ঘড়ির কাঁটায় শব্দ ঠেলে রাত গভীর হয়ে আসে। সব নিস্তব্ধ। শীতের রাত। সমস্ত পাড়াটাই এতক্ষণে যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। এ বাড়িটাও। একটা বেড়াল সিঁড়ি দিয়ে পালিয়ে গেলে তার শব্দ শুনতে পাওয়া যায়, কেউ খিল খুললে, জানলার ছিটকিনি দিলেও খুট করে আওয়াজ ওঠে। এমন কি, পুতুল ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কেশে। উঠছে—সেই খসখসে ভাঙ্গা আওয়াজ নিবিড় নিস্তব্ধতার মধ্যে কানে লাগে। অনেকখানি ঠাণ্ডা খড়খড়ির ফাঁক দিয়েও যেন যুথিকাদের ঘরে ঢুকে পড়েছে। বারোটা বেজে গেল। ঘড়ির সেই ঘণ্টা পেটার শব্দটা যেন বারোটা মুগুর পিটে গেল ঘরের অন্ধকারে। ধকধক করে যাচ্ছে যূথিকার বুক, খসখসে একঘেয়ে কাশি কেশে চলেছে পুতুল। ফট করে বাতি জ্বলে উঠল। যুথিকার বিছানার পাশে হিমাংশু।
দেখছে বই-কি হিমাংশু—পাশাপাশি মা আর মেয়েকে। যূথিকা ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে, বালিশের ভাজের তলায় মুখ চাপা, ডান হাতটাও গালের ওপর দিয়ে কপাল বেয়ে, বালিশের প্রান্তে এলিয়ে রয়েছে। কিছু ভালো করে দেখা যায় না। চোখের পাতা বোজা।
মার দিকে মুখ করে কাত হয়ে ঘুমচ্ছে পুতুলও! ক্রিমসন রঙের সেই লুজ ফ্রক এখনো তার অঙ্গে। গায়ের লেপটা সরে গেছে—অর্ধেক দেহটাই তার খোলা। হিমাংশু আরো একবার মুগ্ধ চোখে মেয়েকে দেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। সাদা চাদর আর বালিশের ফেনার মধ্যে সূর্যাস্তের রঙ চোপান একটি ঢেউ যেন। হয়ত দুঃস্বপ্ন দেখে ঠোঁট খুলে কেমন একটু ককিয়ে উঠে থেমে গেল পুতুল, আবার কাশল খুকখুক করে। নড়ে চড়ে উঠে ফের শান্ত। রাত্রে কাশিটা আবার বেড়েছে মেয়েটার। যেভাবে শোয়, রোজই হয়ত ঠাণ্ডা লাগে। গলার কাছটায় অত ভোলা না রাখলেই কি নয়। হিমাংশু হাত বাড়িয়ে গলার কাছটায় জামার টিপকলটা এঁটে দেয় পুতুলের, লেপটা টেনে দেয় গলা পর্যন্ত। কতকগুলো চুল কপালের পাশ দিয়ে চোখে এসে পড়ছিল। আস্তে আস্তে সরিয়ে দেয়। গভীর সোহাগে গালে মুখে কপালে হাত বুলিয়ে সরে আসে। বারান্দার দিকের দরজাটা ফাঁকা হয়েছিল। বন্ধ করে দেয় হিমাংশু। ছিটকিনি তুলে দেয়। বাতি। নেয়। তারপর পরদা সরিয়ে যায় নিজের ঘরে।
বিছানার দিকে এগোতে যাচ্ছে হিমাংশু, হঠাৎ কে যেন পিছ থেকে টান দিল চাদরে।
মুখ ফেরাতেই দেখে যূথিকা।
“তুমি ঘুমওনি?” হিমাংশু অবাক।
“না।” ঘুম থেকে ত নয়ই যেন খুব জ্বর থেকেও উঠে এসেছে, তেমনি শুকনো টকটকে ওর চোখ-মুখ, তেমনি বিশ্রী ঝঝ আর তিক্ততা তার গলায়!
