অনিতা নেমে যেতে যেতে শুধু বলল বিড় বিড় করে, দাদার মত মানুষ হয় না। দাদা যদি শিব হয় তো আপনি নন্দীভূঙ্গি। বাব্বাঃ এমন বউ নিয়ে মানুষে ঘর করে!
.
৩.
অর্ণব ইলিশ মাছ এনে বলল, আজ যখন বেরোলামই না। তিন কিসিম ইলিশ কর। তোমার হাতের ভাপা কি যে স্বাদ হয়! আহা অপূর্ব।
অমলা পাশে এসে দাঁড়ায়। গামছা এগিয়ে দিয়ে বলে, ঘামটা মোছ। মুছে মুখ হাত পা ধুয়ে ফ্রেশ হও দেখবে ভাল লাগবে। একটু চা দেবো?
না চাইতে চা, গামছা, মিষ্টি মিষ্টি সোহাগ মাখা কথা শুনে অর্ণবের তো ভিরমি খাবার জোগাড়। মনে মনে ভাবে চোরা অম্বল নয় তো! আজ হ’ল কি! তাহলে নির্ঘাৎ তলার সঙ্গে উপরের একটা জবরদস্ত পাঞ্জা কষাকষি হয়েছে।
চা এনে অমলা পাশে এসে গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে আব্দারের সুরে বলে, চল না গো আজ কোথাও বেড়াতে যাই।
অর্ণব তো অবাক! বলল, বেশ তো কোথায় যাবে? তুমিই বল।
অমলা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বলল, গঙ্গাস্নান ছাড়া তো যাইনি কখনো, চল আজ গঙ্গার পাড়ে ঘুরে আসি। যাবে গো!
অর্ণব বলল, এ আর এমন কি যাব।
অমলা গুন গুন করে গাইতে গাইতে রান্না ঘরের দিকে হেঁটে গেল, লাজবতী। নূপুরের রিনিঝিনি রিনি, ভাল যদি লাগে তবে দাম দিয়ে কিনি, বেশী তো নেব না…। বেশ গায় অমলা। একান্নবর্তী পরিবারের হ্যাপা সামলাতে গিয়ে কত সাধ আহ্লাদ যে গলা টিপে মেরেছে সে।
অমলা হঠাৎ সরষে বাটা থামিয়ে রান্না ঘর থেকে চেঁচাল, তার চেয়ে ভিক্টোরিয়ায় চল। দারুণ মজা হবে।
অর্ণব ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলে, ধ্যস্ ছেলে ছোঁকড়ারা প্রেম করে ওখানে একটু নিরিবিলি। জানতে এই কাজে যে বাধা দেয় সে সুখী হয় না।
কাটা ঘায়ে নুনের ছিট পড়ল। বিষম খেল জোর অমলা। অর্ণব দৌড়ে এসে মাথা চাবড়াতে লাগাল। অমলা মনে মনে ভাবে এ কথা তাকেই বলল, ঝি মেরে বৌ শেখানো আর কি। তার মানে ভাড়াটে বউয়ের সঙ্গে ফস্টিনস্টিতে আমি বাঁধা না দিই। ভাবতে ভাবতে সাধের ইলিশ পুড়ে ছাই। অর্ণব দৌড়ে এসে দেখে আঁচলে চোখ মুছছে অমলা। ইলিশ, বালিশ ফাটা তুলোর মত ছত্রাখান।
অর্ণব চেঁচাল, কি হ’ল কি আবার? সব যে পুড়ে গেল!
অমলা ঝাঁঝিয়ে উঠল, যাক সব ছাই হয়ে যাক। কপাল পোড়ার আর পুড়তে কি বাকি আছে!
অর্ণব পিঠে হাত দিয়ে বলে, একটু শান্ত হও অমলা।
তোমার ঐ নীচের ঘরের টাইফুনটাকে শান্ত হতে বল গে যাও। বেশ ছিলুম। সংসারটা তছনছ করে দিল আমার। বলে আবার কাঁদতে থাকে।
অর্ণব অপ্রস্তুত হয়ে বলে, আরে বাবা এই তো গঙ্গার ঘাটে যাব। আবার কি এমন হল?
