অ্যালাও করার কি আছে। তোমার পুরনো বন্ধু, একসঙ্গে অনেক মদ খেয়েছ, তাছাড়া আড্ডার মাঝখানে ও যেভাবে বোতলটা বের করে ফেলল, তাতে না বলার সুযোগটা পেলাম কই……
সুযোগ পেলাম কই, রাগে রুদ্র ভেংচে উঠল। কেন, আমার মুখ থেকে তো মাঝেমধ্যে গন্ধ পেলে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে শোও, তাও তো আগের মত রেগুলার খাই না….
তুমি তো নিজের জন্যে খাও না, তুমি তো এখন মদ খাও তোমার প্রয়োজনের লোকদের খুশি করার জন্যে, আর আজ যা বুঝলাম তা হল প্রবীর খায় শুধু নিজের জন্যে….
তাতে হয়েছেটা কি! এবার শুধু দাঁত্রে সঙ্গে দাঁত নয়, রুদ্রর শরীরে হাড়ের সঙ্গে হাড় ঢুকে যায়।
লিপিকার ভিতরে এসব কিছু তেমন কোন রেখাপাত ঘটাতে পারে না। নির্লিপ্ত স্বরে বলে, হবে আবার কি, বলছিলাম শুধু তফাতটার কথা। ও আর তোমার তফাৎ, তুমি অনেক দূর এগিয়েছ, অনেক সুন্দর হয়েছ, কিন্তু তুমি আর তুমি থাকতে পারোনি, ও ক্ষয়েছে, ক্ষয়ে ক্ষয়ে আর শীর্ণ হয়েছে, কিন্তু ও প্রবীরই রয়ে গেছে। এখনও সেই আগের মতই ব্যথা পেতে জানে। সকালে ও যখন সবে এবাড়িতে ঢুকেছে, দেখলে না আমার সিঁথিতে সিঁদুর দেখে কিরকম বিহ্বল হয়ে পড়ল। কেন তুমি জানাওনি ওকে আমাদের বিয়ের কথাটা…
রুদ্র মেঝের ওপরে দৃষ্টি নামিয়ে আনে। বলে, বিশ্বাস করো, অতো ভেবেচিন্তে ব্যাপারটা আমি করিনি। সেদিন ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে হঠাৎ করে ওকে নিয়ে একটু মজা করতে ইচ্ছে হয়েছিল…
মজা! হাঁ করে রুদ্র দিকে তাকাল লিপিকা। বলল, তুমি না শিল্পী, ছবি আঁকো!
আঁকি তো। এবার রুদ্রও অবাক।
প্রবীর, তো কবিতা লেখে, লিটিল ম্যাগাজিন করে, ও তো তোমারই মতো শিল্পী, একজন শিল্পী আরেকজন শিল্পীকে নিয়ে এভাবে মজা করতে পারে। কৌতুকপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। তুমি না আমায় ভালোবেসে বিয়ে করেছিলে। লিপিকা কিরকম যেন কঁকিয়ে ওঠে। বলে, তোমার ভিতরে শিল্পী-মানুষটা মরে গেলে আমি কাকে ভালোবাসবো বলল তো….
