ঐ একই সময়ে শাহিনা স্বামীর মুখে এক নতুন আফসোস শুনতে পায়—কেন সে ছেলের বাপ হতে পারল না! বাপ সে হল, কিন্তু ছেলের নয়, মেয়ের। বিয়ে সে করল, তাতেও তার দান-যৌতুকহীন খটখটে কপাল। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে যে সংসার পাতল, সেখানেও আয় বরকত বলে কিছু ছিল না। আর বউটাও এমন যে বেটাছেলে পেটে ধরতে পারে না। আর যদি ছেলেপুলে না হয় বউয়ের, তখন?
শাহিনা বুঝতো, মানুষটার বড় আশা ছিল যে প্রথম সন্তানটি ছেলে হবে, কিন্তু তা না হওয়াতে মনের ভেতরে ক্ষোভ জমে আছে।
কিন্তু ঐ ক্ষোভ দূর যে করবে, সেই সাহস তার তখন কোথায় মফস্বলের প্রাইভেট স্কুলের অস্থায়ী চাকরি, কোনো মাসে বেতন হয়, কোনো মাসে হয় না–সরকারি অনুদানের টাকা আসে তিন মাস পর পর। অমন অবস্থায় সে কেমন করে ছেলে হওয়ার ঝুঁকি নেয়! লুকিয়ে লুকিয়ে পিল খাওয়া ধরেছিল, সেটাই সে চালিয়ে যেতে থাকে।
আতিক টের পেয়েছিল কি না সে জানে না। তবে ওব্যাপারে নজর দেওয়ার মতো অবস্থা তার তখন একেবারেই ছিল না। চাকরি খুঁজবে না বউয়ের পেট কেন বানাতে পারছে না তার খোঁজ করবে? সৈয়দপুর জংশন-এর রেলওয়ে স্কুলে লিভ ভ্যাকান্সিতে বছরখানেক কাজ করা পরও যখন চাকরি হল না তখন গেল বদরগঞ্জ। সেখানে সুবিধা না হলে বলীগ জামাতের এক লোক ধরে লম্বা পাড়ি দিয়ে একেবারে টঙ্গীর এক স্কুলে, তারপর সবার শেষে এই ঢাকার মাতুয়াইলে। তবু তো। প্রথম প্রথম মনস্থির করতে পারে নি চাকরিতে থাকতে পারবে কি পারবে না করতে করতে একটা বছর পুরো পার হলে তারপর বউ বাচ্চাকে নিয়ে ঢাকায় আসা। আর সেই তবলীগ জামাতের মানুষটির সুপারিশেই তার খিলগাঁওয়ের বাসা ভাড়া নেওয়া। এখন সকালে স্কুল, বিকেলে কোচিং সেন্টার আর রাতে একটা টিউশনি। রোজগার যা হচ্ছে তাতে সংসার মন্দ চলছে না। কিন্তু মানুষটার পরিশ্রম যে চোখে দেখা যায় না, তার কী হবে! তার খুব খারাপ লাগে। সংসারের জন্য মানুষটা একা একা খেটে মরবে? সংসারটাতো তারও। কিছুই কি সে করতে পারে না?
কিন্তু তার চিন্তাভাবনা যা-ই হোক, তাকে পাত্তাটা দিচ্ছে কে? কর্তাটির মুখে তখন উঠতে বসতে বউকে খোঁটা আর সর্বক্ষণ বাসাবদলের হুমকি। একেকদিন মেয়েকে কোলে বসিয়ে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করে, সাবিদ বই দিতে এসেছিল? আসে নি? বই দিতে এলে কি ঘরে ঢোকে? ঢোকে, তাই না? তখন কি দরজাটা খোলা থাকে?
