পরের দিন, প্রাকৃষ্ণ কাজে বেরিয়ে গেলে বকুলদি ওকে কালো কালো দাগ দেখিয়েছিলো। শুধু তাই না। নাকে, গালে, কানের লতিতে অনেকগুলো ছড়ে যাওয়া দাগ।
—জামাইবাবু বুঝি দেয়ালে তোমার মুখ ঘষে দিয়েছিল বকুলদি?
গলাটাকে করুণ করে কুঞ্জ জিজ্ঞাসা করেছিল।
ফিক করে হাসল বকুল,—দূর বোকা, এসব দাগ অন্য জিনিষের। তুই বুঝবি। একটু থেমে বলল, এ হ’ল ভালোবাসার। ভালোবাসারও আঁচড় পড়ে জানিস?
কুঞ্জ তখনো অবোধ চোখে চেয়ে চেয়ে আছে দেখে বকুল বলল, সত্যি কাল আমাদের দোষ হয়েছিল ভাই। মেয়েমানুষ, সোয়ামীর অধীন। কত্তার কুম না নিয়ে আমাদের, বেরোনো উচিত হয়নি।
দিদি মানে হল বকুলদিপাড়া সম্পর্কে। বয়সে বছর দুই-এর বেশি বড়ো না। আগে বুঝি কুঞ্জ নাম ধরেই ডাকত, সেই পুকুরে চান করা, ফুল তোলা, ফল চুরি করার আমলে। তারপর বকুলের বিয়ে গেল। পাত্র প্রাণকৃষ্ণ কলকাতায় চাকরি করে।
বিয়ের পর একবার বাপের বাড়ি ফিরে গেল বকুল, চওড়াপাড় শাড়ি, মোটা টানা সিঁদুর! দু’বছরের বড়ো তো ছিলই, আরো যেন বছর দুই বয়স বাড়িয়ে এল।
ভাই বোনের খাতার পাতা ছিঁড়ে বকুল বরকে ভারি ভারি চিঠি লিখত; সেই চিঠি ডাকে দিতে হত কুঞ্জকেই। খামের ওপর যত্ন করে লেখা ঠিকানাটা দেখে দেখে ওর মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল।
এবারে কলকাতা পাড়ি জমাবার আগে সেই ঠিকানাটুকু কাগজে লিখে এনেছিল কুঞ্জ। রাস্তাঘাট ঠাহর হতে হতে লাগল দিন চারেক। এ ক’দিন ফুটপাতে শুয়েছে, খেয়েছে মুড়ি, কলের জলে ভিজিয়ে। তারপর অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে ঠিকানায় গিয়ে পৌঁছেছিল ঠিক।
খোলার দোচালা, টিনের বেড়া, দর্মার ঝাপ, চটের পর্দা। বুকটা দমে গিয়েছিল, তবু ফুটপাতের চাইতে ভালো। ভরসা করে দরজায় টোকা দিলে।
বকুল ছিল রাস্তাতেই, একটা বে-আব্রু কলে চান করছিল। অচেনা লোক দেখে শপশপে কাপড়ে ফিরে এল তাড়াতাড়ি, ঘড়াটা মাটিতে রেখে, ঘোমটাটা টেনে দিল।।
কুঞ্জ দেখল, শুকনো লিকলিকে হাত, চোখে কালি, আরো বক্স চারেক বয়স বেড়েছে বকুলের।।
আর নাম ধরে ডাকা চলল না। বলল, বকুলদি?
