—আরে আমি রে আমি। অরণি! ইট সিমস ইউ হ্যাভ ম্যানেজড টু ফরগেট মি—।
—অরণি? আরে কি আশ্চর্য! কোথা থেকে?
–ডোভার লেন থেকে।
–মানে?
–মাসখানেকের ছুটি নিয়ে তোরা কে কেমন আছিস দেখতে এলাম। আজ সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে আয়। মণিকার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। আমার বউ রে! শালা চিঠি দিলে তো উত্তর দিস না।
–চিঠি আমাকে?
–আবার কাকে? তোর বউকে?
বুকের মধ্যে আচমকাই একটা ধাক্কা খেল মনোজ।….
সামলে নিয়ে বলল—একটা চিঠিও পাইনি। মাইরি বলছি। এখানকার পোস্টাল সার্ভিস ভেরি পুওর। এ দেশটা তো আর তোর স্টেটস নয়–।
–যাই হোক। আজ চলে আয়। সাতটা নাগাদ। আই উইল এক্সপেক্ট ইউ ও. কে?
–ও. কে.। যাব।
গিয়েছিল মনোজ। অফিস থেকে বেরোতে একটু দেরী হলেও ঠিক সময়মতোই পৌঁছে গেল। ডোভার লেনে অরণিদের বাড়িতে শেষ এসেছিল ঐ বছর পাঁচ আগেই। এতদিন পর হলেও বাড়িটা চিনতে অসুবিধে হ’ল না। গোলাপী রঙ। দোতলা বাড়ি। জানলার কাচ নীল। কলিং বেল টিপতেই যিনি দরজা খুলে দিলেন তিনি অরণির বাবা।
—আরে-এসো-এসো। অরণি সেই কখন থেকে তোমার জন্যে বসে আছে। সিঁড়ির চাতালের কাছে পৌঁছে অনিশ্চিত ভাবে দাঁড়াতেই বললেন—যাও। দোতলায় আছে। মনোজ লক্ষ্য করল পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলেও সময়ের থাবা তেমনভাবে ভদ্রলোকের চেহারায় পড়েনি। সেই আগের মতোই দীর্ঘ, টানটান, সুন্দর চেহারা। শুধু মাথার চুলগুলো সব পেকে গেছে।
—কেমন আছেন মেশোমশাই? সিঁড়িতে উঠতে উঠতে মনোজ জিজ্ঞেস করে।
—ঐ আছি আর কি! রিটায়ার্ড ম্যান! আমাদের আর থাকা।
—মাসিমা?
—ঐ একরকম। ওনার তো আবার আথ্রাইটিসের কষ্ট!
-তাই নাকি? বলার সঙ্গে সঙ্গেই সে অরণির মাকে দেখতে পেল। কথাবার্তা শুনে মনোজের গলার আওয়াজ বোধহয় চিনতে পেরেই দালানের শেষে একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এলন। মনোজকে দেখে, ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন যে চিনতে পেরেছেন। দোতলায় উঠেই সামনের ঘরে সোফায় কাত হয়ে অরণি বসেছিল। দেখেই লাফিয়ে উঠল—আয় আয়। মণিকা দেখো কে এসেছে। আজ দুপুরে যাকে ফোন করেছিলাম।
বেশ ভালই দেখতে অরণির বৌকে। লম্বা উজ্জ্বল ফর্শা। তীক্ষ্ণ নাক। স্বপ্নালু চোখ। মাথার চুল, সচরাচর হয় না, অদ্ভুত কোঁকড়ানো। বয়কাট। সব মিলিয়ে একটা আধা-দেশী, আধা বিদেশী ছাপ। মনোজকে দেখে বেশ আন্তরিকভাবে হাসল।
–বসুন। আপনার গল্প প্রায়ই শুনি ওর কাছে। একা এলেন? মিসেসকে আনলেন না।
বুকের মধ্যে আচমকা আবার ধাক্কা খায় মনোজ। চকিতে সামলে নিয়ে, প্রশ্নটা এড়িয়ে অল্প হেসে নাটকীয়ভাবে সে নিজেকে বলতে শোনে—কিরে অরণি? বউটাকে দেখছি ভালই বাগিয়েছিস। ইউ আর এ লাকি চ্যাপ। স্পষ্টতই খুশীতে আরও উজ্জ্বল হয়ে মণিকা হেসে ওঠে। অরণিও হাসে। তারপর বলে শালা—অন্যের বউ তোর কাছে তো বরাবরই সুন্দরী রে! তোকে আর আমি চিনি না? কিন্তু নিজের বউটাকে ঘরের মধ্যে চাবি দিয়ে এলি কেন? সঙ্গে আনতে পারলি না? বেশ একসঙ্গে চারজনে আড্ডা দেওয়া যেত। তুই তো বিয়ে করলি আমি স্টেটসে যাওয়ার পর। আমি তবু একটা ইনভিটেশন কার্ড তোর অফিসের টেবিলে রেখে আসতে পেরেছিলাম। তুই তো তাও পাঠাসনি! বিয়ে করে, হনিমুন-টুন করে, বউটাকে বাসি করে তারপর একটা চিঠি পাঠালি যে তুই বিয়ে করেছিস। বল—এটা কি বন্ধুর মতো কাজ হ’ল?
