–ধ্যাৎ। ছেলেরা আবার শাড়ি কিনতে পারে নাকি? আমার বাবা বলেন এরকম। চেষ্টা যে ছেলে করবে সে বোকা। এরকম কথার পর আর সেদিন মার্কেটিং করা হয়নি মনোজের। অফিসের কি একটা জরুরী কাজ মনে পড়ে গিয়েছিল তার। বনশ্রীকে সে পুজোর বাজারের টাকা ধরে দেয় পরে।
বনশ্রীর এই অদ্ভুত মাতৃ-নির্ভরতা ক্রমশঃ তার কাছে বিশেষভাবে পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে। প্রায় প্রতিদিনই দুপুরবেলা বনশ্রী নিজের বাড়িতে মা-এর কাছে চলে যেত। মনোজ অফিস বেরিয়ে যাবার পর তার নাকি খুবই ফাঁকা ফাঁকা, একা লাগে। বাপের বাড়ি তো আর বেশী দূর নয়। পার্ক সার্কাস। অনেক বোঝাতে চেয়েছে সে। হোক না দূরত্ব কম, তবুও বিয়ের পর নিজের ঘরবাড়ি ফাঁকা রেখে কেন প্রায়ই প্রতিদিনই মায়ের কাছে যেতে হবে তাকে? তার থেকে দুপুরে কিছু পড়াশোনা করো। হাতের কাজ করো। কিংবা নতুন নতুন রান্নার এক্সপেরিমেন্ট করো। আর যদি কোন স্কুলে চাকরি করতে চাও—তাও করতে পারো। চেষ্টা করো সে ব্যাপারে। কিন্তু কোন পরামর্শই মনঃপূত হয় না বনশ্রীর। তার পড়তে ভাল লাগে না। হাতের কাজ করতে ভাল লাগে না। একা একা কিছুই ভাল লাগে না। সুতরাং নিঃসঙ্গ দুপুর ও বিকেলগুলো সে মায়ের কাছে কাটিয়ে আসে। যদি সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকত ব্যাপারটা তাও না হয় হ’ত। কিন্তু এর থেকেও বাড়াবাড়ি শুরু হল। প্রায় দিনই অফিস থেকে সন্ধ্যের পর কোয়ার্টারে ফিরে মনোজকে দেখতে হয় দরজায় তালা ঝুলছে। তখনও ফেরেনি বনশ্রী। ডুপ্লিকেটে চাবির ব্যবস্থা করতেই হয় মনোজকে। এবং একদিন ব্যাপারটা চূড়ান্ত পর্যায়ে গেল। নিজেই দরজা খুলে, প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে সে নিজেই এক কাপ কফি করার কথা ভাবছে,—ঠিক তখনই ফোন।
—তুমি বলছ? ওধার থেকে বনশ্রীর বেশ উচ্ছ্বসিত গলা।
—হ্যাঁ।
—খুব রাগ করেছে মনে হচ্ছে। প্লীজ রাগ কোরো না। শোনো, সেই আমাদের ফুলদিকে মনে আছে?
—কে?
ফুলদি গোয় আমাদের বিয়ের দিন রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে তোমার সঙ্গে খুব ইয়ার্কি মারছিল। আমার মাসিমার মেয়ে। ফুলদি আর ওর হাজব্যান্ড আজ বিকেলেই পুনে থেকে কলকাতায় এসেছে। আমাদের বাড়ি উঠেছে। তো আজ সবাই মিলে ডিনার সারব। তুমিও চলে এসো। ওয়েট করছে সবাই।
—আমার শরীর খারাপ লাগছে। যেতে পারব না।
—যাঃ। সকালে তো সেরকম কিছু মনে হ’ল না। প্লীজ এসো, না এলে কি ভাববে বলো তো সবাই?
—তুমি যেতে পার। আমি যাব না।
-আচ্ছা। মা তোমার সঙ্গে কথা বলবে। বিরক্তির সঙ্গে ফোনটা ধরে থাকতে হয় তাকে।
—কে? মনোজ বলছ?
–হ্যাঁ। উত্তরটা দিয়েই প্রশ্নটা অবাস্তর মনে হয় তার।
–বনু কি বলছে তোমার শরীর খারাপ? আসতে পারবে না!
