-হ্যালো?
—আমি বলছি। আজ আমাকে নিতে আসবে একটু? ভুরু কুঁচকে খানিকক্ষণ ভেবে নিল মনোজ। তারপর গম্ভীর গলায় বলল
—কেন? হঠাৎ! খুব একটা খারাপ আছ নাকি?
—নিতে আসবে একটু? প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি।
—সময় নেই। দরকার মনে করলে তুমি নিজেই আসবে। ডুপ্লিকেট চাবি তো তোমার ব্যাগেই থাকে। ফোনটা রেখে দিয়েছিল। চুম্বক-টানেই যেন মনোজ সেদিন বাড়ি ফিরল বেশ তাড়াতাড়ি। দরজার দিকে তাকিয়েই তার বুকটা ধড়াস করে উঠল। তালা খোলা। ভেতর থেকে বন্ধ দরজা। কলিংবেল টিপতেই দরজা খুলে দিল বনশ্রী। একটু যেন লাজুক ভঙ্গীতে তাকালোও। খানিক পরেই নিয়ে এল চা। প্লেটে ভাল বিস্কুট। সেই বিয়ের পর প্রথম কয়েকটা দিনের মতো। চায়ের কাপ টেবিলে রাখার সঙ্গে সঙ্গেই মনোজ এক হ্যাচকা টানে বনশ্রীকে টেনে নিল নিজের দিকে। তারপর চুম্বনে চুম্বনে ভরিয়ে দিতে লাগল তার ঘাড়, গলা, বুক…। পরপর কয়েকদিন খারাপ কাটল না। একদিন ছুটি নিয়ে মনোজ বউকে নিয়ে একটা সিনেমা দেখল। তারপর ফেরার মুখে খানদানী হোটেলে ডিনার। যেন পল বেয়ে গড়িয়ে নামছিল স্রোত। গল গল করে কথা বলছিল দুজনে। যেন অতীতের তেতো, বিস্বাদ দিনগুলোকে ভুলে আবার ওরা দুজনে দুজনকে ঘিরে বাঁচতে চাইছে। একদিন রাতে ঘনিষ্ঠ হবার মুহূর্তে মনোজ বনশ্রীকে জানাল তার ইচ্ছার কথা। আর অপেক্ষা করা ঠিক নয়। বয়স বেড়ে যাচ্ছে দুজনেরই। এবার মনোজ বাবা হতে চায়। তার নিবিড় আলিঙ্গন থেকে যেন চাবুকের মতো ছিটকে বেরিয়ে এল বনশ্রী। না এত তাড়াতাড়ি নয়। বিবাহিত জীবনের স্বাদ আরও কিছুদিন নির্ভেজাল, নির্ঝঞ্ঝাট উপভোগ করতে চায় সে। এটা মনোজকে মেনে নিতেই হবে। এত তাড়াতাড়ি ঐসব ঝক্কি? অসম্ভব…।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় মনোজ জিজ্ঞেস করে—এটা কি বলছো তুমি? সন্তান মানে ঝামেলা? বহুক্ষণ যুক্তি দিয়ে বোঝালেও বনশ্রী বুঝতে চায় না। শেষকালে ফস্ করে বলে বসে—ঠিক আছে। আমাকে একটু মায়ের সঙ্গে আলোচনা করতে দাও। কথাটা শুনেই মনোজের মাথায় রক্ত চড়ে যায়। সন্তান তারা আনবে কি আনবে না এ ব্যাপারে তাদের যৌথ সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। এ ব্যাপারে আবার অন্য কারোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে এরকম অদ্ভুত কথা কে কবে শুনেছে! এসব কি বলছে বনশ্রী? সত্যিই বুঝতে পারে না মনোজ। চিবিয়ে চিবিয়ে সে বলে—তোমার মা যদি এখনও তোমার অভিভাবক থাকেন তাহলে আমার সঙ্গে থাকার কোন প্রয়োজন আমি দেখি না। কাল ভোরবেলাই তুমি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে। তোমার মায়ের কাছে গিয়ে থাকবে। আর কোনদিন এ-মুখো হবে না।
