–ইয়েস? চাপা গলায় বলে মনোজ।—উড ইউ লাইক টু গো? অদ্ভুত ভঙ্গী করে হাসে মেয়েটি। তারপর শরীরে ঢেউ তুলে নির্বাক উঠে দাঁড়ায়। নিঃশব্দে মনোজের পেছন পেছন বেরিয়ে আসে।
—কোনদিকে যাওয়া যায়?
—যেদিকে নিয়ে যাবেন। গাঢ় লিপষ্টিক ঠোঁটে। মনে হ’ল রক্ত জমাট বেঁধে ফুলে আছে। কোথায় তোলা যায় একে? ফাঁকা বাড়িতে? কিন্তু পাড়ার কেউ যদি দেখে ফেলে? গলির মোড়ে যে ক্লাবটা আছে সেখানকার বোম্বেটে-মার্কা ছোঁকরাগুলো কিন্তু তাকে দেখেই সিগারেট লুকোয়। সম্মান দেয় তাকে। অসম্ভব…।
–কোন পার্কে-টার্কে গিয়ে বসা যাক! অনিশ্চিতভাবে প্রস্তাব দেয় সে।
–যা করার তাড়াতাড়ি করুন। গঙ্গার ঘাটে চলুন না।… নৌকোয়…। চাপা হাই তোলে মেয়েটি। মনোজ তার মুখের গহ্বর স্পষ্ট দেখতে পায়। দাঁতগুলোর ভেত্রদিক কি নোংরা! কালো ছোপ! তীব্র বিতৃষ্ণায় কুঁকড়ে যায় মনোজ।
–ট্যাক্সি-ফ্যাক্সি যাহয় একটা ডাকুন না। কথাটা বলেই তার অপেক্ষা না করে মেয়েটি নিজেই হাত তুলে একটা চলন্ত ট্যাক্সিকে দাঁড় করায়। উঠে বসে। সুতরাং মনোজকেও উঠতে হয়। ট্যাক্সি-ড্রাইভারের জিজ্ঞাসায় মনোজ নিজেকে অস্পষ্টভাবে বলতে শোনে—আউটরাম ঘাট। সন্ধ্যে পুরোপুরি নেমে এসেছে। রাস্তার এবং দোকানের আলোর সারি চোখের সামনে দিয়ে সরে যাচ্ছে দ্রুত। কুয়াশা আর ধোঁয়ায় বিধুর হয়ে আছে চারদিক। কিছুই স্পষ্ট করে চোখে পড়ে না। ট্যাক্সির অন্ধকারে মেয়েটি ঘন হয়ে সরে আসে তার দিকে। একটা হাত হঠাৎ তুলে দেয় মনোজের উরুর ওপরে। চমকে ওঠে মনোজ। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ হাতটাকে ঠেলে সরিয়ে দেয়। বুঝতে পারে মেয়েটি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মনোজ হঠাৎই অনুভব করে বার-এ মেয়েটিকে দেখে সেই উত্তেজনা যেন আর নেই। ব্রং সে যেন এই মুহূর্তে পালিয়ে যেতে চাইছে ওর কাছ থেকে। আবার মেয়েটির হাত এঁকেবেঁকে উঠে আসছে তার বুকে! ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে তার নাভির দিকে! মননজের মনে হয়। একটা সাপ কিলবিল করছে তার শরীরে! গঙ্গার কাছাকাছি ট্যাক্সি প্রায় পৌঁছে গেছে। এক ঝটকায় মনোজ হাতটা সরিয়ে দেয়। তারপর ট্যাক্সি থামিয়ে তাড়াতাড়ি নেমে পড়ে। ট্যাক্সি-ভাড়া মিটিয়ে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে—কত দিতে হবে? স্পষ্টতই এবার অবাক হয় মেয়েটি।–নৌকায় যাবেন না?
–কত দিতে হবে? কঠিন গলায় আবার জিজ্ঞাসা মনোজের।
–কুড়িই দিন তাহলে। হতাশ গলায় বলে মেয়েটি। পার্সটা হাতে ধরাই ছিল। একটা কুড়ি টাকার নোট বাড়িয়ে দেয়….
