মণিবন্ধের একটি শিরায় ক্ষুরটা জোর করে চেপে ধরল হিমাংশু। তারপর ছোট্ট একটু টান। ছত্রিশ বছরের অমিত তাপে তপ্ত একটি যৌবনের উষ্ণ শোণিত ফিনকি দিয়ে ছুটে এল। আঃ, কি টনটনে আরাম! কি আরাম, কি শান্তি; যেন হু হু করে জ্বর ছেড়ে যাচ্ছে। আরো একটু দ্রুত মুক্তি চাই, দ্রুত। এবার ডান হাতের মণিবন্ধে গভীরভাবে ক্ষুরটা টেনে দেয় হিমাংশু।
টুপ টুপ…জল কি পড়ছে নাকি? সিরসির করছে নাকি গা? ঘুম কি আসছে এতক্ষণে? হয়ত কিছুই না, সব ভুল—সব ভুল। লু এ আশ্চর্য আরাম। যেন অনেক কলুষ রক্ত বিশুদ্ধ হাওয়ায় এসে শুদ্ধ হচ্ছে, তারই আরাম; একটা পুঁজ রক্ত ফোড়া থেকে আশ্চর্য যাদুবলে যেন সব কষ্ট কেউ শুষে নিচ্ছে, তারই স্বস্তি।
আরো একটু আলো এসেছে না ঘরে! হিমাংশু চমকে চায়। ইস্, এ যে অনেক রক্ত। কোথাও তা কালো রঙ নেই, সেই কুৎসিত কালো, যাতে পাপের বীজ লুকিয়ে থাকে। নেই, নেই—? হিমাংশু তবু খোঁজে, সতর্ক চোখে। যদিও কেমন যেন আচ্ছন্নতা আসছে। এবং কান্নাও।
তবে কি নিষ্ঠুর সত্যটাও ফাঁকি দিয়ে গেল? হিমাংশুর দুর্বল শরীরটা আর একবার যেন মরিয়া হয়ে ওঠে। আর এবার ক্ষুরের আগা দিয়ে শিথিল, কম্পিত, স্বলিত হাতে গলায় একটা টান দেয়।
ধীরে ধীরে এতক্ষণে গভীর তন্দ্রা নেমেছে হিমাংশুর মনে, একটা অব্যক্ত যন্ত্রণাও ছড়িয়ে পড়েছে, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, তৃষ্ণাটা তালুর কাছে এসে ঠেলে ওঠে।
বেসিনের কাছে হাত বাড়াবার চেষ্টা করে হিমাংশু, পারে না। মাথা ঢুলে আসে, মেঝেতেই লুটিয়ে পড়ে।
অব্যক্ত একটা যন্ত্রণা পুরু ভারী লেপের মন পা-মাথা সব ঢেকে ফেলেছে। বুক চুইয়ে যেন একটি প্রশ্বাস আসে; একটি নিশ্বাস যায়। অদ্ভুত একটা আবেগ গলার কাছে পুঁটলির মত পাকিয়ে গেছে।—আর ঘুম—গভীর, গভীরত্র আচ্ছন্নতা। এই আচ্ছন্নতার মধ্যেই আকাশ যেন দেখতে পেল হিমাংশু, খানিকটা আকাশ এবং ক্রিমসন রঙের একটি মেঘ।—মেঘ-মেঘ। না, মেঘ নয়; মেয়ে। হিমাংশুর মেয়ে যার নাম পুতুল, বয়স পনেরো বছর নয়, পনেরো দিন। অসহায়, উলঙ্গ, নির্বোধ একটি রক্তপিণ্ড। কে? মেয়ে। …পনেরোটি পাপড়ি যেন আরও খুলে যায়, একে একে একটি একটি করে—আর এক-একটি পাপড়িতে একটি করে বছর বিকশিত হয়ে ওঠে। পুতুল শুধু তিলে তিলে গড়ে উঠেছে হিমাংশুর হাতে হাতে। কল্পনায়, বাস্তবে। যা শুধু শীর্ণ শাখা তাকে শাখায় শাখায় প্রসারিত করে, পত্রপল্লবে সাজিয়ে, পুষ্প সম্ভারে ছেয়ে দিতে—হিমাংশু তার জীবনের সমস্ত সুষমা, শ্রম, স্নেহ অকৃপণভাবে ব্যয় করে চলেছে। কেন? এ কে? তার মেয়ে? এ কি ভিন্ন? হ্যাঁ, দেহ থেকে ভিন্ন। কিন্তু তবু ভিন্ন নয়, রক্তের সেই আশ্চর্য লীলার কাছে ওরা এক, সেই আত্মায় ওরা অভিন্ন। ওর আত্মায় এর জন্ম, এর জীবন, এর লীলা। আর হিমাংশু জানে এই অভিন্নতাকেও একদিন ভিন্ন করতে হবে; এই আত্মাকেও। কী নিষ্ঠুর! এস্থিমোচনের আশঙ্কায় হিমাংশু ভয় পায়। ভয় পায় কেন? পাবে না—? পাবে বইকি কারণ পুতুলও শেষে একদিন যূথিকা হয়েই সংসারে ফুটে উঠবে—যোল বছরে যার জীবন যৌবন, প্রেম, উদ্দিপনা, আনন্দব অন্ধকার করে নেমে আসবে একটি চিরাচরিত অভ্যাস— যা কুটিল, জটিল, সতত সন্ত্রস্ত। আর তখন? তখন হিমাংশু শূন্য; যেমন আজ, জীবনের সেই ছেলেবেলার সুখ, স্বপ্ন মুক্তি সমস্ত থেকে সে শূন্য—যেমন বিতাড়িত যুথিকার উত্তপ্ত অনুরাগ থেকে। হিমাংশুর হৃৎপিণ্ডে এতক্ষণে একটা সাহস এল, ভাসমান মনে একটি আশ্রয়। না, তবে এই ত কারণ, যা পনরো বছরের পুতুলকে ছোট দেখেছে, ছোটই ভেবেছে। প্রার্থনা করেছে নিঃশব্দে, নিত্যদিন? পুতুল, আমার পুতুল, আমার কাছে ছোটটি থাক চিরকাল-ঈশ্বর, তুমি ওর যৌবন দিয়ো না, প্রজাপতির রঙ ছুঁড়ো না ওর মনে। ও যে আমার সেই ছেলেবেলা, আমার সেই সুখ, সেই মন আর আনন্দ। সেই আত্মা, একটি শুধু অক্ষয় স্মৃতি। পনেরো বছরে যুথিকাকে নিয়ে আমি যা হারিয়েছি, যুথিকা যা হারিয়েছে তার স্পর্শ কেন দেবে নিকুবের মতন ওকেও?
হিমাংশু শেষে ঘুমের ঢেউয়ে ভেসে যাবার আগে চেষ্টা করল উঠে দাঁড়াবার, বাথরুমের দরজা ভেঙ্গে ছুটে গিয়ে পুতুলকে বুকে জড়িয়ে ধরবার। কিন্তু তাই কি সে পারে? পারে না। মন দিয়ে স্মৃতিকে জীবন্ত করা যায়, আত্মাকেও কিন্তু দেহকে। হিমাংশু একবার চোখের পাতা খুলেছিল একটু আর সেই একটু জুড়ে বাইরের রসার মধ্যে একটি বিনুনি ঝোলানো ক্রিমসন রঙের মুখ ছিল, একটি মুখ, যা হিমাংশুর আত্মার। যে-ছবি ও নিজেই দেখেছে আর কেউ নয়। কেউ না।
আমি একটা মানুষ নই – আশাপূর্ণা দেবী
একটা মাঝারি সাইজের সুটকেসের মধ্যে নেহাৎ দরকারি, বলতে গেলে অপরিহার্যই কয়েকটা জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিল স্বাতী। একটু যেন বিপদেই পড়ে যাচ্ছে। অপরিহার্যর সংখ্যাও যে এত তা তো আগে খেয়াল হয়নি।
কিন্তু কী নেবে, কী নেবে না?
অরিন্দমের দেওয়া নয়, অথবা অরিন্দমের পয়সায় কেনা নয়, এমন জিনিস কটা আছে স্বাতীর? কোথায় আছে? মাঝে মাঝে মা বাবার উপহার কিছু দামী দামী শাড়ি। আর কী?
হঠাৎ মনটাকে ঝেড়ে ফেলে। ঠিক আছে, এতদিন ওর সংসারে আমি যে সার্ভিস দিয়েছি, তার জন্যে আমার কিছু পারিশ্রমিকও প্রাপ্য নেই কি?
