ঘর ভেসে যাবে।
না।
পানি ও ঘরে এসে পড়বে।
না।
নিঃশব্দে মুচড়ে হাত ছাড়িয়ে নেয় সামাদ। একবার শিরিন চোখ মেলে দ্যাখে, সামাদের মুখে তার নিজের কপালের ছায়া। সে ছায়ায় মুখটাকে দেখাচ্ছে মরা মানুষের খুলির মতো।
আবার সে চোখ মুখে দেখে সামাদ নেই।
শিরিন তখন উঠে দাঁড়ায়। পড়ে যেতে যেতে সামলে নেয় নিজেকে। তারপর ছেলেবেলায় প্রথম হাঁটার মতো টলমল পায়ে খাট ধরে, টেবিল ধরে, বেড়ার খুঁটি ধরে এগিয়ে যায় পাশের ঘরের দরোজার কাছে।
বিস্ফারিত দুচোখ মেলে শিরিন দ্যাখে, চৌকির ওপর হাঁটু জড়ো করে শুয়ে আছে রুবি। পাশে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়ে তার কোমরের দুপাশে কাতুকুতু দিচ্ছে সামাদ। মুখের ওপর বালিশ টেনে অদম্য হাসিটাকে চাপ দেবার ব্যর্থ চেষ্টা করছে রুবি।
হঠাৎ তারা দুজনেই দ্যাখে শিরিনকে। সামাদ কয়েক মুহূর্ত স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে থেকে, আবার ঝুঁকে পড়ে কাতুকুতু দেয় রুবি। রুবি মুখের ওপর থেকে বালিশ পেলে বাধাবন্ধনহীন ঝর্ণার মতো হেসে ওঠে এবার।
তারপর আঙুল দিয়ে রুবি সামাদকে দেখায় দরোজার দিকে? দরোজা খোলা। শিরিন সেখানে নেই। শিরিন বিছানাতেও ফিরে যায়নি।
জানালা খুলে, হাত বাড়িয়ে জুই গাছের ডাল সরিয়ে বৃষ্টির ঘন একটা চাদর দেখা যায় শুধু। আর কিছু না।
যদি তারা দেখতে পেত, তাহলে দেখত, শিরিন সেই সন্ধ্যে থেকে অবিশ্রান্ত বৃষ্টির ভেতরে খাল পেরিয়ে, নদী পেরিয়ে, মাঠ পেরিয়ে বুকের ভেতরে আগুন নিয়ে এখন এমন একটা গ্রামের দিকে যাচ্ছে যেখানে আর কোনো শোক নেই।
চিতা – চণ্ডী মণ্ডল
অসময়ে দার্জিলিং-এ এসে পড়েছে অবনী।
ফুল নেই। ফুলের মতো মরসুমী টুরিস্টের মেলা নেই। কাঞ্চনজঙ্ঘারই দেখা নেই–ধূসর জমাট মেঘের আড়ালে অদৃশ্য।
অবশ্য ম্যাল আছে। আর ঘোড়া।
ঠিক প্রমোদ ভ্রমণে আসে নি অবনী। সিজিনের শেষে আসার কারণ আর্থিক। এই কারণেই সম্ভবত, নেই নেই করেও দু চারশ পর্যটক এখনো আছে। ষাট টাকার ডবল বেড রুমে তিরিশ টাকায় কে না দুদিন বেশী থাকতে চায়! এরই মধ্যে যেদিন আবহাওয়া একটু ভালো থাকে, সকাল হওয়ায় আগেই সেদিন সকলে হৈ হৈ করে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ে।
সকাল থেকে দুপুর—বিকেলের আগে পর্যন্ত কে কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে থাকে। বিকেল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু সকলেই ম্যালে এসে হাজির হয়। যেন দার্জিলিং এ থাকার হাজিরা খাতাটা থাকে ম্যালে।
দুপুরেই বা তার আগেই ম্যালে চলে আসে দু-একজন। দুপুরের স্নান খাওয়া সকাল সকাল সেরে হোটেল থেকে সোজা চলে আসে। একটা বেঞ্চ দখল করে বসে সারাদিনের জন্যে।
যেমন শিপ্রা।
