ক’টি তো মুহূর্ত। কিন্তু এই অল্প একটু সময়ের ব্যবধানে হিমাংশু এই ঘর, পরিবেশ, সংসার, স্ত্রী কন্যা সমস্ত থেকে ছিটকে এক বীভৎস অন্ধকারে গিয়ে পড়ে। সেখানে কিছু কী আছে? বাতাস, আলো? কিছু না। শুধু সাপের কুণ্ডলীর একটা হিমস্পর্শ, আর প্রতি পলকে শত সহস্র বিষাক্ত দংশন। যার বিষে এখনো সে অসাড়, যার ক্রিয়ায় এখনো সে অচেন এবং যে-দংশনে তার স্নায়ু মৃত।
নিছক একটা মানসিক প্রাণ এখনো আশ্চর্যভাবে গিরি-গোপন শীর্ণ জলপ্রবাহের মত ক্ষীণ স্রোতে বয়ে যাচ্ছে। শুধু এইটুকু মাত্র অনুভূতিতেই হিমাংশু এখনো কানের। কাছে যুথিকার সেই তীক্ষ্ণ নির্মম নিষ্ঠুরের মত শানিত কথাগুলো শুনতে পাচ্ছে। আর শুধু শোনা নয়, যুথিকার প্রত্যেকটি অভিযোগ অদ্ভুতভাবে একটি একটি করে অসংখ্য ছবি ফুটিয়ে তুলছে। জীবন্ত করছে বহু ঘটনা, বহু মুহূর্ত, বহু অবচেতন অভীপ্সা। পুতুলের বুকে মুখ গুঁজে হিমাংশু হাসছিল বটে, কিন্তু কোথায় একটা সুধার স্পর্শ যেন ছিল। ঠিক, ঠিক—পুতুলের হাঁটুর ওপর থেকে বস্ত্র সরিয়েছে, কিন্তু চোখে পড়ছে—একটি অন্য আকাশ, কি ফুল, সুডৌল রক্তশ্বেত একটি মেঘ, কি পাপড়ি। অস্বীকার করবে কি হিমাংশু, পুতুলের চুল, চোখ, সর্বাঙ্গের ঘ্রাণ ওর চিত্তে যে শিহরণ জাগিয়েছে তার মধ্যে কোন আনন্দের স্বাদ ছিল না?
কোন কিছুই অস্বীকার করবে না হিমাংশু; করতে চায় না আজ। এই নিষ্ঠুর সত্যের মুখখামুখি দাঁড়িয়ে কার কাছে কি গোপন রাখতে পারে সে? নিজেকে? তারই ত অংশ পুতুল। নিজেকে গোপন করার অর্থই ত পুতুলের কাছে নিজেকে গোপন করা। হিমাংশু তা পারে না। যদি মনের সঙ্গোপনে জট পাকিয়ে গিয়ে থাকে অজ্ঞাতে, অদ্ভুত কোন কামনার আবর্ত সৃষ্টি হয়ে থাকে তবে সব আজ প্রকাশ হোক।
জানলাটা হাট করে খুলে দেয় হিমাংশু। শীতের কুয়াশায় সমস্ত আচ্ছন্ন; পাশের বাড়িটাও হারিয়ে গেছে। হয়ত অমনিই হবে-স্নেহের আর পিতৃত্বের কুয়াশায় হিমাংশুর সত্য পরিচয় ঢাকা ছিল। আবার যেন একটা বিষাক্ত ছোবল খেয়ে ওর চিস্তাটাই অসাড় হয়ে এল।
বাতি জ্বালবে নাকি হিমাংশু? এত অন্ধকার! যেন একরাশ অশরীর প্রেতস্পর্শ ওকে ঘিরে রয়েছে। একটু আলো আসুক। হিমাংশু অস্থিরভাবে অন্ধকারে হাত বাড়ায়। হঠাৎ চমকে উঠে হাত সরিয়ে নেয়। না, না, অন্ধকারই ভালো। আলো নয়। আলো এসে হিমাংশুকে প্রকাশ করে দেবে, নিজেকেই নিজে দেখতে পাবে, স্পর্শ করতে পারবে। কুৎসিত একটা গলিত কুষ্ঠকে কি স্পর্শ করা যায়না, প্রকাশ করা যায়! ফিঘিন করে ওঠে হিমাংশুর গা, মন, হাত পা। থাক, অন্ধকারেই থাক। আর যেন আলো না ফোটে। হা ঈশ্বর।
পলে পলে পলাতক সময় এসে রাত চুরি করে নিয়ে যায়। কখন যেন হিমাংশুর খেয়াল হয় তার চোখ, মুখ, মাথা সব পুড়ে যাচ্ছে। অসহ্য যন্ত্রণা, জ্বালা। একরাশ ছুঁচ ফুটে চলেছে মাথায়। কোথায় যেন, কোথায় যেন? হিমাংশু শক্ত মুঠিতে চুল চেপে ধরে টানে! টানে। আঃ কি আরাম!