-কি? আমাকে এভাবে অপমান করলে? নিজের স্ত্রীকে এখনও সম্মান দিতে শেখোনি? রাষ্টিক! ব্রুট কোথাকার! এবার সত্যি সত্যিই মেজাজ হারিয়ে ফেলে। মনোজ। যেনবা প্রকৃত ব্রুটের মতোই সে বনশ্রীর দিকে এগিয়ে গিয়ে তার কোমল গালে পরপর দুটো চড় কষায় সাপটে! ফর্সা গাল রক্তিম আকার নেয়। যেন নিজের অজাইে ঘটনাটা ঘটিয়ে ফেলে মনোজ। বনশ্রী বোধহয় এতটা কল্পনাও করতে পারেনি। কয়েক মুহূর্ত পাথরের মতো নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে সে। তার দুগাল বেয়ে নিঃশব্দে জল বিছে মতো এঁকেবেঁকে গড়ায়।
—তুমি…তুমি আমাকে মারলে? অস্ফুটে বলে বনশ্রী।
—এতোবড়ো সাহস তোমার আমাকে রাষ্টিক বলো? আমার স্ট্যাটাস জানো?
—এই মুহূর্তে আমি বেরিয়ে যাব বাড়ি থেকে। আমি থাকব না তোমার সঙ্গে। একটা অসভ্য, ইতর লোকের সঙ্গে কিছুতেই থাকব না!
কাঁদতে কাঁদতে পাশের ঘরে গিয়ে সুটকেশ গোছাতে থাকে সে। আলমারী এবং আলনা থেকে শাড়ি, জামা, অন্যান্য টুকিটাকি তীব্র রাগে এলোমেলো ছুঁড়ে ফেলতে। থাকে। মনোজ বুঝতে পারে তাদের এই এতোল-বেতোল সম্পর্কের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে তারা। খাদের ধারে এসে দাঁড়িয়েছে। একটু পরেই সুটকেশ হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় বনশ্রী। তখন ঘড়িতে রাত সাড়ে দশটা। মনোজ কোন রকম বাধা দেবার চেষ্টা করে না। বিছানায় চোখ বুজিয়ে শুয়ে শুয়েই সে নিশ্চিত হয় যে, একটা ট্যাক্সি বনশ্রী ঠিক পেয়ে যাবে। এবং কোনরকম রিস্ক ছাড়াই বাপের বাড়িতে গিয়ে উঠবে…।
নির্দেশমতোই ড্রাইভার অনেকক্ষণ মনোজকে নামিয়ে দিয়ে গেছে পার্কস্ট্রীটের মোড়ে। আনমনা মনোজ নিজেকে একটা বুক-স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাতে দেখল। কোথায় যেন সে পড়েছিল আবহাওয়ার সঙ্গে মেজাজের একটা অদৃশ্য যোগাযোগ আছে। সারাদিন আকাশ গুম হয়ে থাকায় তার মনও যেন ভার হয়ে আছে। অতীতের তিক্ত স্মৃতিসব বুড়বুড়ি কাটছে। ভীষণ একা আর অসহায় লাগছে। একটা সাজানো জীবন সে চেয়েছিল। পরিবর্তে পেয়েছে একটা ফাটা, ভাঙা, বিশৃঙ্খল জীবন। এই মুহূর্তে সে কি করবে জানে না। অরণির বাড়ি যাবে? কাটিয়ে আসবে কিছুক্ষণ? কিন্তু মনে পড়ে গেল। আজ থাকবে না অরণিরা। কোথায় যেন বেরোবে। আবহাওয়ার মালিন্য থাকলেও পার্কস্ট্রীট কিন্তু প্রতিদিনকার মতো নিজস্ব বিভায় উজ্জ্বল। দোকানপাট, অভিজাত রেস্তোরাঁ ও বারগুলি ঝলমল করছে আলোয়। যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সামনের