একনাগাড়ে কথাগুলো বলে অমলা কাঁধের গামছায় হাত মুছতে থাকল। আর যাকে উদ্দেশ্য করে এই কথার বৃষ্টিপাত সে কিন্তু ভিজেছে বলে মনে হ’ল না। বক্স জানালায় বসে উদাস হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আকাশ দেখছে। আর এই ঔদাসীন্য অমলাকে যেন আরও তাতিয়ে তুলল।
কে বলবে কথা কানে যাচ্ছে। বধির না কি! বিয়ে হয়ে ইস্তক এই এক জ্বালায় আমি জ্বলছি। বাবা যে কি দেখেছিল এই পাথরে! কালা হলেও নয় বুঝতুম। ও বাঃ এ তো শেয়ান পাগল রে। ভাড়াটের ঘরে যেতে বলতে হয় না। দাঁড়াও আমি দেখাচ্ছি মজা। উঠুক একবার। আর ভাড়া দেয় কোন হারামজাদা। পয়সা আমার দরকার নেই। হায় ভগবান দুটো পয়সার মুখ দেখতে গিয়ে শেষে কি মানুষটাই বেহাত হয়ে যাবে নাকি! বলছি অফিস থেকে তো অনেকক্ষণ এসেছ এবারে চা করি? নাকি সেটাও ভাড়াটের ঘরে সারবে?
বক্স জানালা থেকে অর্ণব নামতে নামতে শুধু বলল, ‘অমলা! এবার রেকর্ডটা বদলাও। ব্যাস তেতে ওঠা কড়াতে তেল পড়ল যেন। ছাত্ করে উঠল অমলা। হ্যাঁ তা তো বলবেই তোমার পিন যে ঐ ফাটা রেকর্ডেই আটকেছে।
অর্ণব প্রসঙ্গ বদলে জানতে চায়, অম্বলের ওষুধটা খেয়েছিলে তো? এত বলি জল খাও বেশী করে কে কার কথা শোনে। সাধে কি মেয়েদের কোলাইটিস হয়।
চা দিতে দিতে বলল, অমলা, হলে তো বাঁচতাম। রেকর্ড বন্ধ হয়ে যেত। তোমারও মুক্তি হত। আমি কি আর বুঝি না সেই সকালে বেরোও আর রাতে ফের। এসব কচকচানি কি কারো ভাল লাগে। নাও চা খেয়ে হাত-পা-মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নাও।
চা খাওয়া সেরে অর্ণব বলল, যাই একটু খবরটা—
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে অমলা ঝামরে উঠল, দেখে আসি তাই তো? আমি তো জানতাম। বলি ঘেন্না পিত্তির মাথা খেয়েছ নাকি!
অর্ণব জামাটা গলাতে গলাতে বলল, কেন তোমার গুরুদেবই তো বলেছে–লজ্জা-ঘেন্না-ভয়, তিন থাকতে নয়। আমি কি তোমার গুরুদেবের কথা কক্ষনো অমান্য করতে পারি?
জোঁকের মুখে যেন নুন পড়ল। চুপসে গেল অমলার হম্বিতম্বি। ফ্যা ফ্যা করে তাকিয়ে রইল পায়ে পায়ে সিঁড়ি ভেঙে নেমে যাওয়া অর্ণবের দিকে।
সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে অর্ণব চেঁচিয়ে বলল, তুমি আবার খেয়ে দেয়ে শুয়ে পোড় না। আমি এই যাব আর আব।
অমলা উত্তর দেয় না। কটমট করে তাকিয়ে থাকে।
আবার পিছনে এসে অমলাকে চেঁচিয়ে অর্ণব বলে, বনে বনে জলে জঙ্গলে আমাকে স্মরণ করিও আমিই রক্ষা করিব।’ বলে আর দাঁড়ায়নি। কি জানে আবার কি বলে।
অমলা রাগে গজগজ করতে করতে ফ্রিজ খুলে অবাক! মাছভাজার বাটিটাই হাওয়া। মনে মনে ভাবে নির্ঘাৎ অর্ণব নিয়ে গেছে তলায়। তলার বউটিও হয়েছে বড্ড গায় পড়া। দাদা দাদা করে আর রাখছে না। এবার যদি ফোঁটার ঘটা কেউ দেখত। যত সব আদিখ্যেতা। আমারটি বোধহয় রূপদেখে গলে জল। উঃ উঠলে বাঁচি। কি সাংঘাতিক! শেষ পর্যন্ত স্বামী টপকে হেঁসেলে ঢুকে পড়েছে দেখছি! রান্নাঘরে ফিরে এসে খুব লজ্জায় পড়ল অমলা। একদম ভুলেই গেছে গ্যাসে মাছ বসিয়ে সে। পাগলের মত খুঁজছে।
.
