চায়ের কাপে ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে মনোজ অল্প হেসে বলল—আমার কাছে। এসব নতুন কিছু নয়। যা—ওসব সাহেব-মার্কা কথাবার্তা ছাড়তো। কলকাতা যে এরকম সে ত’ বিশ্বশুদ্ধ সবাই জানে। তুই যখন এখানে রোজ থাকতি—তখনও কি খুব ভাল ছিল?
প্রায় ঘন্টা-তিনেক গল্প করা আর ঘন ঘন সিগারেট টানার পর উঠতে যাবে। মণিকা এসে বলল—খেয়ে যেতে হবে। অরণির মা বাবাও নাকি তাই বলছেন। অগত্যা আরও খানিকটা সময় গেল। খাওয়া-দাওয়া সেরে রাস্তায় নেমে যখন ট্যাক্সি নিল মনোজ তখন রাত সাড়ে-দশটা বেজে গেছে। মণিকা দোতলার ব্যালকনি থেকে বলল—এবার এলে-মিসেসকে নিয়ে আসবেন।…
জানলার ধার থেকে সরে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়াল মনোজ। কিছু ফাইল আগে থেকেই ছিল। আবার সকাল থেকে কিছু ফাইল এসে জমেছে। ময়লা, ছেঁড়া, স্মৃতির মতো ধূসর ফাইল সব। খুললেই পড়তে হবে প্রতারক ভাষা। নিজেকে লিখতেও হবে প্রতারক ভাষা। এভাবেই কতদিন? …অনেকদিন…। গতকালই তো অরণির সঙ্গে বয়স হিসেব হচ্ছিল। আটত্রিশ চলছে তার। কম করে এখনও বছর কুড়ি এই চাকরি করে যেতে হবে তাকে। কোনো পরিত্রাণ নেই। অবশ্য এই চাকরিটা আছে বলেই সমাজে তার যাকে বলে একটা পজিশন আছে। এই চাকরিই তাকে দিয়েছে দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত পাড়ায় একটা ছিমছাম ফ্লাট। গাড়ি। কিন্তু এসব পেয়েও কি সে সুখী? শাস্তি এলো কি জীবনে? কোনদিন আসবে? দিনের শেষে বাইরের কাজের পর ক্লান্ত মানুষেরা তাড়াহুড়ো করে তোড়জোড় চালায় বাড়ি ফেরার। প্রত্যেকেরই বাড়ি আছে। সংসার আছে। সন্তানের উষ্ণ সান্নিধ্য আছে। কিন্তু তার কি আছে! বিয়ে করেও, সংসার শুরু করেও বিবাগী সে। কার জন্য বাড়ি ফিরবে? গতকাল প্রসঙ্গটা অনেকবার উঠেছে অরণির কথাবার্তায়। আর বরাবরই অস্বস্তি হয়েছে তার। ব্যক্তিগত সমস্যার কথা কাউকে বলে লাভ কি? চেম্বারের দরজা খুলে পিয়ন এসে দাঁড়াল। ভুরু কুঁচকে তাকাল মনোজ।
–কিছু বলবে?