মণিকা একটু চাপা গলায় বলল—আঃ অরণি। কি আজেবাজে ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজ করছ?
মনোজ তাড়াতাড়ি হেসে বলল—ঠিক আছে। ঠিক আছে। অরণিটা বরাবরই কিন্তু এরকম। কাকে কি বলতে হয় জানে না। দেখছি এতকাল স্টেটসে থেকেও কথা
বলতে শেখেনি। সেইসব সাত-পাঁচ ভেবেই তো বউকে আনিনি। কি উল্টোপাল্টা বলে দেবে! রসিকতাটা ধরতে পেরে ওরা দুজনেই গলা ফাটিয়ে হেসে উঠল। খানিক বাদেই বিদেশী সিগারেট অফার করল অরণি। তারপর মণিকার দিকে তাকিয়ে বলল—যাও। টী-এর অ্যারেঞ্জমেন্ট করো। আমরা ইন দি মিনটাইম দুজনে সুখ-দুঃখের গল্প করে নি।
—নিশ্চয়ই। মণিকা চলে গেল।
গল্প-সল্প বেশ অনেকক্ষণই—চলল। ফস করে অরণি একবার জিজ্ঞেস করে বসল—আমাদের বয়স-টয়স কতো হলে রে মনোজ? ঠিক খেয়ালও থাকে না।
–কম হল না রে!
–কতো?
—তুই আমার থেকে এক বছরের ছোট। আমার আটত্রিশ চলছে। তুই নিশ্চয়ই সাঁইত্রিশ। আমাদের দুজনেরই বেশ লেট ম্যারেজ।
–সাঁইত্রিশ-আটত্রিশ বছরকে তুই বেশী বয়স বলছিস? দূর! এখন আবার সবকিছু নতুন করে শুরু করা যায়।
-সত্যি? মনোজ খানিক্ষণ চুপ করে সিগারেট টানল। অরণির এই কথার মধ্যে সে যেন এক গভীর অর্থ খুঁজে পেয়েছে। অরণি এবার বলল-স্টেটসে একবার চলে আয় মনোজ। দেখে যা কতো আরামে আছি! বডোসড়ো চাকরি তো অনেকদিন করছিস। মাইনেও মনে হয় খারাপ পাস না। দু-সপ্তার ছুটি নিয়ে চলে আয়। শুধু প্লেনভাড়া তোর। ওখানকার থাকা-খাওয়া এবং অন্যান্য জায়গায় বেড়ানো খরচ আমার। কিরে যাবি?
-আচ্ছা তুই তো এখনও বেশ কয়েকদিন আছিস। ভেবে দেখবখন। মণিকা বেশ কিছুক্ষণ চা আর স্যাণ্ডউইচ রেখে গেছে। একটা স্যাণ্ডউইচ ভেঙে মুখে দেয় মনোজ। অরণি চা-এর কাপে চুমুক দিয়ে বলে—চলে আয়। কলকাতায় কি করে যে তোরা ডে-টু-ডে লাইফ চালাস! এই কবছরে রাস্তাঘাটের যা হাল দেখছি। সেদিন দমদম এয়ারপোর্টে নেমে জানিস তো একঘন্টার ওপর দুজনে দাঁড়িয়ে আছি। একটা ট্যাক্সি পাই না! সবাই বলে—এখন রাস্তা জ্যাম। সাউথের দিকে যাব না। শেষ অব্দি একজন রাজী হ’ল। তাও আবার তাকে এক্সট্রা কুড়ি টাকা দিতে হ’ল! ক্যান ইউ ইমাজিন? একজন ট্রাফিক পুলিশকে বললাম। গ্রাহ্যই করল না?
