আস্তে আস্তে কুঞ্জ নেমে এল নিচে, সাবধানে, ঘাস বাঁচিয়ে সুরকিপথ ঘেঁষে। এ বাগানে ঘাসেরও চাষ হয়।
শশীর ঘরে তখন টোয়েন্টি নাইনের ধুম। এ পাশের বাংলো থেকে এসেছে সতীশ, ওপাশ থেকে মধু, সামনের বাড়ির ড্রাইভার নিত্যানন্দও।
কুঞ্জকে দেখে শশী উঠে এল।
-কিরে, ঠিক হল কিছু?
কুঞ্জ হাসি-হাসি মুখে সব বললে।
কেমনবলেছিলাম-কিনা ঢঙের মাতব্বরী গলায় শশী বলল, তা তুইও তো কম হাঁদা না। মেম সাহেব তোকে রাখলেন, তুই আবার সাহেবের কথা তুলতে গেলি কেন। আরে হাঁদারাম, একি তোদের আমাদের ঘরের বৌ ঝি পেয়েছিল যে সোয়ামীর মত না নিয়ে এক পা চলা নেই? আমাদের মেমসাহেব হলেন স্বাধীন, নামে মাত্তর ইস্ত্রী। উনি ক’টা সমিতির পিসিডেন, জানিস?
কুঞ্জ জানত না, বড়ো বড়ো চোখে চেয়ে রইল।
শশী বলে গেল এখানে রাত জোরে টিকে যাস যদি, সব জানবি। শুধু আমাদের মেমসাব কেন, লেডী অপর্ণা মিসেস চাকলাদার এঁদের সব্বাই। এঁরা সব অন্য জাতের জেনানা রে! তুই এখন ফিরে যা। সাহেবের বেরোবার সময় হয়েছে।
সাহেব বোরালেন না, বেরোলেন ইন্দ্রাণী। বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন, হাই তুললেন ছোট্ট করে, পেশীর কুঞ্চন ঢাকতে একটা হাত মুখের সমুখে ধরলেন।
তারপর যে-হাতে মুখের কুঞ্চন ঢেকেছিলেন সেই হাতের ইশারায় ডাকলেন কুঞ্জকে।।
কুঞ্জ ছুটে এল। কুঞ্জর গন্ধ পেয়ে ঘর থেকে ছুটে এল লুপি। যে হাতের ইশারা করে ইন্দ্রাণী ডেকেছিলেন কুঞ্জকে, সেই হাতের ইসারাতেই চুপ করতে বললেন কুকুরকে। কুঞ্জকে বললেন অত শব্দ করে ছোটে? লুপি ভয় পেয়েছিল। সাহেবের যদি ঘুম ভেঙে যেত!
লজ্জা-ভয়ে কুঞ্জ বলল, ও।
ওকে দিয়ে দু’একটা টুকরো কাজ করিয়ে নিলেন মেমসাহেব। তার ওপর কক্ষান্তরে গিয়ে নতুন বেশে পরিবর্তিত হয়ে এলেন। বললেন, আমি একটু বেরুচ্ছি কুঞ্জ। তুমি একটু বস। ঘুম ভাঙলে সাহবের যদি কিছু দরকার হয়।
মেমসাহেবের বেরিয়ে যাবার পরও ঘরে এসেন্সের গন্ধ রইল। উনি গিয়ে গাড়িতে পা দিলেন, অমনি ইঞ্জিন প্রাণবন্ত হল; সিটে মাথা এলিয়ে দিলেন, অমনি চাকা গড়াতে শুরু করল। পেট্রোলের গন্ধে চাপা পড়ল এসেন্সের, তারপর দুটোই মিলিয়ে গেল, কুঞ্জর চমক ভাঙল তখন।
একটু পরেই ঘুম ভাঙল সাহেবের। চোখের কোণ অল্প অল্প লালচে। আস্তে আস্তে বার দুই ডাকলেন, ইন্দু, ইন্দু।
সাড়া না পেয়ে বড়ো করে চোখ মেললেন। দেখলেন কুঞ্জকে।
–মেমসাব কই রে।
–এক্ষুনি তো বেরুলেন।
মেমসাহেবের ভয় করেনি, করছে কুঞ্জর। সাহেবের হুকুম না নিয়েবেরিয়েছে, যদি সাহেব ক্ষেপে যান।
সাহেব কিছুই করলেন না, শুধু বললেন, এক্ষুনি? ক’টা বেজেছে। সাড়ে চার— তাই তো।
নিজেই ঢুকলেন গোসল ঘরে।
এই গল্পটাই কুঞ্জ কদিন পরে রসিয়ে রসিয়ে করেছিল বকুলদির কাছে।
কপাল খুলে গেছে কুঞ্জর। সাহেবের কখন কী দরকার হয়, সেই জন্যে খাসদালানের বারান্দার কোণে একটা কুঠুরিতে ওকে আস্তানা দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়। দুটো কামিজ কিনতে ওকে পুরোপুরি দশ টাকার নোট দিয়েছে মেমসাহেব। তার থেকে তিনটি টাকা বাঁচিয়ে কুঞ্জ বকুলদিকে দিতে গিয়েছিল।
বকুল মহাখুশি।—চাকরি পেয়েছিস, সত্যি কুঞ্জ? সাহেব-বাড়ি? সত্যিকারের নয়; কিন্তু অত কথা বকুলদিকে ভেঙে বলবে কেন। মেমসাহেব কথাটাই হাজারবার। ব্যাখ্যান করে শোনাল কুঞ্জ। কেমন সোজা, কেমন স্বাধীন। একল-একলা বেরিয়ে যান গাড়ি করে। কাকস্য পরোয়া।
গালে হাত দিয়ে শুনছিল বকুল। সব শেষে বলল, অথচ তোর জামাইবাবুকে না বলে সিনেমায় গেছলাম বলে সেবার আমাকে কী মারটাই না মেরেছিল, তোর মনে নেই কুঞ্জ?