—একজন ভিজিটর এসেছেন স্যার–।
—আজ আর কারুর সঙ্গে দেখাটেখা করা যাবে না। ভীষণ ব্যস্ত আমি। এখনই বেরিয়ে যাব। সত্যিসত্যিই অ্যাটাচিটা নিয়ে প্রস্তুত হয় মনোজ।
—আচ্ছা স্যার।
লিফটে নেমে এসে এদিক ওদিক তাকায়। সামনেই আছে গাড়িটা। এখন বিকেল চারটে। গাড়িতে উঠে বসে সে। ড্রাইভার ঠিক বুঝতে পারে না কোথায় যেতে হবে। তাই জিজ্ঞেস করে।
-পার্কস্ট্রীটের মোড়ে নামিয়ে দাও।
–ভীষণ জ্যাম স্যার। কি একটা মিছিল বেরিয়েছে। সত্যিই ভীষণ জ্যাম। সারি সারি গাড়ি সামনে। আবহাওয়া সত্যিই বিশ্রী আজ। সারা দিন আকাশের মুখ ঝুলে আছে। রোদের লেশমাত্র নেই। বিকেল বেলাতেও শহরের কোথাও কোন ঔজ্জ্বল্য নেই। পথচারীদের মুখেও যেন বিষণ্ণতা লেগে আছে। সবাই যেন রিমোট কন্ট্রোলে চালিত হয়ে যন্ত্রের মতো হাঁটছে, হাত-মুখ নাড়ছে, ফিসফাস কথা বলছে সবাই। কারুরই যেন কোন প্রাণ নেই, সজীবতা নেই। কি যেন বলছিল অরণি! আমেরিকায় যেতে? ওখানে জীবনকে জীবনের মতো উপভোগ করা যায়। মেদিনী কাপিয়ে বেঁচে থাকা যায়। তাই যাবে কি? সঞ্চয়ের টাকা যা আছে প্লেনভাড়া কোন ব্যাপার নয়। এখন সে একেবারে প্রায় মুক্ত, স্বাধীন। পিছুটান নেই। তিনশো বছরের এই প্রাচীন শহরে আহত ইঁদুরের মতো মুখে রক্ত তুলে বেঁচে থেকে কি হবে? যদি এখনই চাকরি থেকে ইচ্ছাকৃত অবসর নেয় তাহলে সরকারী তহবিল থেকে প্রায় লাখ দেড়েক টাকা। তারপর যদি ভিসা ম্যানেজ করা যায় তাহলে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বা আমেরিকা যে। কোন জায়গাতেই যেতে অসুবিধা কোথায়। চাকরি নাকি বিদেশে পেতে অসুবিধে হয় না। কিন্তু সত্যিই কি সে যেতে পারবে? সত্যিই কি তার কোন পিছুটান নেই? এই কয়েক মাসের নিঃসঙ্গতায় সে কি একবারও মনে মনে চায়নি বনশ্রী ফিরে আসুক…।
সমস্যাটা নিয়ে অনেক ভেবেছে মনোজ। যখন প্রচণ্ড অশান্তির মধ্যে দিয়ে, মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে দিনগুলো কাটছে, বিনিদ্র রাতগুলো কাটছে তখন প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত সে নিজের জীবনের বিশ্রী অভিজ্ঞতাগুলো চিরে চিরে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছে। এরকমও তো হতে পারে যে সে তার মতো করে সমস্ত কিছু দেখছে। ফলে নিজের দোষ-ত্রুটিগুলো হয়তো তার নিজের কাছে ধরা পড়ছে না। এবং কিছুটা সেকারণেই সে অনেক ভেবেছে। নিজেকে দর্শকের আসনে বসিয়ে, নিরপেক্ষভাবে সবকিছু বিচার করতে চেয়েছে। কিন্তু না; বারবার তার মনে হয়েছে বনশ্রীর সঙ্গে এই যে তার মতের অমিল,দৈনন্দিন জীবনের খুব তুচ্ছ ব্যাপার নিয়েও তর্কাতর্কি; এসব্বে কারণ বনশ্রীর অদ্ভুত, অপরিণত মানসিকতা। ব্যাপারটা সে প্রথম উপলব্ধি করে বিয়ের মাস ছয় পরে—পুজোর সময়। বোনাসের টাকাটা হাতে পেয়ে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর সে। অফিস থেকে বাড়িতে ফিরেই বৌকে প্রস্তাব দিল চলো আজ মার্কেটিংএ বেরোব। একটা খুব দামী শাড়ি কিনে দেব তোমাকে।
–সত্যি? উত্যু বনশ্রী বলল।
—হ্যাঁ। চলো।
—তাহলে মাকে একটা ফোন করে দি?
–মাকে? কেন?
—মা সঙ্গে থাকলে খুব সুবিধে হবে। ওনার মতো শাড়ি পছন্দ করতে আমি পারব না। আর তাছাড়া আমার শাড়ি এ যাবতকাল সবই পছন্দ করে এসেছে মা। আমার নিজের পছন্দে কোনদিন কিছু কিনতেই পারি না!
গম্ভীর হয়ে যায় মনোজ। একটু আগেকার আবেগ, উচ্ছাস-সব যেন লোডশেডিং হওয়ার মতো নিভে যায় দপ করে! নিজেকে সামলে নেবার জন্যে একটা সিগারেট ধরিয়ে সে বলে বিয়ের আগে না-হয় তোমার মা সব পছন্দ করে দিতেন। কিন্তু বিয়ের পরে তো আর সেরকম হওয়া উচিত নয়। এবার থেকে আমিই না-হয় পছন্দ করে দেব তোমায় সবকিছু।