২.
সকাল থেকেই আকাশের মুখ গোমড়া। যে কোন সময়তেই তুমুল বৃষ্টি নামবে। বেলা তখন এগারোটা। ভাড়াটে গিন্নি অনিতা এসে হাজির।
–কি করছেন দিদি? রান্না বান্না হ’ল? দাদা বেরোয়নি বুঝি আজ?
-না ভাই। ও ছেলেকে আনতে গেছে। তা তুমি এ সময়ে কি মনে করে?
-এলুম। কত্তা বেরিয়ে গেছে। সে বেরিয়ে গেলে তো ঝাড়া হাত পা। কোন্ ছেলেকে আনতে গেছে?
-আমার দেওরের ছেলে। আমার তো কপাল পোড়া তা তো তুমি জান ভাই। ছেলেপুলে তো হ’লই না।
-তাতে কি হয়েছে। দাদার মত স্বামী পেয়েছে।
—দেখ অনিতা ঘরে একটা ছেলেপুলে না থাকলে সংসার শূন্য মনে হয় বুঝলে।
-হবে হবে অত ভাববেন না। মা ষষ্ঠি ঠিক দয়া করবে।
-তা তুমি কিছু বলবে?
-না বলছিলুম দাদা যখন আজ বেরোয়নি। আমি একটু বাপের বাড়ি যাব—
—তা যাও না। দাদা কি করবে?
-না বলছিলাম যদি একটু ধর্মতলা থেকে দীঘার বাসে তুলে দিয়ে আসে।
—কেন তোমার কতা এটুকু পারল না।
–তাহলে তো হয়েইছিল। যে যাকে নিয়ে ঘর করে সে বোঝে হাড়ে হাড়ে।
—দেখ অনিতা! পরের বউ পরের স্বামী চিরকালই ভাল হয় বুঝলে।
–একি বলছেন দিদি! আমি দাদাকে—
—ফোঁটা দিয়ে ভাই বানিয়ে তিন মাসের ভাড়া বাকি রেখেছ তাইতো?
—সে টাকা আপনাদের দিয়ে দেব। আপনি এসব কি বলছেন?
—যা বলছি ঠিকই বলছি। স্পষ্ট বলে দিচ্ছি সামনের মাসের মধ্যে ভাড়া না দিলে অন্যত্র উঠে যাও। আমার তো হরিহর ছত্রের মেলা নয়। তোমার দাদার আর কি, সে তো সংসারে হর্ষবর্ধন সেজে বসে আছে।
—ছিঃ আপনার মন এত নীচ।
—আর তোমার মন উঁচু।
–লজ্জা করে না পরের স্বামীকে বশ করতে চাও।
—দিদি ভুল বুঝছেন। দাদা টি.ভি.টা একটু দেখতে যায়।
—ঐ কালার টি.ভি. টাই তো আমার সংসার ডিকালার করে দিচ্ছে। এত টি.ভি. খারাপ হয়, ওটা কি খারাপও হয় না। তবে বাঁচতুম।
—আমি ভাবতেই পারছি না। আপনি দাদাকে সন্দেহ করেন?
—মুখ সামলে কথা বল। আমি কি করি তোমায় বলতে হবে আঁ! বিকেল হলেই সাজুগুজু। খোঁপায় মাছে দাঁতের মত ক্লিপ, কপালে টিপ, নখে রঙ, ঠোঁটে রঙ। কই তোমার কত্তাকে দেখেতো আমি অমন হ্যাংলাপনা করি না।
—আমি হ্যাংলা? আপনি অনেক কথাই বললেন। তা আপনিও তো পারেন আপনার স্বামীটিকে বশ মানাতে!
—যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা। তুমি যাও, যাও বলছি। একটি কথাও আর বলবে না। আজ আসুক। ভগবান! কপালে এও ছিল। শেষপর্যন্ত কিনা ভাড়াটে এসে বাড়িওয়ালাকে স্বামী মানুষ করা শেখাচ্ছে।
