অর্ণব মুখ ফসকে বলে ফেলল, দেখ অমলা! আজ দু বছর ওরা এসেছে ওর কোনদিন চিৎকার শুনেছ? বড় শান্ত স্বভাব। মেয়েদের স্বভাবে কোমলতা হচ্ছে সবচেয়ে বড় অলংকার। যেটা ওর আছে।
অমলা চোখ মুছে আগুন ঝরিয়ে তাকায়। চেঁচিয়ে ওঠে, ও তাহলে তলে তলে এত! আজ আমার সব খারাপ। আমার কিছুই নেই? পঁচিশটা বছর তো এই রূপের দাঁড়ে আটকে দোল খেয়েছ। ভীমরতিতে এসে ধরল শেষ বয়সে! তা যাও আবার
তলায় যাও চাঁদ মুখ না দেখলে যে মূৰ্ছা যাবে।
অর্ণব রাগতস্বরে বলল, এর থেকে অফিস গেলেই ভাল ছিল।
হঠাৎ নীচে কড়া নাড়ার শব্দ কানে ভেসে এলো। অমলা বলল, যাওনা দেখ কে এল আবার।
অর্ণব বলল, না আমি আর নীচে নামব না। এই তো বললে ভাড়াটে আছে নীচে যাবে না। যাব না। নিজে যাও।
অমলা গজ গজ করতে করতে নামতে থাকে। মুখেই অনিতার সঙ্গে দেখা হতেই মুখ বাঁকিয়ে চলে গেল দরজা খুলতে। যেন শত জন্মের রাগ।
দরজা খুলে থ্!
কাঁধে এক পেল্লায় বাক্স নিয়ে এক মুসলিম ভদ্রলোক বললেন, মা অর্ণব দত্তর বাড়ি এটা?
অমলা বিস্মিত চোখে খানিক চেয়ে থেকে বলল, হ্যাঁ। কিন্তু এটা কি ভাই? ছেলেটি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, টি.ভি.।
অমলা বলল, উপরমে চলিয়ে।
ছেলেটি টি.ভি. কাঁধে ঘরে ঢুকে নামিয়ে কাঁধের গামছায় মুখ মুছতে মুছতে বলল, বকশিস দিন বাবু। এটা কি কম ভারী বলুন!
অর্ণবও অবাক!
এমন সময় অনিতা পিছন থেকে ঢুকে অর্ণবের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হাতে ছোট পিতলের থালায় মিষ্টি। আর একটা রাখী। বলল, আজ রাখী পূর্ণিমা তাই দিদিকে মিষ্টি মুখ করাতে এলাম। আর দাদা হাতটা বাড়ান রাখীটা পড়িয়ে দিই।
অমলা অবাক হয়ে অনিতার আব্দারের দিকে তাকিয়ে থাকে।
অনিতা বলে, ছাপোসা ঘরে কালার টি.ভি. চট করে কি কেনা যায়! তিনমাসের যে ভাড়ার টাকা সেটা অ্যাডভান্স দিয়ে দাদার জন্য এই কালার টি.ভি.টা এনে দিলাম।
অমলা লজ্জায় কুঁকড়ে লাল। হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলে, তুমি কিছু মনে কোর না অনি! আমি হয়তো মাথা গরম করে ফেলি। কিন্তু এ আমার মনের কথা নয়।
অনিতা অর্ণবের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর ধীর অথচ শান্ত গলায় বলে, দাদা ও ট্রান্সফার হয়ে গেছে নর্থ বেঙ্গল। আমরা এ মাসটা আর থাকব। যাক এবার অন্ততঃ আপনাদের দাম্পত্য কলহর অবসান হবে। দাদাকেও আর কালার টি.ভি. দেখতে পাঁচবাড়ি যেতে হবে না।
অর্ণবের চোখের কোল ভিজে উঠতে দেখে অনিতাও চোখের জল সামলাতে পারল না। অমলাও কেমন যেন ভিতরে ভিতরে ভিজে উঠতে লাগল।
অনিতা অস্ফুটে বলল, দাদা! দিদি! প্রিয়জনের বিদায়বেলায় চোখের জল ফেলতে নেই। দিদি চা করুন। দাদা! টি.ভি.টা লাগান। তারপর চালিয়ে দিন। আজ আপনার টি.ভি. দেখতে দেখতে জমিয়ে গল্প করি।