জলের জন্য আকুলি-বিকুলি করছে প্রত্যেকটি শিরা, প্রতিটি স্নায়ু। একটু জল।
হিমাংশু কেমন করে যেন বারান্দার দিকের দরজাটা খুলে বেরিয়ে আসে। হুট করে ছুটে পালায় বেড়ালটা। ঠাণ্ডা কনকনে হাওয়া এসে গায়ে মাথায় চোট দিয়ে যায়। আরো একটু সম্বিত ফিরে পায় হিমাংশু। বুক টেনে টেনে নিশ্বাস নেয়। দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে একবার আকাশ দেখে, কয়েকটা তারা। তারপর টুক করে বাথরুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে যায়। আবার একটু মৃদু শব্দ। ভেতর ছেকে ছিটকিনি তুলে দেয় হিমাংশু।
বাথরুমে এসে দাঁড়াতেই হিমাংশুর খেয়াল হয় কাঁচের উঁচু জানালা দিয়ে একটু ফরসা এসে ঢুকছে। পা পা করে এগিয়ে যায়; জল নয়, আয়নার দিকে। আয়নায় অস্পষ্ট, খুব অস্পষ্টভাবে মুখ দেখা যাচ্ছে তার। একেবারে কাছটিতে এসে পাড়ায় হিমাংশু। আয়নার বুকে একটা জল ধোওয়া শ্লেট-রঙের ছবি ফুটেছে। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে হিমাংশু সেই ছবির মধ্যে কাকে বুঝি খুঁজছে।
গালে হাত তুলতেই ছবির মধ্যে থেকে সেই ছায়াকৃতি লোকটাও নড়ে ওঠে–হিমাংশু সে নয়, কারণ হিমাংশু পিতা, কিন্তু ও অন্য লোক, যে পিতা নয়, পশু। যার দৃষ্টি—ঈশ্বর, যার দৃষ্টি সুস্থ মানুষের নয়, জানোয়ারের।
হিমাংশুরই অসম্ভব ঘৃণা হয় তার ওপর–। শুধু ঘৃণাই নয়; তাকে ধিক্কার দেয় হিমাংশু, ইচ্ছে হয় ওর টুটি চেপে ধরে, ওর রক্তের পঙ্কিল গন্ধে…
আশ্চর্য, আরো কি ফরসা হয়েছে আকাশ–নাকি একটু আলো আসছে কোথাও থেকে। আয়নার ছবিটা আরো স্পষ্ট, আয়নার নীচের একটি সরু ব্র্যাকেটে সাজান দাড়ি কামানার সাবন, ডেটল, ক্ষুর, সেই রবারের হ্যান্ডেল, ব্রাশ সব ফুটে উঠেছে।
জানোয়ারটার চোখে চোখ রাখতেই আর ইচ্ছে হচ্ছে না হিমাংশুর। ওর রক্তের পঙ্কিল গন্ধ যেন ভেসে আসছে। বিকৃত মুখভঙ্গী করে হিমাংশু ব্র্যাকেটের ওপর থেকে ক্ষুরটা তুলে নেয়।
রক্তের স্বাদ আছে, কিন্তু গন্ধ আছে নাকি? নেই? কিন্তু ভ্যাপসা পচা ঘার মতন গন্ধ আসছে কোথা থেকে? পঙ্কিল রক্তের, কলুষ নিশ্বাসেরও হতে পারে। হতে পারে ওই পশুটার।
হিমাংশু আর সহ্য করতে পারছে না। ঘিনিঘিনে গন্ধটা তার সর্বাঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এমন কি বুঝি রক্ততেও মিশে গেছে।
