দেখতে দেখতে শিপ্রা স্বাভাবিক হয়ে উঠল। ঠোঁটদুটো সাদাই রইল, কিন্তু গলায় অর ফিরে এল।
শিপ্রা প্রথমেই বলল—আমি আর বাঁচব না।
অবনী কাছেই একটা চেয়ারে বসে ছিল আগুনের দিকে চেয়ে, চমকে ফিরে তাকাল।
শিপ্রা বলল—আমি এবার ঠিক মরে যাব।
অবনীর নিজের শরীরটাও ভালো ছিল না, কেমন অসুস্থ লাগছে। নিজের শরীরটাকে মনে হচ্ছে যেন অন্য কারো শরীর। তবু খুব আন্তরিকভাবে, গলার স্বরে মমতা। মিশিয়ে বলল—এসব কেন ভাবছ শিপ্রা, তোমার এমন কি অসুখ—।
শিপ্রা বলে উঠল—অসুখের কথা নয়।
তাহলে?
কেন বাঁচব আমি!
এসব কি বলছ শিপ্রা!
সত্যি কথাই বলছি। বল, আছে–ভালোবাসা—বিশ্বাস–?
কেন একথা বলছ?
তুমিই বল কেন।
—আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
তুমি ঘোড়ায় কিন্তু শেষপর্যন্ত চড়লে।
শিপ্রা!
না চড়ে পারলে না।
শিপ্রা তুমি—তুমিই তো আমাকে বাধ্য করলে। তুমি না বললে–।
আমি না বললেও তুমি–। তোমার চোখে সেই লোভ দেখেছিলাম। আমি না বললেও, একদিন খুব নগ্নভাবে লোভটা তুমি প্রকাশ করতে। বল, তাই করতে কি না। বল!বলতে বলতে উত্তেজনায় শিপ্রা বিছানায় উঠে বসে। তার শুকনো সাদা মুখ অদ্ভুত লাল হয়ে উঠেছে যেন তার ভেতরে আগুন জ্বলছে।
অবনীর বুকের মধ্যেও আগুন ধরে যায়। দারুণ আক্রোশে কয়েকটা শুকনো কাঠ সে জ্বলন্ত চুল্লিতে ছুঁড়ে দেয়।
দ্বিগুণ বেগে আগুন জ্বলে ওঠে।
চীনেমাটি – সন্তোষকুমার ঘোষ
শশী বলল, মেমসাহেব খুব ভালো। দয়ার শরীর। চ, তোকে এখুনি আলাপ করিয়ে দিচ্ছি।
কুঞ্জ বলল, এখন থাক শশীদা। পরে। বরং মাটি কুপিয়ে নিই আরেকটু।
শশী বলল, না রে। বাইরের লোক বাগানের কাজে হাত দিলে সাহেব বড়ো গোসা হন আগে ঘরের লোক হয়ে যা। তখন সব তোকে শিখিয়ে দেব। কেয়ারি করা, জল ঢালা, ইস্তক সব ফুলের নাম।
–সব ফুলের নাম শশীদা?
–সব। চ’ এবার,–শশী বলল, ভয় কিসের। মেমসাহেব সাহেব হলেও মেম তো। মেম মানে হল গিয়ে মেয়েমানুষ।
উলের কাঁটা থামিয়ে চোখ তুললেন মেমসাহেব–কী শশী।
দণ্ডবৎ বিনয়ে শশী বলল, একে নিয়ে এলাম। আমার দেশের ছেলে। এখানে এক দিদির বাড়ি থাকত, জামাইবাবু তাড়িয়ে দিয়েছে। যদি কাজে ভর্তি করে নেন। সাহেবের খাস খানসামার কাজ একে দিয়ে বেশ হবে।
মেমসাহেব বললেন, আচ্ছা তুমি একে রেখে যাও। আমি দু’চারটে কথা জিজ্ঞাসা করে দেখি।
সেলাম করে শশী বেরিয়ে যেতেই কুঞ্জর বুক ঢিপঢিপ শুরু হল। সামনের একটা দেয়ালের আয়নায় ছায়া পড়েছে দু’জনের, সিলক-ঢাকা মোমের একটি মূর্তির পাশে ধুলোকালো ঝাকড়াচুল এক ছোঁকরার। কুঞ্জর দাঁড়িয়ে থাকতে লজ্জা করছিল, সে ধপ করে বসে পড়ল মেমসাহেবের পা ঘেঁষে।
সাদা ধবধবে দুটি ননীনরম পা, আলগা ছুঁয়ে একটি হরিণাজিন চটি। কুঞ্জ তখনও কাঁপতে থাকল।
মেমসাহেব বললেন, আহা, মাটিতে বসলে কেন।।
তাহোক, মাটিতেও কুঞ্জ কিছু কম সুখে নেই। মাটি কই, কার্পেট, মেজের লজ্জা ঢাকে, মানুষের পায়ের শব্দ ঢাকে। আর এখান থেকেও তো উড়ে উড়ে পড়া সিল্কের গন্ধ পাচ্ছে কুঞ্জ; মৃদু ঝিমঝিমে, কে জানে কী এসেন্স। দীর্ঘ দুটি ভুরুর নিচে দুটি চোখ, গলার একটা ভাজে ঈষৎ স্পষ্ট পাউডারের দাগ। মেমসাহেব বললেন, এখানে কোথায় থাকতে তুমি?
