আহা, পরীক্ষার কথা আপনাদের কে বলেছে! পরীক্ষার কথাতো আমি বলি নি। তাজিন বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করে। কিন্তু বান্টির মা কোনো কিছু বলার সুযোগ দেয় না। বলে, হয়েছে ভাই, ঐ পড়াপড়ির মধ্যে আমরা নেই।
তাজিন সমবয়সী হবে বলে মনে হয় শাহিনার; তাই সামান্য ঘনিষ্ঠতাও হয়। একদিন সে জিজ্ঞেস করে বসে, আপনি আগে কোথায় ছিলেন মানে কোন্ স্কুলে?
কোনো স্কুলে ছিলাম না। তাজিন বলতে থাকে। বলে, বাসায় ছিলাম, রান্নাঘরে—এই স্কুলেই আমার প্রথম চাকরি।
নিজের থেকেই তাজিন আরও গল্প শোনায়। তাতে জানা যায়, স্বামীর উৎসাহে সে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হয়ে পরীক্ষা দিয়ে বি.এ. পাস করেছে, তারপর চেষ্টাচরিত্র আর ধরাধরি করেই স্কুলে চাকরিটা পাওয়া।
ওই গল্প শুনে শাহিনা কৌতূহলী হয়েছিল। জানতে চেয়েছিল, আপনার স্বামী নিশ্চয়ই কলেজে-টলেজে আছে?
নাহ্, কীসের কলেজে থাকবেন? এম. এ. পাস করলে তবে না কলেজে চাকরি হবে, ওতো বেকারই থাকে বেশির ভাগ সময়।
তার মানে?
নতুন নতুন সব খবরের কাগজে ঢুকে পড়ে, তার কিছুদিন পর কাগজ বন্ধ হয়ে গেলে বেকার হয়ে যায়।
তাহলে পুরনো ভালো কাগজে ঢুকলেই পারেন।
আরে নাহ্, তাজিনের গলায় কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছিল। বলেছিল, ভালো কাগজে ঢুকলে ওঁর রাজনীতিটা কে করবে?
তাজিন আরও দুঃখের কথা শুনিয়েছিল। কিন্তু সেসব সে মনে রাখে নি। ওর ঐ প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হয়ে বি.এ. পাস করার খবরটা তার মগজের ভেতরে ঠাই নিয়ে নেয় এবং তাকে খোঁচাতে শুরু করে। তার ফলে সে মনে মনে সুযোগ খোঁজে। স্বামী রত্নটিকে কিছু জানায় না। কেননা তিনি আবার মেয়েদের স্কুল কলেজে লেখাপড়া শেখানোর ঘোর বিরোধী। এমনকি নিজের বাচ্চা মেয়ে সামিনাকে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি করানোর সময়ও তার আপত্তি ছিল—তার ইচ্ছে ছিল মেয়েকে মসজিদের মক্তবে পাঠানোর। শেষে অনেক বলে কয়ে যখন বোঝানো হলো যে কেজি স্কুলেও আজকাল ইসলাম ধর্ম বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়, তখন সাহেবের সম্মতি পাওয়া গেল। সবই ভাল চলছিল। সে দিব্যি তাজিনের কাছ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসটাও চেয়ে নিয়েছিল, তার দেখাও হয়ে গিয়েছিল যে শুধু বাংলা আর ইংরেজিতেই এখন যা আলাদা। অন্যসব বিষয়ের সিলেবাস একই রকম, আট বছর আগে যা ছিল। সে মনে মনে আশা করতে শুরু করে তখন যে, প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে সে আল্লাহর ইচ্ছায় অনায়াসে বি. এ. পাস করতে পারবে। আর যদি সে পাস করতে পারে, তাহলে একটা কাজটাজ জোটানো কি অসম্ভব কিছু? সামিনাদের এই এ্যাপোলো কিন্ডারগার্টেনেই কি তার কাজ জুটতে পারে না?
