অবনী তাড়াতাড়ি শিপ্রাকে হোটেলে ফিরিয়ে আনে।
হোটেলের ঘর তখন যেন হিমঘর।
কার্ডিগানের ওপর প্রম শাল, তার ওপর দুটো পাহাড়ী কম্বল, তাতেও শিপ্রা হাত পা গরম হয় না, কাঁপুনি থামে না। ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বালাতে হয়।
দেবদারুর শুকনো ডাল জ্বলতে থাকে দাউ দাউ করে। অবনী ফায়ার প্লেসের সামনে একটা চেয়ার নিয়ে বসে। মাঝে মাঝে দু একটা করে কাঠের টুকরো আগুনে ফেলে। অবনীর বিশাল ছায়া শিপ্রার বিছানা ছাড়িয়ে পিছনের দেয়ালের ওপর। দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছে শিপ্রা। শরীরে তাপ ফিরে এসেছে। অবনীর অনুমান, শিপ্রা ঘুমিয়ে পড়েছে।
হোটেলের বেয়ারাকে দিয়ে খাঁটি ভুটানী ব্রাণ্ডি আনিয়েছে অবনী, শিপ্রা জানে না। শিপ্রা ঘুমিয়েছে, আরো কিছুক্ষণ পরে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে, অবনী উঠে গিয়ে সন্তর্পণে গোপন জায়গাটা থেকে সেটা বের করে। তারপর আগুনের সামনে এসে আবার বসে।
ম্যালের সেই ভুটানী যুবতী তার সাদা রঙের পাহাড়ী ঘোড়া নিয়ে হেসে সামনে এসে দাঁড়ায়।
পরের দিন ভোর থেকেই আবহাওয়া আবার খুব খারাপ। দূরের গাছপালা কারে মানুষ কিছুই দেখা যায় না এত কুয়াশা। শীত চামড়া কেটে সরাসরি হাড়ে বিধছে। হাড় কন কন করছে। অবনী আগে ঘরে কিছু কাঠ আনিয়ে রাখল।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা কিছুটা কমল, কিন্তু আকাশ আরো থমথমে হয়ে এল। শিলাবৃষ্টি হতে পারে আজ।
অবনী বলল, আজ আর ম্যালে গিয়ে কাজ নেই।
শিপ্রা বলল, তুমি একবার ঘুরে এসো।
অবনী কি ভাবল, বলল—তাহলে তুমিও চল।
দুপুরের আগেই শিপ্রার সঙ্গে অবনীও শীতে কাঁপতে কাঁপতে ম্যালে এসে পৌঁছল। তাদের নির্দিষ্ট বেঞ্চে দুজনে পাশাপাশি বসল।
দুপুর হয়ে গেল।
একটু পরেই ভুটানী তার ঘোড় নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। সেই পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত ঢাকা কালো জিনের কামিজ, বুক আর গলা সাদা। গাল দুটো আজ যেন একটু বেশী লাল। দুটো ঠোঁট এত বেশী লাল, মনে হয় যেন রক্ত চুইয়ে পড়ছে।—ঘঘাড়েকে পর চড়েঙ্গে বাবু।
শিপ্রা কানের কাছে মুখ এনে ফিস ফিস করে বলল—আজ ম্যাল খুব নির্জন—এমন সুযোগ আর পাবে না—যাও!
অবনীর মুখ লাল হয়ে উঠেছে। শিপ্রার মুখের দিতে তাকাতে পারছে না।
পাহাড়ী সেই যুবতী যেন জেনে গেছে অবনী আজ সওয়ার হবেই। তার চোখের মণিদুটো চকচক করছে। সাদা দাঁতের সারি মেলে হাসতে হাসতে বলছে, চড়েঙ্গে বাবুঘোড়া বহুৎ বেইরিন হ্যায়।-আইয়ে—আইয়ে না!
কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল অবনী। সম্মোহিতের মতো ঘোড়ার কাছে এগিয়ে গেল। দুহাতে ঘোড়ার কাঁধটা আঁকড়ে ধরে লাফিয়ে উঠে পড়ল পিঠে।
তারপর শিপ্রার দিকে আর ফিরে তাকাবার সময় পেল না। কোনমতে লাগামটা শুধু ধরতে পেরেছিল। পা দুটোও ঠিকমতো রেকাবে রাখতে পারেনি, তার আগেই ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছিল ভুটানী।
একটু অভ্যস্ত হওয়ার পরেই অবনী একবার পিছনে ফিরে তাকিয়েছিল শিপ্রাকে দেখবার জন্যে। কিন্তু ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেছে শিপ্রা। সেই ভুটানী যুবতী ঘোড়ার সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে ছুটে চলেছে। তাকে পিছনে ফিরতে দেখে যুবতী তীক্ষ্ণস্বরে সতর্ক করে দিল—পিছে মত দেখিয়ে বাবু-সামনে দেখিয়ে!
অবনীর আর একটুও শীত করছে না। বুঝতে পারছে ঘামে ভিজে যাচ্ছে। গলা শুকিয়ে গেছে। ভেতরটা কাঁপছে ভীষণ। রাস্তার বাঁদিকে গভীর খাদ। ডানদিকে ঘন জঙ্গলি জঙ্গলের মধ্যে জমাট কুয়াশা। সামনে কিছুই দেখা যায় না, শুধু কুয়াশা!
শুধু ঘোড়ার খুঝের শব্দ। না সেই শব্দ অবনীর বুকের হৃদপিণ্ডের। ভীষণ জোরে, সশব্দে আর অসম্ভব দ্রুত ওঠানামা করছে অবনীর বুক। উত্তেজনায়, রোমাঞ্চে, আতঙ্কে এক অনির্বচনীয় অনুভূতিতে অবনীর সারা শরীর অদ্ভুত কাঁপছে। সেই অনুভূতি সহ্য করতে পারছে না সে। তার মনে হচ্ছে, মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো ছিঁড়ে যাবে, হৃদপিণ্ড বিদীর্ণ হয়ে যাবে। একবার মনে হয় চীৎকার করে বলে, ভুটানী ঘোড়া থামাও, ঘোড়া থামাও, আমি নেমে যাব—ঘোড়া থামাও—আমাকে নামিয়ে দাও। লাগাম তার নিজেরই হাতে, অবনীর একবারও তা মনে পড়ল না।
এক যুগ পরে যেন অবনী ম্যালে এসে পৌঁছল। মাটিতে পা দিয়েই ছুটে গেল দেখতে শিপ্রা কোথায়, কেমন আছে. দেখে শিপ্রা সেই বেঞ্চেই বসে আছে। শুধু আরো বেশী কুয়াশা শিপ্রাকে ঘিরে।
শিপ্রার মুখ আরো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ঠোঁট দুটো আরো সাদা চোখদুটো আরো ঘোলাটে। অবনীকে দেখছে, যেন অন্য কাউকে দেখছে। কথা বলছে না। কথা বলতে পারছে না।
অবনী কি করবে বুঝতে পারে না। মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে…ডাকে শিপ্রা আমি এসে গেছি। তোমরা কি কষ্ট হচ্ছে আমাকে বল। শিপ্রা, তোমার কি হয়েছে?
ঠোঁটদুটো একটু নড়ে। খুব ক্ষীণ স্বরে, যেন অনেক দূর থেকে শিপ্রা বলে শরীর খারাপ লাগছে—ঘরে চল।
অবনী তাড়াতাড়ি শিপ্রার হাত ধরে।—ওঠ। হেঁটে যেতে পারবে?
শিপ্রা তার শীর্ণ ঘাড়টা নাড়ে।—পারব।
হোটেলে পৌঁছবার আগেই বৃষ্টি শুরু হল। বৃষ্টি নয়, গায়ে বিধতে লাগল বরফের তীক্ষ্ণ কুচি। পথেই একটা বিপর্যয় ঘটে যেতে পারত। অবনী কোন মতে শিপ্রার শরীরটাকে হোটেলে নিয়ে তুলল।
বরফের মত শরীরটাকে বিছানায় তুলে দিয়েই অবনী ফায়ার প্লেসের দিকে ছুটে গেল।
দু মিনিটের মধ্যেই আগুন জ্বলে উঠল।