তুমি ঐ অনিতা কে নিয়ে যাও ঘুরে এসো গিয়ে খুশী হবে। ভেবেছিলুম বয়স বাড়লে স্বস্তি হবে ও ব্বাবাঃ কোথায় কি রস একদম গইড়ে পড়ছে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। সাধে কি আর কেউ ভাড়া দিতে চায় না। বলেই খস খস করে শিলের উপর নোড়াটাকে ঘসে ব্যাপ করে একদলা সরষে মাছের উপর ছুঁড়ে দিয়ে উঠে পড়ল অমলা।
অর্ণব জিজ্ঞাসা করে, কি হয়েছে বল তো?
অমলা ঝাঁঝিয়ে ওঠে, আর মিষ্টি কথায় দরকার নেই। গোড়া কেটে উনি এলেন আগায় জল দিতে। এসব মেয়ে মানুষের ঝেটিয়ে বিষ ঝেড়ে দিতে হয়। এসে বলে কিনা বাপের বাড়ি যাব, দাদাকে একটু এগিয়ে দিতে বলবেন। বাপের চাকর যেন। আজ তোমার দুর্বলতার জন্যে ভাড়াটে বউয়ের এত আস্পর্ধা। ঘরে স্বামীর পায়ে শিকলি বেঁধে, পরের স্বামী নিয়ে টানাটানি। আমি বরদাস্ত করব না বুঝলে।
ব্যাপারটা বুঝে অর্ণব হেসে বলল, শোন মানুষকে ভালবাসা কোন পাপ কাজ নয় গো। আস্তে কথা বল। লোকে শুনলে কি ধারণা হবে। আমি একটু টি ভি দেখতে যাই, তাও কালার টি.ভি. বলে। তাতে এত চেঁচামেচি করছ কেন?
অমলা হাসতে হাসতে বলল, দেখ রাগ কোর না। পাঁচজনে কি বলে বলতো, তুমি কি একবার ভাব না।
অর্ণব বলল, তুমিও কিছু মনে কোরনা একটা কথা বলি। আমি যে নীচের ঘরে টি.ভি. দেখতে যাই তা তো তোমার পঁয়ষট্টি ডেসিব এর বেশী চিল চিৎকারে সারা পাড়া জেনে গেছে।
অমলা অর্ণবের হাতটা ধরে বলে, আমি ওসব জানিনা, তুমি ও ঘরে আর যাবে। এই নাও গলার হার। বন্ধক দিয়ে একটা কালার টি.ভি. নিয়ে এসো। তবে তো হবে। নাকি টি.ভির সাথে চাঁদ মুখও চাই-ই?
অর্ণব উত্তেজিত হয়ে বলল, দেখ রমলা সহ্যের একটা সীমা আছে। তুমি অনেক কথাই বললে আমি আপত্তি করিনি। তুমি আমাকে বিয়ের রজতজয়ন্তী বর্ষ উদযাপনের পরেও সন্দেহ কর আমি ভাবতেই পারছি না। এই জন্যই বলে স্ত্রী চরিত্র দেবা ন জনন্তি। বুঝলে। খেয়ে দেয়ে রেডি হয়ে নেবে তাড়াতাড়ি। বেরোবো।
অমলার গলায় কপোট অভিমান ঝরে পড়ল, না আমি যাব না। সব মাটি হয়ে গেল। না আছে একটা ছেলেপুলে। না আছে শখ আলাদ। নিজেরা পুরুষ মানুষ বাইরে বাইরে থাক বুঝবে কি! আমিই এখন সংসারের দায় হয়ে উঠেছি। আমাকে সরাতে পারলেই তোমার পোয়াবারো। ‘প্রৌঢ়ের তরুণী আসক্তি’ পালাটা বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে আর কি! একটা দিন নিজে থেকে বলেছ, যে ভাড়াটা সময়মত দিন। তাতে কি মান যাবে? তিন মাসের ভাড়া বাকি কিন্তু ফস্টি নস্টির তো কিছু বাকি নেই। কাল, কাল যখন তুমি খবর দেখে বেরোচ্ছ তখন হাসতে হাসতে অনিতা এসে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়নি? আমি সব দেখেছি; বুঝলে। নিজের কপাল পুড়ছে নিজের চোখে দেখে কি আর চেঁচানো যায়!