তার আরও মনে হয়, সে যদি কাজটাজ জুটিয়ে নিতে পারে তাহলে আতিককে এখনকার মতো উদয়াস্ত খেটে বেড়ানোর দরকার হবে না। এইরকম চিন্তাভাবনা আর। আশা-আকাঙ্খ নিয়ে সে বলা যায় একরকম গুছিয়েই বসেছিল। বাড়িওয়ালার শালা সাবিদ আলীও বি.এ. পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছিল। খবরটা জেনে সে তাকেই ধরল বইপত্র যোগাড়ের ব্যাপারে। আতিককে কিছু বলে নি, কেননা বললে সে হাসাহাসি করবে। ভেবেছিল নিজে তৈরি হয়ে উঠতে পারলে তখন সে সবাইকেই জানাবে।
কিন্তু পারা যায় নি। মাস্টার মানুষ ঘরে বই থাকলে তার নজরে না পড়ে পারে?
প্রথম দিন ইয়োরোপের ইতিহাস বইখানা টেবিল থেকে তুলে হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, এ বইখানা কোত্থেকে এল?
শাহিনা তখন পাশের ঘরে ছিল। মেয়ে সামিনা জানিয়ে দিল, ও বই তো সাবিদ চাচার। আম্মুকে পড়তে দিয়েছে। বলেছে, আরও বই দেবে।
কবে দিয়েছে?
কেন, কাল দিয়ে গেল। আমরা স্কুল থেকে আসবার পর আমার হাতে দিয়ে গেছে।
আতিক বইখানা উল্টেপাল্টে দেখে আবার টেবিলের ওপর রেখে দেয়। দিন দুয়েক পরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান-এর বই চোখে পড়লে আতিক ফের মেয়েকে জিজ্ঞেস করে, সাবিদ চাচা আবার কবে এসেছিল?
বাহ্ এই তো, সকাল বেলা, যখন স্কুলে যাচ্ছিলাম, সামিনা হাসতে হাসতে জবাব দেয়।
তখন কিছু বলে না আতিক। কিন্তু রাতের বিছানায় বউকে এক প্রস্থ ভোগ করার পর জিজ্ঞেস করে, ঐ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বইখানা কি তুমি পড়ছে?
হ্যাঁ, শাহিনা ব্লাউজের বোতাম লাগাতে লাগাতে জবাব দেয়। বলে, দুপুরে কোনো কাজ থাকে না, তাই…..।
হুঁ, কাজ না থাকলে বই পড়া ভাল কিন্তু ও তো পাঠ্যবই, ছাত্ররা পড়ে—তুমি কী বুঝবে ওসব বই পড়ে?
দেখি পড়ে, শাহিনা বলে। বলে, একসময় তো পড়তাম, আমিও তো ছাত্রী ছিলাম।
সে তো এক যুগ আগের কথা।
একটু থেমে ফের বলে আতিক, পরীক্ষা-টরীক্ষা দেওয়ার ইচ্ছে-টিচ্ছে হচ্ছে নাকি?
ইচ্ছে তো হয়ই।
তা ইচ্ছেটা কি সাবিদ আলী জাগিয়ে দিয়েছে?
শাহিনা লু হাসে। বলে, বাহু তা কেন হবে, ও এবার পরীক্ষা দিচ্ছে, তাই ওর কাছ থেকে বই চেয়ে নিলাম।
আতিক আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ে।
শাহিনার মনে হয়েছিল, ব্যাপারটার ওখানেই শেষ কিন্তু পরে দেখে ব্যাপারটা নতুন সমস্যা তৈরি করে বসে আছে। দিন দুই পর থেকেই দেখে কর্তার মেজাজ একটুতেই খিচড়ে উঠছে। একই বাড়ি নিচতলায় বাড়িওয়ালা থাকে। সিঁড়ির মুখে কেন পানি জমে থাকে তাই নিয়ে গজর গজর করে। কলে যদি পানি না থাকে, তাহলে চাচামেচি জুড়ে দেয় আর নিচতলা সিঁড়ির পাশে, ড্রেনের ওপর বাড়িওয়ালার দু’বছরের নাতিটিকে যদি হাগতে বা মুততে দেখে তাহলে গালাগাল করে বাড়িওয়ালার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে দেয়।