দার্জিলিং-এ বেড়াবার জায়গায় গাড়িতে চড়ে বা হেঁটে যেভাবেই যেখানেই যাওয়া যাক, চড়াই-এর ধকল সহ্য করতেই হবে একটু-আধটু। সেটুকুই সহ্য করবার সামর্থ নেই। শিপ্রার। অনেক দিন ধরে শিপ্রা খুব অসুস্থ।
অসুখটা কি বড় বড় ডাক্তাররা কেউ ধরতে পারছে না। কেউ কিডনির চিকিৎসা করেছে। কেউ হার্টের। কেউ ফিমেল ডিজিজের। কেউ মানসিক চিকিৎসার কথা ভেবেছে। সব অসুখই কিছু কিছু থাকতে পারে পারে, কিন্তু শিপ্রার আসল অসুখটা কি সঠিক ডায়গনোসিস করা যাচ্ছে না। সবাই বলে সেরে যাবে—সব আবার ঠিক হয়ে যাবে। দু বছরে ঠিক কিছুই হয়নি। শিপ্রা আরো রোগা আরো বেশী রক্তশূন্য হয়ে গেছে। ঘুমোতে পারে না। মন খুলে কথা বলতে পারে না। প্রাণ খুলে হাসতে পারে না। সব সময় চোখে মুখে আতঙ্ক আর অস্থির ভাব।—একটা চেঞ্জ দরকার, সব ডাক্তার এক মত হয়ে বলেছে—জল হাওয়ার চেঞ্জ চাই।
শিপ্রাকে সমুদ্রে নিয়ে গিয়েছিল অবনী গত বছর। পনের দিনের মতো ছিল সেখানে। কিন্তু লাভ কিছুই হয়নি—শিপ্রার মধ্যে চেঞ্জের কোন লক্ষণই দেখা যায়নি! সমুদ্রের উত্তাল উচ্ছ্বাস, আবেগের এক কণা পায়নি শিপ্রার শরীর, মন। মাঝখান থেকে অবনীর পনের দিন ছুটি আর পাঁচশর বেশি টাকা খরচ হয়ে গেছে। টাকাটা কিছু নয়, শিপ্রার সেরে ওঠাটাই জরুরী। ছমাস পরেই তাই আবার শিপ্রাকে নিয়ে এসেছে চেঞ্জে। মনোরম এই শৈলশহরে।
কিন্তু সাতদিন ধরে শুধু ম্যালেই বসে আছে শিপ্রা।
সন্ধের পর ধীরে ধীরে হেঁটে হোটেলে ফিরে যায়। রাতটুকুর জন্যে। সকাল সাতটা সাড়ে সাতটায় ঘুম ভাঙ্গে, তখন থেকেই ম্যাল-এ আসবার জন্যে তৈরী হতে থাকে—দুপুরের আগেই চলে আসে।
ভোরে সবাই প্রচণ্ড শীতের মধ্যে কাঁপতে কাঁপতে টাইগার হিলে ভীড় করে দাঁড়িয়ে। এক অলৌকিক সূর্যোদয় হবে—সারা পুবের আকাশ, সারা আকাশ সারা পৃথিবী আশ্চর্য আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। প্রত্যাশায় উত্তেজনায় আনন্দে আবেগে রোমাঞ্চে মানুষগুলোর মুখের আদলই বদলে যায়—সাধারণ একজন মানুষ অসাধারণ মহিমাময়। হয়ে যায়। সেই সময়টায় রোজই অবনী স্ত্রীর রোগ শয্যার পাশে আলাদা খাটে শুয়ে থাকে। হয়তো জেগেই থাকে। ঘুমিয়ে থাকলে স্বপ্ন দেখে হয়তো। হয়তো কোন দুঃস্বপ্ন।
অবনীর দেখা হয় না দার্জিলিং-এর কিছুই। বিখ্যাত সিনচর লেক, ঘুম মন্যাট্টি, বাতাসিয়া লুপ, ভিকটোরিয়া ফলস-বোটানিক্যাল গার্ডেনও কিছুই না। শিপ্রা অবশ্য বলে, তুমি কেন আমার জন্যে সারাদিন এক জায়গায় বসে থাকবে, তোমার কি ভালো লাগে—যাও না কোথাও বেড়িয়ে এসো।
অবনী হ্যাঁ না কিছু বলে না। অবনী জানে শিপ্রা মনে মনে চায় না অবনী দূরে দূরে একা একা ঘুরে বেড়াক। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে, তার আগে থেকেই শিপ্রার এই অদ্ভুত দুর্বলতা। কিছুতেই অবনীকে চোখের আড়ালে যেতে দেবে না।