এক বারের দরজা সামান্য খুলে গেল। বাইরে বেরিয়ে এলো মার্কিনী উপন্যাসের চরিত্রের মতো এক উজ্জ্বল যুবক আর যুবতী। সপ্রতিভ ভঙ্গীতে ফুটপাতের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে উঠে গেল। বারের ভেতরকার ঠাণ্ডা হাওয়া এক ঝলক ছুঁয়ে গেল মনোজকে। হঠাৎই মদ্যপান করার করার ইচ্ছে জাগল তার। লম্বা পা ফেলে সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল। তার দীপ্ত হাঁটার ভঙ্গীতে উর্দি পরা বেয়ারা সচমকে উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট দিল। ভেতর চাপা গুঞ্জন, তবে এখন মজলিশ তেমনভাবে জমে ওঠেনি। অধিকাংশ টেবিলই ফাঁকা। সিগারেটের ধোঁয়া কুয়াশার মতো জমে আছে আলোগুলোর নীচে। ডিম লাইটের মৃদু আলোয় অলৌকিক লাগছে অভ্যর। মননজের মনে হয়, হঠাই যেন সে সমুদ্রের ভাসমান কোন জাহাজের কেবিনে ঢুকে পড়েছে কোণের দিকে একটা ফাঁকা টেবিল দেখে সে বসে পড়ে। খানিক পরেই সুবেশ অ্যাটেনড্যান্ট নোটবুক নিয়ে এগিয়ে আসে অর্ডার নেবার জন্য। কিছু খাবার আর হুইস্কির অর্ডার দেয় সে। বেয়ারা এসে দিয়ে গেলে কয়েকটা কাজু তুলে নিয়ে গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে মনোজ চারপাশে তাকায়। কিছু কিছু টেবিলে নারী-পুরুষেরা একসঙ্গেই বসে মদ্যপান আর গল্প করছে। নিজেদের নিয়েই মশগুল তারা। কারুর দিকে তাকাচ্ছে না। শুধু,ভাল করে তাকায় সে। বিপরীত দিতে একটা টেবিলে একজন বসে আছে একা। মহিলা। কারুর কি অপেক্ষায় এরকম পরিবেশে একা একজন মেয়ে। একটু অবাকই লাগে তার। বেশ কৌতূহল নিয়ে তাকায় মনোজ। মেয়েটিও তাকায়। সেই তাকানোর মধ্যে যেন কিসের ইঙ্গিত। সাজটা বেশ উগ্র। স্লিভলেস ব্লাউজে কাধ আর হারে অনাবৃত অংশ চকচক করছে। একটা আলগা চটকও যেন ছড়িয়ে আছে মেয়েটির মুখে। যেন মনোজের কৌতূহলী দৃষ্টির সামনেই মেয়েটি অস্বস্তিতে একটু নড়েচড়ে বসল। গুছিয়ে নিতে চাইল শাড়ির আঁচল। আর সেই মুহূর্তে পাশ থেকে ওর নিটোল স্তনের ঘনত্ব বুঝে নিতে অসুবিধে হ’লনা মনোজের। হুইস্কির ধীর প্রভাব কি কাজ করতে শুরু করেছে? মাথা যেন আরও ভারী হয়ে আসছে। দৃষ্টিও ঝাঁপসা! শরীরের মধ্যে যেন কিসের টান অনুভব করে সে। হঠাৎই মনে পড়ে, বনশ্রীর চলে যাওয়ার পর থেকে আজ চার মাস তার। শরীর উপবাসে আছে। একটা নারীশরীর নিজের মতো করে নাড়াচাড়া করার ইচ্ছেটা। যেন হঠাই চাড়া দিয়ে ওঠে তার ভেতর। বিল মিটিয়ে দিয়ে সে মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কথা বলছে না মেয়েটি। কিন্তু ওর ঠোঁটের কোণে প্রচ্ছন্ন হাসি। আর কথা বলছে চোখদুটি!