এখন রাত্রি-সমুদ্রের নীরবতা এই জনবসতিপূর্ণ লোকালয়ের ঘরটিতে।
রুদ্র ধীর পায়ে রান্নাঘরের সামনে থেকে সদরের দিকে চলে আসে। প্রবীর বলেছিল সিগারেট ফুরিয়ে গেছে। সিগারেট আনতে হবে এখন। সিগারেট আনা নয়, রুদ্র আসলে পালাল। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে পারছিল, কেন সকাল থেকে লিপিকা প্রবীরের মদ খাওয়াটাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। প্রবীর তো আসলে মদ্যপান করছে না। প্রবীর তো আসলে তার শরীরে সৃষ্ট ক্ষতের নিরাময় করছে। যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে। রুদ্রের কৌতুক।
খাঁচার ভিতর সুচিন পাখি কমনে বাঁইচে রয় – শওকত আলী
খিলগাঁও-এর বাসায় ঘরগুলো বেশ বড় ছিল, বারান্দাটাও ছিল চওড়া। ওদিকে আবার বাচ্চার স্কুল, বাজার, বাসস্ট্যান্ড—সবই ছিল কাছাকাছি। অসুবিধা ছিল শুধু একটাই, আর তা হল, সন্ধ্যাবেলায় প্রায়ই ইলেকট্রিসিটি থাকতো না। একদিন-দু’দিন পরপর সন্ধ্যাটি হতো আর অমনি ঝপ করে নেমে আসতো অন্ধকার। তখন মোমবাতি ধরাও, নইলে কুপি জ্বালাও, কেরোসিন আছে না ফুরিয়ে গেছে তা দেখে লণ্ঠনের চিমনি। মোছে—এইসব হাঙ্গামায় পড়তে হতো। হাঙ্গামা-টাঙ্গামা শেষ করে মেয়েকে পড়াতে বসতে বসতে রাত সাড়ে সাতটা/আটটা বেজে যেতো তখন আবার একসঙ্গে দুই কাজ-মেয়েকে পড়ানো একদিকে আর অন্যদিকে রান্না করা। দুই কাজই একসঙ্গে করতে হতো। শুধু একটা করতে গেলে অন্যটা বাদ পড়ে যেতো। মেয়েকেই যদি শুধু পড়াতো, তাহলে রাতের খাওয়া নিয়ে ঝামেলা হয়ে যেতো। কারণ কর্তার শুধু ভাত নয়, তরকারিও সদ্য রান্না হওয়া চাই। তবু ঝামেলা-টামেলা থাকা সত্ত্বেও সে মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছিল। নীলফামারী থেকে বাস উঠিয়ে ঢাকার এই খিলগাঁওয়ের বাসায় ঠাই গাড়া, সোজা ব্যাপার নয়। তবু সে সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে সংসার পেতেছিল। শুধু সংসার পাতাই নয়, নিজে কিছু করতে পারে কি না, সেই চিন্তাও তার মগজের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল।
সকাল ন’টার দিকে আতিক বেরিয়ে যেতো, সেই জন্যে রান্নাবান্নার কাজ শেষ করতে হতো আটটার মধ্যেই। স্বামী বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই মেয়েকে নিয়ে স্কুলের পথে বেরুতে হতো। মেয়েকে ক্লাসে ঢুকিয়ে দেওয়ার পরে আর তার কোনো কাজ নেই। সে স্কুলেই থেকে যেতো তারপর। মেয়ের ছুটি না হওয়া পর্যন্ত। বাসায় ফিরে সে করবেটাই বা কী? একাকি শুধু এঘর-ওঘর করা, নইলে জানালা দিয়ে রাস্তায় মানুষ দেখা তাছাড়া তিন ঘন্টা পর তো আবার মেয়েকে নেওয়ার জন্য আসতেই হবে। সুতরাং সে বাসায় ফিরতো না। অন্য বাচ্চাদের মায়েদের সঙ্গে সে স্কুলের। বারান্দায় নয়তো মাঠের গাছতলায় ঘাসের ওপর বসে আড্ডা দিতো।
স্কুলের নতুন টিচার তাজিন বেগমের সঙ্গে ঐ সময় তার আলাপ হয়। মহিলা একদিন বলে বসেন, আচ্ছা, আপনারা ওভাবে গল্প করে সময় নষ্ট করেন কেন, বলুন তো? অতক্ষণ ধরে কথা বললে মুখ ব্যথা করে না আপনাদের?
তাহলে কী করব?
বইটই সঙ্গে করে আনলেই তো পারেন। বই পড়ে দিব্যি সময়টা কাটিয়ে দেবেন।
বান্টির মা মোটাসোটা ভারিক্কি ধরনের মহিলা। তিনি বলে ওঠেন, বইয়ের কথা বলবেন না ভাই, স্কুল-কলেজে থাকার সময় ওসব অনেক পড়েছি, আর না এখন আমরা সংসারের পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত, অন্য পরীক্ষা দিতে পারব না।