“কি করছিলে তবে এতক্ষণ?” হিমাংশু আবার এগুতে চায়।
“তোমার কীর্তি দেখছিলাম।” যুথিকা আবার বাধা দেয়।
“কীর্তি!” অবাক চোখে চায় হিমাংশু।
“তাই।” ঠোঁটটা দাঁতে কামড়ে ধরেছে যূথিকা।
“স্পষ্ট করে বল যা বলতে চাও, হেঁয়ালি করো না। আমার ঘুম পাচ্ছে।” হিমাংশু এই প্রথম বিরক্ত হল।
“বলবই ত।” যূথিকা স্বামীর চাদর ছেড়ে দিল, অপ্রকৃতিস্থ দৃষ্টিতে তাকাল ঘরে এদিক-ওদিক। তারপর হঠাৎ, যে-কপাট এতকাল খোলাই থাকত রাত্রে, সেইপাশে কপাটটা পরদা সরিয়ে বন্ধ করে দিল। এক মুহূর্ত থামল। কি ভাবল সে, কে জানে। দু-পা এগিয়ে সুইচটা অফ করে দিল। মুহূর্তে সারা ঘর অন্ধকারে ভরে গেল। খালি একপাশের এক খোলা জানালা দিয়ে বাইরের একটু আলোর আভাস জেগে থাকল।
‘বাতি নেবালে কেন?” অন্ধকারেই বিছানার পাশে এগিয়ে গিয়ে বসলে হিমাংশু।
“অন্ধকারই ভালো। আলোয় তোমার মুখের দিকে তাকালে কথা বলতেও আমার ঘেন্না হয়।”
হিমাংশু কতদূর বিস্মিত হয়েছে অন্ধকারে ঠাওর করা যায় না।
“রাত দুপুরে কি পাগলামি শুরু করলে, যূথি? কি যা তা বলছ?”
“পাগলামি নয়, যা বলছি তা তোমায় শুনতেই হবে। আমি আর পারছি না—আমার সহ্যশক্তি আর নেই—নেই।” যুথিকা সত্যিই বুঝি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে, “তোমরা দুজনে—মেয়ে আর বাপে মিলে আমায় শেষ করে ফেলছ। কি চাও তুমি, আমি চলে যাই, আমি মরে যাই?”
“এ কি বলছ!”
“ঠিক কথাই বলছি। তুমি কি বল ত, মানুষ না পশু? পুতুল না তোমার মেয়ে?”
অন্ধকারেও হিমাংশু একবার চমকে উঠে স্ত্রীকে দেখবার চেষ্টা করল।
“রাত দুপুরে তুমি এই কথা বলতে এসেছ?”
“হ্যাঁ-হ্যাঁ। রাত দুপুরে তুমি যেমন লুকিয়ে পনেরো বছরের মেয়ের ঘুমন্ত চেহারা দেখতে যাও।”
“যুথি”–হিমাংশু কি যেন বলতে চায়। কিন্তু তার গলায় স্বর চাপা দিয়ে যুথিকার তীক্ষ্ণ, অসম্ভব তিক্ত, একরাশ অভিযোগ স্রোতের মতন বেরিয়ে আসে।
“তুমি বাপ হতে পার, কিন্তু সে মেয়ে; তার রূপ আছে, বয়স আছে, তার কী নেই, কী হয়নি। জান না তুমি? তবু, এই মেয়ে নিয়ে তোমার বেহায়াপনা রোজ রোজ আমি দেখে যাচ্ছি। বাইরের লোক এসেও আজ দেখে গেল। ছি, ছি ছি। কোন্ আকেলে তুমি ওর বুকে মুখ গুঁজে থাক, কোমর জড়িয়ে ধর।” যুথিকার হাঁফ ধরে যায়। বু অনেককষ্টে দম নিয়ে আবার সে বলে, “এতদিন বুঝিনি, আজ বুঝাতে পেরেছি, মেয়েকে ফ্রক পরাবার বায়না তোমার কেন।”
“চুপ কর, চুপ কর, যুথি!” অন্ধকারেই হিমাংশু দাঁড়িয়ে উঠেছে। কাপছে তার গা, গলা।।
“করব বইকি, চুপ ত করবই, চিরকালের মনই। এত পাপ তোমার মনে বু আমি থাকব ভেবেছ! আমি”—
যুথিকা আর পারে না, কান্নায় তার গলা একেবারেই বুজে এসেছে। অনেকটা ফেঁপানো আবেগের অদ্ভুত একটা ছমছমে শব্দ উঠিয়ে, আশ্চর্য করুণভাবে ডুকরে উঠে অন্ধকারেই ও চলে যায়। একটা শব্দ শুধু ওঠে। পাশের কপাট খুলে আবার বন্ধ হাওয়ার শব্দ। সেই শব্দটা যেন হিমাংশুর বুকের হৃৎপিণ্ডে এসে আঘাত করে।