–না।
-ঠিক আছে। শরীর খারাপ থাকলে এসো না। কিন্তু বনু আজ একটু আমাদের সঙ্গে বেরোবে। বুঝেছো? আজ রাতে আর ফিরতে পারবে না। আগামীকাল ফিরবে। আর কথা বাড়ায়নি মনোজ। রিসিভার নামিয়ে রেখেছিল। রাগটা তার বনশ্রী আজ ফিরবে না বলে নয়। অনেকদিন পর আত্মীয়দের দেখা পেয়েছে। আজ একটু বাই মিলে থাকতেই পারে। কিন্তু সে তার শরীর খারাপ বলা সত্ত্বেও বনশ্রী তেমন কোন কৌতূহল বা উদ্বেগ প্রকাশ করল না ব্যাপারটাতে। অবিশ্বাসই করল। এতটা ঠিক নয়। মনোজের হঠাৎ মনে হল স্বাধীনতার সুযোগ যেন খুব বেশীই নিচ্ছে বনশ্রী। যৌথ জীবনের ন্যূনতম এটিকেটগুলোও মানছে না!
পরের দিন বনশ্রী ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই মনোজ প্রসঙ্গটা তুলতে চাইল।
—শোন, একটা কথা তোমায় অনেকদিন ধরে বলব ভাবছিলাম।
—কি কথা? ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে বনশ্রীর জিজ্ঞাসা।
—অফিস থেকে খেটেখুটে বাড়ি ফেরার পর কোন হাজব্যান্ডেরই কিন্তু তালা খুলে বাড়ি ঢুকতে ভাল লাগে না।
—ওরকম বেঁকিয়ে বলছ কেন? মাঝে মাঝে একটু অসুবিধে তো হতেই পারে।
–না। প্রায়ই দুপুরে তোমার বেরিয়ে যাওয়া চলবে না। একা লাগলেও থাকা অভ্যাস করতে হবে। অনেককেই ওরকম থাকতে হয়। তা বলে তুমি রোজ রোজ বাপের বাড়ি গিয়ে বসে থাকবে এটা আমার একেবারে মনঃপূত নয়।
তোমার মন রেখে যে সবসময়ে চলতে হবে এরকম কোন মানে নেই। আমার যখন যেখানে খুশী যাবো। তুমি আমার ওপরে কোন ফরমান জারি করতে পার না।
-আমি সব পারি। আমি তোমার হাজব্যান্ড…।
–তাই নাকি? হাজব্যান্ড হলেই বুঝি যা ইচ্ছে শাসন করা যায়? আসলে তুমি ভীষণ গোঁড়া। প্রেজুডিসড! বাইরে যতই আধুনিকতা দেখাও…।
—আমি গোঁড়া? …প্রেজুডিসড? আর তুমি কি? বিয়ে করার পরও মায়ের কথায় ওঠো বসো? কচি খুকী নাকি? শাড়ি চয়েস করতেও এখনও তোমার মাকে দরকার হয়! কেন তোমার নিজের কোন ব্যক্তিত্ব নেই? তাহলে বিয়ে করেছিলে। কেন? মায়ের কোলে দুধের বোতল নিয়ে শুয়ে থাকতে পারতে।
–ইনসালটিং কথাবার্তা বলবে না।
—শেষ কথা আমি বলে দিলাম। কাল থেকে দুপুরে বেরোনো বন্ধ।
—আচ্ছা দেখা যাবে। বলে মেজেয় দুমদাম শব্দ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল বনশ্রী। শুধু তাই নয়। সেদিন রাতে কিছু খেল না। এবং এক বিছানায় না শুয়ে পাশের ঘরে শুল। খাটটাকে সেদিন বিশাল এক প্রান্ত মনে হয়েছিল মনোজের। বনশ্রীর ব্যবহারে সে স্তম্ভিত হয়ে গেছে। সারারাত তারও ঘুম এলো না। পরের দিন। বেলা করে ঘুম থেকে উঠে চান সেরেই মনোজ অফিসের জন্য রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। একটা রেস্তোরাঁতে চা খেতে খেতে তার মনে হ’ল সকাল থেকে বনশ্রী এক কাপ চা করে দেওয়া দূরে থাক একটা কথা অব্দি বলেনি। সন্ধেবেলা মনের মধ্যে একটা চাপা টেনশন নিয়ে বাড়ি ফিরে সে দেখল দরজায় তালা। তার মানে বনশ্রী তার নিষেধকে কোন পাত্তাই দিল না। উপরন্তু তার দিকে ছুঁড়ে দিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। কোন খবর নেবার চেষ্টা করেনি সে বনশ্রীর। নিজের গোঁ নিয়ে সে বসে থাকল বাপের বাড়ী। একদিন বিকেলে মনোজের অফিসে ফোন বেজে উঠল…।