মনে আবার নেই?
ঘোড়া-গাড়ি করে ব্যান্ড বাজিয়ে একদল লোক সকালের দিকে সিনেমার হ্যান্ডবিল বিলি করে গিয়েছিল; তারই একটু কুড়িয়ে রেখেছিল বকুলদি। বেলা। পড়তেই দেখিয়েছিল কুঞ্জকে। চট করে দুটো টিকিট নিয়ে আয় তত ভাই।
-টাকা?
সে বন্দোবস্তও বকুলদি করেছে বই-কি। পুরনো কাপড় আর ফুটো বাসন বেচে আজই পেয়েছে টাকানগদে দুটাকা দশ আনা। এ-টাকার খবর প্রাণকৃষ্ণ রাখে না।
কুঞ্জর তবু হাত সরে না, পা পড়ে না। বলল, জামাইবাবু জানলে বকবেন।
—টের পেলে তোবকুল ভরামুখ হেসে বলল,–কদিন থেকে ওভারটাইম খাটছে, রাত দশটার আগে বাবু ফেরেন না। আমরা তার আগেই ফিরে আসব, দেখিস। বিকেলের রান্না সেরে দিইচি, ফিরে এসে দু’খানা রুটি সেঁকে নেবো’খন।
সেদিনই প্রাণকৃষ্ণ ফিরেছিল তাড়াতাড়ি। পুরো ঘণ্টা কাজ শেষ হতে ছুটল ওভারটাইমের লিষ্টি দেখতে। নাম নেই। মেজাজ গেল বিগড়ে। শালা, দুটো পয়সা উপরি আয়ের যদি জো থাকে। মুখ দেখে দেখে খাতিরের লোক বেছে বেছে লিস্ট তৈরি হয়। ফিরে এসে বাড়িতে দেখে বৌ নেই। সিঁড়ির ধাপে বসে একটার পর একটা বিড়ি টেনেছে প্রাণকৃষ্ণ।
সেই বিড়ির আগুন কুঞ্জ দেখতে পেলে গলির মুখ থেকেই। বুঝলে বেগতিক। বুকের ভেতরটা হিমহিম লাগল। একটু ভোলাবাতাস পুরে নিতে কুঞ্জ পিছিয়ে রইল।
গ্যাসের আলো গলির ইদিকে নেই। একটা কেরোসিনের ডিবে আছে, সেটা আবার রোজ জ্বলে না। তবু দেখতে পেলে প্রাণকৃষ্ণ শক্ত করে ধরেছে বকুলদির চুলের মুঠি, রাবণ যেমন করে সীতার ধরেছিল। হিড়হিড় করে প্রাণকৃষ্ণ ঘরের মধ্যে টেনে নিয়ে গেল বকুলদিকে।
অনেকক্ষণ পরে পা টিপে টিপে ফিলে এসেছিল কুঞ্জ। সারাটা রাত রকে শুয়েই কাটল। আকাশের গায়ে কাঁটা দেওয়া অজস্র তারা। কিন্তু সেদিকে তো চোখ নেই কুঞ্জর। ওর নিজের গায়েও কাটা দিয়েছে! হয়ত কার্তিকের হিমে; হয়ত অনেকক্ষণ ধরে বকুলদির কান্না শুনে শুনে।