—পটলডাঙ্গায়।।
—দিদির কাছে? কেমন দিদি? জামাইবাবু তাড়িয়ে দিল? কী কাজ করে তোমার জামাইবাবু?
কুঞ্জ একটা ছাপাখানার নাম করলে।
আরো দু’একটা টুকটাক কথা জিজ্ঞাসা করলেন মেমসাহেব।
বোধহয় খুশি হলেন। উলটা সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালেন, দীর্ঘশিখা দেহ, আঁচল কুড়িয়ে নিলেন।
—বেশ আজ থেকেই কাজ করবে তুমি।
শীর্ষরক্তাভ শুভ্র আঙুলগুলোর দিকে চেয়ে পলক পড়ল না কুঞ্জর। এত সুষমা থাকতে পারে শরীরের গঠনে? চকিতে বকুলদির কথা মনে পড়ল। ধোঁয়াজ্বালা রান্নাঘরে বাটনা বেটে বেটে ক্ষয়ে যাওয়া কটি আঙুল, থেতলানো, ভোতা। এই সতেরো বছর পর্যন্ত যত মেয়েমানুষ দেখেছে কুঞ্জ, তাদের কারুর সঙ্গে এই মেমসাহেরে তুলনা নেই—এই সুষমা, এই মহিমা, কোথায় পাবে তার চোখ বসে যাওয়া, কণ্ঠ-উঁচু, হাড়কালি, স্বামীর ভয়ে জুজুবুড়ি বকুলদি।
কুঞ্জ বলল, আমাকে রাখলেন মেমসাব? কিন্তু, কিন্তু সাহেব—
মেমসাহেব হাসলেন,সাহেবের ভাবনা তোমাকে ভাবতে হবে না। আমার কথাই শেষ কথা। সাহেব কিছু বলবেন না।
ঠিক তখুনি বাইরে জুতোর শব্দ শোনা গেল।
তালিম দেওয়াই ছিল। মশমশ আওয়াজ হতেই সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল, কাঠপুতুল, জোড়াগোড়ালি এ্যাটেনশন।
—কে? চৌধুরী জিজ্ঞাসা করলেন, অধমনস্ক পাখাটাকে পুরোদম করে দিয়ে।
ইন্দ্রাণী বললেন, নতুন লোক। বহাল করলুম আজ থেকে। উড়েটাকে দিয়ে কোন কাজ পাওয়া যেত না।
চৌধুরী বললেন ‘ও’, শুনলেন কিনা সন্দেহ, টুটিটেপা টাইটাকে ঢিলে করতে গলায় হাত দিলে।
কুঞ্জর হাত ততক্ষণ সাহেবের জুতোর ফিতেয় পৌঁছে গেছে। চৌধুরী সাহেব বাধা দিলেন না, কৌচে গা ঢেলে দিয়ে বললেন, বেশ চটপটে।
খাওয়া শেষে চৌধুরী সাহেব বিলিতি ম্যাগাজিনের পাতা ওলটান, ঠিক ওলটান না, পাখাতেই ওলটায়, সাহেব ধরে থাকেন মাত্র, কয়েক মুহূর্তের ঝিমুনি, ঘোড়াঘুম। মেমসাহেব সেই অবসরে পশমের কাটা নিয়ে বসেন, পায়ের কাছে কুকুরটা মন্ত্রশান্ত ভুজঙ্গকুণ্ডলী।
কুঞ্জ বারান্দায় এল। বিকেলবেলার একটুখানি রোদ, বাগানের ঝাউ গাছের পাতায় পাহারা এড়িয়ে যতটুকু পড়তে পারে। দেয়াল ঘেঁষে একটা লতা, টকটকে ফুল। তারপর যতদূর চাও, শুধু ফুল, যত্ন করে লাগানো, কুঞ্জ নাম জানে না। এখানে। ওখানে ছেটো গাছ, বেশি বাড়েনি কিন্তু স্তবকের মতো, সমান করে ছাঁটা। আজ আট মারে ওর কুঞ্জর চুলে কাঁচি পড়েনি, কিন্তু এ গাছগুলোর দশ আনা চার আনা ছাঁট নিয়মিত।
