছে। স্বামীর জন্যে রান্না করে, জামা রিপু করে, একসঙ্গে শোয়, বছর বছর। বিয়োয়, কিন্তু তবু কোথায় যেন একটা অস্বাচ্ছন্দ্যের পর্দা দুলতে থাকে। একই সুখ, একই দুঃখের শরিক দুজনে’লু দু’জন যেন সমান নয়। একে প্রভু অপরে দাসী।
নইলে সামান্য একটু অন্যমনস্কতার জন্যে ভাতটা একটু ধরে যায় যেদিন, সেদিন বকুলদির মুখ অমন শুকিয়ে যায় কেন, চোখে মুখে ফুটে ওঠে কেন আতঙ্ক। বলে, আজ তোর জামাইবাবু আমাকে আস্ত রাখবে না কুঞ্জ। কী করে ধরে গেল বল দেখি।
অবশ্য প্রাণকৃষ্ণও বলে। হাসতে হাসতে। একবারে পাঁচসিকে পয়সা বাজী ধরেছিল রেসে। কিছু ফিরে আসেনি। ছাপাখানার কালি ধুয়ে মুছে বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রাণকৃষ্ণ বলেছিল, তোর দিদি একেবারে ক্ষেপে যাবে কুঞ্জ। কাপড় কাঁচা সাবান, সুতো আর মশলা কেনার পয়সা হিসেব করে দিয়েছিল। ওকে আমি কৈফিয়ৎ দেব কী। বলতে বলতে গলাটাকে ভারী করে আনে প্রাণকৃষ্ণ। চোখ মুখও গম্ভীর, তবু কুঞ্জ জানে সব কৃত্রিম। বকুলদির বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা রাখে না প্রাণকৃষ্ণ। যেমন রাখে না পাশের ঘরের ললিতাদির স্বামী পশুপতি।
এক একদিন বাসায় ফিরতে পশুপতির খুব রাত হয়ে যায়। দরজার ওপর দুমদাম আওয়াজ করে। ললিতা যদি বলে, আজ আবার ওসব খেয়েছ,—মুহূর্তে বিনয়ে কাদা হয়ে যায় পশুপতি। ধরাধরা গলায় বলে, মাইরি না। আর কোনও দিন ওসব ছোঁব না। এই তোমার পা ছুঁয়ে বলছি–
পা ছুঁতে যায় বটে, তখন সখের জোয়ারের পর অনুতাপের ভাটা চলছে, কিন্তু সত্যি কি আর ছোঁয়, না ললিতাদি ছুঁতে দেয়।
এরপরও যদি বুঝেসুঝে চুপ করে না যায় ললিতাদি, অমনি বিনয়ের খোলস ছেড়ে কুঁসে উঠবে পশুপতি। দু’চার ঘা বসিয়ে দেবে।
এসব দেখে দেখে অভ্যাস হয়ে গেছে কুঞ্জর। দিন মন্দ কাটছিল না। কেটে যেতে-ও, যদি না প্রাণকৃষ্ণের চাকরিটা অমন হঠাৎ চলে যেত।
গেল, কাজে ঢিলেমির জন্যে নয়, গরহাজিরার জন্যে নয়, সীসে চুরির দায়ে। কিছুদিন থেকেই টাইপ কমতে শুরু করেছিল। কেস-কে-কেস দুদিনে খালি। নজর রাখা শুরু হল। সাতদিনের মাথায় ধরা পড়ল প্রাণকৃষ্ণ, হাতে নাতে, সঙ্গে সঙ্গে সাফ জবাব হয়ে গেল। থানা পুলিশ হল না, বিশ বছরের চাকরি। বাবুরা মাফ করলেন। কিন্তু চাকরিটি কেটে দিলেন। সেই সঙ্গে কুঞ্জরও। চোরে চোরে মাসতুতো ভাই নয়। শালা-ভগ্নিপতিও হয়। কে না জানে কুঞ্জ প্রাণকৃষ্ণেরই লোক।
সব শুনে গুম হয়ে বসে রইল বকুল।
—এবার কী উপায় হবে।
প্রাণকৃষ্ণ ভরসা দিল, কিছু জ্বে না, একটা জুটবেই। এত বছর ধরে আছি এ লাইনে।
জুটল না তত সহজে। কেলেঙ্কারির খর দ্রুত ছড়ায়। বাই কী করে টের পেয়ে গেছে চুরির দায়ে বরখাস্ত হয়েছে প্রাণকৃষ্ণ। আরো মাসখানেক কাটল।
এই এক মাস প্রাণকৃষ্ণ বসে থাকেনি। চায়ের দোকানের রকে বসে বসে অব্যর্থ। ঘোড়ার কুষ্ঠিকুলজি বিচার করেছে। পাঁচ ধরে দশ আনা ফেরৎ এসেছে এইমাত্র, তাতে সংসার চলে না।