শরীরটা হঠাৎই যেন খারাপ লাগছে। একটু বমি হয়ে গেলে ভাল হ’ত কি? ফুটপাত ধরে এলোমেলো পা চালায় সে। রেলিং-এর ওপারে একটু এগোলেই বিশাল, ঘোলা জলরাশির বিস্তার। জাহাজের আলোগুলোকে তার কোনও নগরীর আলো মনে হয়। ঠাণ্ডা, মৃদু হাওয়া। সেই হাওয়ায় শরীরটা একটু যেন হাল্কা লাগে। ফুটপাতে একটা বেলুনওলাকে ঘিরে অনেক বাচ্চা আর মায়েদের ভীড়। বেলুনের কুমড়ো পটাশ বিক্রি করছে লোকটা। এক একটা কুমড়ো পটাশ শূন্যে ছুঁড়ে দিচ্ছে। ঘুরপাক খেতে খেতে তা আবার নেমে আসছে নীচে। মনোজ কি ভেবে দাঁড়িয়ে পড়ে সেখানে। বেলুনগুলোকে ঘিরে বাচ্চাদের এই চাঞ্চল্য, উল্লাস তার দেখতে ভাল লাগে।
—মাম্মি, আমাকে একটা কিনে দাও। দেবদূতের মতো একটা বাচ্চা তার মায়ের কাছে আবদার ধরে।
রোজই তো কিনে দিই। পেলেই তো এখুনি ফাটিয়ে ফেলবে। আজ থাক।
–না—আজও একটা কিনব। বায়না করতে থাকে বাচ্চাটা। মনোজ এগিয়ে যায়। পকেট থেকে খুচরো পয়সা বের করে একটা বেলুন কিনে বাচ্চাটার দিকে। বাড়িয়ে ধরে। একবার বেলুনটার দিকে আর একবার মনোজের মুখের দিকে তাকায় বাচ্চাটা। তারপর মায়ের দিকে তাকায়। মিষ্টি চেহারার একজন যুবতী। বেশ অস্বস্তিতে পড়েছে ভদ্রমহিলা। মনোজের দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে বাচ্চাটাকে বলে—আচ্ছা, উনি যখন দিচ্ছেন, নাও। থ্যাঙ্ক ইউ বলো।
–থ্যাঙ্ক ইউ। বেলুনটা নিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে বাচ্চাটা বলে। মনোজ হাঁটতে থাকে। হাঁটতেই থাকে। হঠাৎ আবার খুব হালকা লাগছে। মাথার ভারবোধও কম মনে হচ্ছে। সে ভাবে…। অরণি বলছিল স্টেটসে চলে যেতে। না,সে কোথাও যাবে না। সে এখানেই পড়ে থাকবে। তার এই অতি চেনা শহরে। হঠাৎ তার উপলব্ধি হয় যে একটা সুখী, উপদ্রবহীন সংসারের জন্য সে ভেতরে ভেতরে তৃষাতুর হয়ে আছে। সংসার ছাড়া তার পরিত্রাণ নেই। সংসারে ধরাবাঁধা ঘেরাটোপই তার একমাত্র আশ্রয়। হাঁটতে হাঁটতে মনোজ ঠিক করে ফেলে সে বনশ্রীর কাছে ফিরে যাবে। একবার চেষ্টা করে দেখবে। তার সামনে নতজানু হয়ে বলবে—যা হবার হয়েছে। এসো, আমরা সবকিছু ভুলে যাই। …এসো, আমরা আবার নতুন করে শুরু করি…।
কালার টি.ভি. – সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়
‘পই পই করে বলেছিলাম ভাড়া দিও না। নিজেদেরই জায়গা কুলোয় না। নাঃ ভাড়া না দিলে আর চলছিল না। যদিও বা দিলে তা সেখানে ছুতোয় নাতায় যাবার কি হয়েছে। মনে রেখো জামাই ছেলে হয় না, বউ মেয়ে হয় না আর ভাড়াটে কোনদিন আপন হয় না। বলি তোমাকে কি তুকতা করল নাকি! তুমিতো এমনটি ছিলে না। আজকাল বাবুর আবার কালার টি.ভি.র ব্যামো হয়েছে। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট নাকি মানুষের দেখার নয়। কালে কালে দেখব কত রাধার গায়ে থতমত! হুঁ:।