অমলা চা করতে উঠতে উঠতে বলল, তোমরা বসে গল্প কর। আমি এক্ষুনি চা আর পাঁপড় নিয়ে আসছি কেমন।
অর্ণব কালার টি.ভি.টা সেট করতে করতে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখতে থাকে কলহপ্রিয় গুটিপোকার ভিতর থেকে বেরিয়ে অমলা যেন আজ আনন্দ প্রজাপতি।
কীট – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
একদিন নীলা চলে গেল।
একদিন না একদিন চলে যাওয়ার কথাই ছিল নীলার। তাই না যাওয়া এবং যাওয়ার মধ্যে খুব একটা তফাৎ হল না। সুবোধ নিজেই গিয়েছিল হাওড়া স্টেশনে নীলাকে গাড়িতে তুলে দিতে। বিদায়-মুহূর্তে স্বামী-স্ত্রীর যেমন কথা হয় তেমন কিছুই হল না। রুমাল উড়ল না, চোখের জল পড়ল না, এমন কি গাড়ি যখন ছেড়ে যাচ্ছে তখন জানালায় নীলার উৎসুক মুখও দেখা গেল না।
নীলা গেল তার বাপের বাড়ি মধুপুরে। সেখানেই থাকবে, না আর কোথাও যাবে তার কিছুই জানল না সুবোধ শুধু জানল নীলার ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই; অনেকদিন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল এরকমটাই হবে। খুব শান্তিপূর্ণ ভাবেই শেষ পর্যন্ত ঘটে গেল ব্যাপারটা।
খুব যে খারাপ লাগল সুবোধের—তা নয়। ভালও লাগল না অবশ্য। তার সম্মানের পক্ষে, পৌরুষের পক্ষে ব্যাপারটা মোটেই ভাল নয়। কত লোকের কত জিজ্ঞাসাই যে এখন তার ঘরে উঁকি মারবে তা ভাবতেও ভয় লাগা উচিত। লু ধ্ব ভেবেও সুবোধের মন শান্তই রইল। খুবই শান্ত। বাসে জানালার ধারের বদ্বার জায়গায় গঙ্গার সুন্দর হাওয়া এসে লাগছিল। এখন বসন্তকাল। কলকাতায় চোরা-গরম শুরু হয়ে গেছে। বাতাসটুকু বড় ভাল লাগল সুবোধের। লোহার প্রকাণ্ড জালের মধ্যে দিয়ে সে উৎসুক চোখে গঙ্গার ঘোলা রূপ, নৌকো, জাহাজের মাস্তুল আর কলকাতার প্রকৃতিশূন্য আকাশরেখায় প্রকাণ্ড বাড়িগুলোর জ্যামিতিক শীর্ষগুলি দেখল। মনোযোগ দিয়ে দেখল, দেখায় কোনো অন্যমনস্কতা এল না। ভালই লাগল তার। এমন অলস ভাবে আয়েসের সঙ্গে অনেককাল কিছু দেখেনি সে। বিয়ের পর থেকেই তার মন ব্যস্ত ছিল, গত দশ বছর ধরে সেই ব্যস্ততা, সেই উৎকণ্ঠা আর বিষণ্ণতা নিয়েই সে সবকিছু দেখেছে। আজ দশ বছর পর সেই ব্যস্ততা হঠাৎ কেটে গেছে। বড় স্বাভাবিক। লাগে সবকিছু। বঙ্কালের চেনা পুরোনো কলকাতার হারানো চেহারাটি হঠাৎ তার চোখে আবার ফিরে এসেছে আজ।
অনেকক্ষণ ধরে চলল বাস। ট্রাফিকের লাল বাতি, মন্থরগতি ট্রাম, রাস্তা পেরোনো মানুষের বাধা। সময় লাগল, কিন্তু অস্থির হল না সুবোধ। কোনোখানে পৌঁছোনোর কোনো তাড়া নেই বলে জানলার বাইরে তাকিয়ে ঘিঞ্জি ফুটপাথ, দোকানের সাইনবোর্ড, দোতলা বাড়ির জানালায় কোনো দৃশ্যকত কি দেখতে দেখতে মগ্ন হয়ে রইল।