শাহিনা একটু আড়ালে নিজেদের রাখলে কী হবে, কানে আসে সব কথাই, তখন সে কাদবে না হাসবে বুঝে উঠতে পারে না। সাবিদের মতো একটা অল্পবয়সী ছেলেকে জড়িয়ে বউকে যে মানুষ সন্দেহ করে, সে মানুষকে কী বলা যায়? প্রতিবাদ করারও তো রুচি হয় না তার। সে এও বোঝে—কোনোরকম প্রতিবাদ করে লাভ হবে না। সে বোঝাতে চেষ্টা করে আর সেজন্যে সে আরও ঘনিষ্ঠ হয়। অবশ্য অমন স্বামীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার ব্যাপারটা যে আসলেই শারীরিক সেটা তার অজানা ছিল না। যে মানুষ সকাল নয়টায় বেরিয়ে দুটোয় বাসায় ফেরে তারপর আবার তিনটায় বেরিয়ে ন’টায় দশটায় ফেরে, তার সঙ্গে কী ধরনের ঘনিষ্ঠতা হতে পারে সে ভেবে পায় না। শোয়ার পর একটু এটাওটা সংসারের কথা হয়। তারপর ধামসাধামসি চলে কিছুক্ষণ। শেষে বাবুসাহেব একেবারে কাত এবং শুরু হয় তার নাসিকা গর্জন।
এমন অবস্থায় শাহিনার আর কী উপায়? সে পিল খাওয়া বন্ধ করে দেয়। তারপর একদিন রাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে বলে, সামিনা তো ছ’বছরের হল, এখন আমাদের আর একজন দরকার, তাই না?
তার অমন দৃঢ় স্বরের কথার প্রতিক্রিয়ায় বীর পুরুষটির মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোয় না—যা হয় তার সবই শারীরিক এবং ধামসাধামসিটা সে রাতে এতো বেশি জোরে হয় যে দশ মাস আগে রাস্তার ধার থেকে কেনা পুরনো খাটখানি ভেঙে পড়ে।
শাহিনার ধারণা হয়েছিল তার পিল খাওয়া বন্ধের খবর এবং সন্তান ধারণের ইচ্ছা জানার পর আতিকের বাসাবদলের বাতিকটা কেটে যাবে। দেখা গেল আতিক সত্যিসত্যিই বাসা বদল সম্পর্কে কিছু বলছে না। উপরন্তু বাসায় ফেরার সময় কলাটা, কমলাটা, আপেলটা, প্রায় প্রতিদিনই আনছে। আর বাসায় ফিরতে বেশি রাতও করছে না।
দেখতে দেখতে এক মাস কেটে যায়। আতিক বউয়ের মুখের দিকে তাকায়, শরীরের দিকে তাকায়। কিন্তু উঁহু! কোনো লক্ষণই আবিষ্কার করতে পারে না। শাহিনারও চিন্তা হয়, ব্যাপারটা কী? সে বাঁজাটাজা হয়ে গেল নাকি? ছবর বার্থ কন্ট্রোল করলে মেয়েরা কি বাঁজা হয়ে যায়? সে ভেবে পায় না কার কাছে জিজ্ঞেস করবে কথাটা।
তার চিন্তা হয়, কিন্তু তবু বেশি পাত্তা পায় না চিন্তাটা। কারণ পড়াশেনার দিকে ততোদিনে তার মন বেশি ঝুঁকে পড়েছে। ইতিহাসের ফার্স্ট সেকেন্ড দুটো পেপারই মোটামুটি তার আয়ত্তে এসে গেছে। এখন বাকি শুধু থার্ড পেপারটা—সে ওটা নিয়েই তখন ব্যস্ত। তাকে বই জোগানো, প্রশ্ন তার সঙ্গে আলোচনা সাবিদ আলীই করছে।
একদিন দুপুরের আগে, বেলা তখন বোধহয় এগারোটা, হঠাৎ আতিককে আসতে দেখা যায়। তখন সাবিদের সঙ্গে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে আলাপ করছিল। অবশ্যি সাবিদ আতিককে দেখামাত্র নিচে নেমে যায়। আর সেও চলে আসে নিজের ঘরে। তাই প্রথমে মনে হয়েছিল আতিক তাদের দেখে নি। কারণ দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়া করল। রান্না খুব ভাল হয়েছে বলে প্রশংসা করল, কটার সময় মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে যাবে, তাও জিজ্ঞেস করল। তার অমন কথাবার্তা শুনে কে আন্দাজ করবে যে মানুষটা মনের ভেতরে অন্যরকম শয়তানি প্যাঁচ কষছে।