বকুল বলল, কুঞ্জ! আমি বলি কে না কে। আয় ঘরে বস। কবে এলি।
সব শুনে গম্ভীর হয়ে গেল বকুল। মাসিমা নেই? কবে গেলেন? মেলোমশাই নিরুদ্দেশ? আহা। এখানে থাকবি বলে এসেছিস, ভালো কথা। কিন্তু বড়ো যে মুসকিলে ফেললি ভাই। এই তো দেখছিস ঘরদোরের অবস্থা, শুতে দিই কোথায়? তোর জামাইবাবুর তো ছাপাখানার সামান্য কাজ, আমাদেরই চলে না।
তা হোক, তবু ওরই মধ্যে বন্দোবস্ত হয়ে গেল। রকে শোবে কুঞ্জ, যা হোক দু’মুঠো খাবে। চেনা আর একটা ছাপাখানায় কুঞ্জকে ফতোলার কাজ জুটিয়ে দেবার ভরসা দিল প্রাণকৃষ্ণ।
বদল কি প্রাণকৃষ্ণরই কম হয়েছে। বিয়ের সময় ছিল বাগানো টেরী তেল চপচপে চুল, ছোঁকরা ছোঁকরা দেখাত। এবার কুঞ্জ দেখল, প্রাণকৃষ্ণর মাথার সমুখের। দিকটা অনেকটা ফর্সা হয়ে এসেছে, পেছনের দিকে যা কয়েক গোছ চুল আছে তার অনেকটাই সাদা। সামান্য দু’চার বছরে এতটা বয়স বেড়ে যায় মানুষের! সেবারে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ঘন ঘন কাঁচি সিগারেট ফুঁকত; এবারে বিলকুল খাকি, তাও হিসেব করে প’হরে প’হরে ফোঁকে, খুক খুক কাশে।
তা কাশুক, প্রাণকৃষ্ণের মুখের বড়াই আছে তেমনি। প্রথম আলাপেই কুঞ্জ বলেছিল, আপনি একটা কাজ জুটিয়ে দিন জামাইবাবু। ছাপাখানার আপনিই তো মানেজার।
ম্যানেজার? প্রাণকৃষ্ণ বলল, না ঠিক ম্যানেজার আমি নই। তবে বলতে পার বটে। ম্যানেজার নামে যেটা আছে সেটা ছাপাখানার কাজের বোঝে কী? আমাকেই ব চালাতে হয়। বিশ বছর কম্পোজ করছি, ক’ সিলিপে কইষ্টিক, চোখ বুলিয়ে বলে দেব। পারবে তুমি বলতে? পারবে আমাদের গ্র্যাজুয়েট মুখুজ্যে? ম্যানেজার হতে কত প্রেস থেকেই তো কত সাধাসাধি করে। মাইনে! বোয়েচ ভায়া, পুরনো চাকরি। তা ছাড়া ওসবে অনেক ঝুঁকি—তা দেবো তোমাকে একটা কাজ জুটিয়ে।
দিলও শেষ পর্যন্ত। পুফটানার কাজ। এ কাজটা সহজ, শিক্ষানবিশি নেই, সাকরেদি নেই। দিনকতক গেলি টানাটানি করলেই ওস্তাদ।
মাইনেপত্তর ঠিক হল কিনা, কত ঠিক হল কে জানে, প্রাণকৃষ্ণ জানতে দিল না কুঞ্জকে। বলল, এখন শুধু খেটে যা। মইয়ের নিচের ধাপে আছিস, নজর রাখবি ওপরে, ওই ম্যানেজার মুখুজ্যে যেখানে বসে আছে, তোকে গিয়ে পৌঁছতে হবে ওখানে, বুইচিস।
ছিল বেশ। দুটো খেত, পরত, শুত—কোনদিন রকে, জোর বিষ্টির দিনে সিঁড়ির নিচে চাদর বিছিয়ে।
ভোর সাড়ে আটটায় বেরিয়ে যেত প্রাণকৃষ্ণ, কুঞ্জ তারো কিছু পরে। আগে কম্পোজ হবে তবে তো পুরুষ।
বাজার করে নিয়ে এসে কুঞ্জ দেখতে পেত কাঁখালে করে রাস্তা থেকে জল তুলে আনছে বকুলদি, পারছে না। কোমর বেঁকে গেছে, ঠোঁটদুটো আলগা। আসতে আসতে হাঁপাচ্ছে।
ছুটে যেত কুঞ্জ। সরো বকুলদি, আমি ধরে দিচ্ছি জল।
এই ক’বছর শ্বশুরঘর করে, জল টেনে, বাসন মেজে আর উনুন ধরিয়ে শরীরের আর কিছু নেই বকুলদির, শুকিয়ে কাঠিসার তো হয়েছেই, সবটুকু লাবণ্য ঝরে গেছে।
টুকু বুঝি নয়! এখনও যখন কাপড় কেচে, গা ধুয়ে ঘরে এসে ঢোকে বকুলদি, অনেক কষ্টে দরজার কপাটের আড়াল করে ওর দিকে পেছন ফিরে কাপড় ঘড়ে, হাত আয়না সমুখে রেখে টেনে টেনে চিরুনী চালায়, কুঞ্জর চোখে ধাঁধা লাগে। অনেক দিন দেখা ওদের গ্রামের সিগ্ধ শ্যামল কিশোরীকে মনে পড়ে। এখনো তবে একেবারে মরে যায়নি বকুলদি, ফুরিয়ে যায়নি। এখনও যদি একটু জিরিয়ে নিতে পারত, খেতে পারত পেট ভরে, তবে বকুল আবার তাজা হয়ে উঠতে পারত, বাতাস লাগত হাড়ে, গালে মাংস, রক্ত আসত শরীরে।
