ম্যালের চারদিকটা অবশ্য দেখে নিয়েছে অবনী। শিপ্রা বেঞ্চে বসে থাকে। অবনী মাঝে মাঝে উঠে পায়চারি করে। বেশী দূরে যায় না। দু একবার তবু চলে গেছে শিপ্রার চোখের আড়ালে।
ম্যালের উত্তর দিকে যে বাগানটা, বাগান নয়, বন-গহন জঙ্গল। জঙ্গলটা ঘিরে একটা রাস্তা আছে। ম্যাল থেকেই রাস্তাটা বেরিয়ে জঙ্গলটাকে পাক দিয়ে আবার ম্যালে ফিরে এসেছে। রাস্তাটা নির্জন খুব। ঘোড়া আর ঘোড়সওয়ারের জন্যেই যেন রাস্তাটা। ম্যাল থেকে বেরিয়ে সেই রাস্তা ধরে মিনিট পনের হেঁটে গেলে দেখা যায় দূরে হ্যাপিভ্যালি। কুয়াশা না থাকলে দেখা যায় হ্যাপিভ্যালির সবুজ গভীর বিস্তার। অনেক দুরে ধূ ধূ করছে ভূটান সীমান্ত। সবুজ পাহাড়-এর ঢেউ। পিছনে কয়েকটা ধূসর গিরিশৃঙ্গ। তারপরেই সেই অলৌকিক হিমগিরি, আলোক সুন্দর কাঞ্চনজঙ্ঘা।
অবনী কুয়াশার দিকে চেয়ে কল্পনায় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখেছে! দু একদিন পায়ে পায়ে এগিয়ে গেছে। একটা বাঁক পেরিয়ে পুবের দিকে ফিরতেই আবার একটা ভ্যালি। তারপর আর একটা। একটা বিশাল উপত্যকা। ঘন সবুজের ওপর সুতোর মতো রাস্তা আঁকাবাঁকা, অসংখ্য। ওইখানে দার্জিলিং-এর ভুটানী বস্তি। খাদ নেমে গেছে আরো নীচে। উপত্যকার ওপারে অনেক দূরে সবুজ পাহাড়। পাহাড়ের ওপর আকাশ। খাদের গভীর থেকে মেঘ উঠে পাহাড়ের গা বেয়ে আকাশে জমে—সেই মেঘ তারপর একসময় সবেগে নেমে আসে। দেখতে দেখতে ভুটানী বস্তি ঢেকে ফেলে, তারপর ধেয়ে আসতে থাকে ম্যালের দিকে।
অবনী তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলে আসে ম্যালে শিপ্রার কাছে। এসে দেখে শিপ্রার চোখে-মুখে দারুণ উৎকণ্ঠা। স্পষ্ট বোঝা যায় শিপ্রা দারুণ ভয় পেয়েছে।
—কি হয়েছে?
শিপ্রা ক্ষীণ স্বরে বলে, আমার ভয় করছে।
কেন, ভয় কিসের?
জানি না তুমি অতদূরে যেও না।
দূরে তো যাই নি।
আর যেও না কখনো। আমাকে একা রেখে তুমি কোথাও যাবে না। বল যাবে না!
পরের দিন থেকে অনী ম্যাল ছাড়িয়ে কোথাও যায় না। শিপ্রার পাশে, বেঞ্চে বসে থাকে। দুপুর গড়িয়ে যায়, বিকেল হয়। সন্ধে হয়ে আসে।
সকালেই ঘোড়াগুলো চলে আসে ম্যালে। লম্বায়, চওড়ায় খুব বড় নয় মোটেই ঘোড়াগুলো। পাহাড়ী মানুষজনের মতো আকারে ছোট। শক্ত হাড়ের ওপর মেদ মাংস চামড়ার শক্ত বাঁধুনিতে পাহাড়ী সুষমা সুস্পষ্ট। পিঠে জিন লাগানো, মুখে লাগাম। ঘোড়াগুলো ঘিরে কিশোর-কিশোরী যুবক-যুবতীদের উৎসাহই বেশী, তাদেরই বেশী ভীড়। প্রত্যেক ঘোড়ার সঙ্গে আছে একজন করে ঘোড়াওআলা—যাদের বয়স বারো থেকে বাইশের মধ্যে। মলিন পোশাক আর ময়লা চামড়া দেখলেই বোঝা যায় ভুটানী বস্তির ছেলেমেয়ে, এরা ঘোড়ার মালিক নয়।
ঘোড়ার মালিক কেউ ঘোড়া নিয়ে ম্যালে আসে না সওয়ার ধরতে এমন নয়। নোংরা পোষাক, রুক্ষ চুল, অপরিচ্ছন্ন চামড়ার মাঝখানে দু একজনকে দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায় ঘোড়ার মালিক। কালো রঙের জিনের ভুটানী কামিজ, গোড়ালি থেকে গলা পর্যন্ত, বুক আর গলার কাছে কাপড়ের রং সাদা। লাল ফিতে দিয়ে বিশেষ ঢঙে বাঁধা চুল বিনুনী করে কোমরে নীচ পর্যন্ত নামানো। একটু ভারী নিটোল নিতম্ব। চওড়া কঠিন কাঁধ যেন ছুরি দিয়ে গাঁথা। নাকটা একটু চাপা, চোখদুটো ছোট, মণিদুটো নীল, নীলার মতো। দুটো গাল লাল রক্তাভ। বুকে সাদা জিনের তলায় দুটো তীক্ষ্ণ ছুরির ফলা লুকোনো।
একটা সাদা রঙের সুন্দর ঘোড়া নিয়ে রোজ দুপুরে সে অবনীর সামনে এসে দাঁড়ায়। রোজই তার এক কথা-ঘোড়াকে পর চডেঙ্গা বাবু?
অবনী কোন উত্তর দেয় না।
কিন্তু উত্তর না নিয়ে সে নড়বে না। দাঁড়িয়ে থাকবে আর লাল ঠোঁটে মোহিনী হাসি ফুটিয়ে প্রলুব্ধ করতে থাকবে।
শিপ্রা নিশ্চয়ই খুব বিরক্ত হয় সেই ভেবেই অবনী বিরক্ত হয়ে বলে—ম্যায় ঘঘাড়েকে উপর নেই চড়না চাতা।
ঝকঝকে সাদা করাত্রে মতো দাঁত্রে সারি মেলে হাসতে হাসতে বলে—এ বাবু, ডরো মত-মেরা ঘোড়া বহুৎ বেইরিন হ্যায়।
আপ দুসরা আদমী কে পাস যাইয়ে। একটু বেশী রুক্ষভাবেই কথাটা বলা হয়ে যায়। অবনীর নিজের কানেই খারাপ লাগে। লাগুক শিপ্রা নিশ্চয়ই খুব খুশী হয়।
শিপ্রার কিন্তু অন্য সুর। বলে—আহা। বেচারা রোজ তোমার কাছে আসে, একদিন চড়লেই পার ওর ঘোড়ায়।
পাগল হয়েছ।
কেন, কি হয় চড়লে।
ভেবেছ একবার চড়লে তারপর ও ছেড়ে দেবে–।
তোমার যদি ইচ্ছা হয় রোজ একবার করে না নয় চড়বে!
অবনী বলে, আমার ইচ্ছা করে নাকে দেখে ফেলবে কি ভাববে।
শিপ্রা বলে—কে তোমাকে দেখছে!
অবনী বলল—তুমি তো দেখবে।
শিপ্রা বলল—দেখতে ভালোই লাগবে আমার।
মোটেই ভালো লাগবে না।
ভালো লাগবে বলছি—তুমি চড়েই দেখ না।
না–।
না কেন, কোনদিন কি চড়োনি, ছেলেবেলায় কোনদিন—।
অবনী বলল—এখন তো আর ছেলেমানুষ নই।
শিপ্রা বলল বুড়োও ত হয়ে যাওনি।
অবনী আর কোন কথা বলে না। চুপ করে থাকে।
শিপ্রা কিছুক্ষণ পরে বলল কি ভাবছ, কথা বলছ না।
অবনী শিপ্রার চোখের দিকে তাকায়। তার কেমন সন্দেহ হয়। শিপ্রার চোখ দুটো এত নিরীহ, এত নিপ্রাণ, কোন অনুভূতিই যেন নেই। যেন পাথরের চোখ।
অবনীর বুকের মধ্যে, কোথায় কোন শুষ্ক ধূসর উপত্যকায় একটা পুরোনো আক্ষেপ আবার কুণ্ডলি পাকাতে থাকে।
এই সময় মেঘ উঠে আসে ম্যালে। নিমেষে বিকেলের সবটুকু আলো শুষে নেয়। হিমেল কুজঝটিকায় চারদিক ঢেকে যায়। শীতের কামড় চামড়া কেটে হাড়ে পৌঁছতে থাকে।
