শরীরটা বেশ অবশ হয়ে আসছে। একটা ঘোরের মতো। কিন্তু সেই পরশু দুপুরের কথা মনে পড়লেই সব আলস্য কেটে গিয়ে এক হাহাকারের যন্ত্রণা। চাবুকে ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে। গ্লাসটা টেনে নেয় কনাদ। স্বপ্নের মতো আচ্ছন্নে ভেসে আসছে রম মুহূর্তটা।
শাড়ির প্যাকেট হাতে গলির মুখ থেকে দেখেই কনা বুঝল এ বাড়িতে আছে। দরজা ভেজ্ঞ থেকে বন্ধ। কনাদ আজ পর্যন্ত আগাম না জানিয়ে বাড়ি ফেরেনি। এই সময়ে এষা স্নিগ্ধর ক্যারিয়ারের ব্যাপারে মানুষ তৈরির বিভিন্ন পীঠস্থানে যায়। যদিও কনাদের কাছে ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি থাকে, তু একলা চাবি খুলে ঢুকলে ফ্ল্যাটটা বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগে। সেইজন্য কনাদ ব্যাপারটা এড়িয়ে থাকে।
না, আজ এষাকে সারপ্রাইজ দিতে হবে। হয়তো ভাতঘুম দিচ্ছে। পেছনের গলি দিয়ে গিয়ে শাড়িটা জানালা গলিয়ে ফেলে দিতে হবে। আজকাল স্নিগ্ধ বড় হয়ে। যাবার জন্য এষাকে ঠিকমতো কাছে পাওয়া যায় না। আজ মিন্ধর ক্লাস পরীক্ষা আছে। ও এখন স্কুলে। অনেকদিন পর সেই বিয়ের প্রথম দিকের দিনগুলোর মতো কনাদ এষাকে নিয়ে হারিয়ে যাবে। যেমন বিয়ের পর পরই মাঝে মাঝে ছুটি নিয়ে দুপুরবেলা অফিস থেকে চলে এসে দু-জনে হারিয়ে যেত।
পেছনের গলিতে ঢুকতেই পচা সড়ির গন্ধ নাকে। রুমালে মুখ ঢেকে এগোতেই ডান পা-টা নর্দমা থেকে ওঠানো আপাত শক্তপাঁকে। ব্যাজার মুখে ভাল করে ঘাসে পা মুছে কনাদ এগিয়ে যায়। জানালা আর পর্দার ফাঁক দিয়ে ঘরের মধ্যে চোখ যায়। কণিষ্কের খালি বুকে আঁকিবুকি কাটছে এষা। জড়ানো স্বরে বলছে,
—ঐ লাল কালো স্ট্রাইপ জামার কাপড়টা তোমার। ঐ রং আধবুড়োটাকে মানায় নাকি?
কনাদ আর দেখতে পারে না, পা দুটোয় কেউ যেন সিসের বস্তা বেঁধে দিয়েছে। চলার শক্তি নেই। বিধ্বস্ত কনাদ আস্তে আস্তে গলির বাইরে বেরিয়ে আসে। চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করে,
আমি মদ খেয়ে চুর হয়ে যাব। আমার টাকা আছে। আমি মেয়েছেলে পুষব। আমি, আমি মরে যাব।
হা কনাদ মরেই যাবে। তবে নিজে মরে ওদের বাঁচিয়ে দিয়ে যাবে না। চরম শাস্তি দেবে। যাতে ওরা মাথা তুলে বাঁচতে না পরে। ও পালিয়ে যাবে। যেখানে ওর লাস কেউ খুঁজে পাবে না। ওর ডেডবডিই যদি না পায়, তাহলে ডেথ সার্টিফিকেটও পাবে না। পি.এফ.গ্র্যাচুইটি, জমানো টাকা, চাকরিকাউকে ও ভোগ করতে দেবে না।
হিমালয়ের কোলে গঙ্গা অলকানন্দার সঙ্গমে ওর পরিচয় কেউ জানে না। কিছুক্ষণ পরে ও শুধুই একটা আনক্লেমড্ লাশ হয়ে যাবে। ঠাণ্ডা ঘরে কটাছেঁড়ার পর কিছুদিন বাদে গাদার মড়া হয়ে জ্বলে যাবে। অবশ হাতটা বাড়িয়ে অনেক কষ্টে জোগাড় করা তিপ্পান্নটি স্লিপিং পিলের শিশি থেকে আরও দুটো মুখে দেয় কনাদ।
আবছা ভাসছে ছোট্ট স্নিগ্ধর হাঁটি হাঁটি পা মুখটা। অপেক্ষার স্নিগ্ধর উপনয়নের উৎসবের স্বপ্ন এষার গ্রিল ধরা উদগ্রীব মুখ। কণিষ্কর লোলামশ বুকে এষার ফর্সা হাত।
—এষা, কেন তুমি…
হাতটা জলের গ্লাসের কাছে পৌঁছায় না। আস্তে আস্তে চোখ দুটো বুজে আসে কনাদের।
শুধু সমুদ্রের চিত্রনাট্য – অরূপরতন ঘোষ
মূল শহরটা যেন এতক্ষণ দম বন্ধ করেছিল, এইমাত্র হাঁপ ছাড়ল। তাই হঠাৎ দেখা গেল বেশ কিছুটা সবুজ মাঠ। খোলা হাওয়া। যদিও তার চারপাশ ঘিরেই হুমকি দিচ্ছে। একটু ফাঁকা ফাঁকা হয়ে আসা কংক্রিটের অরণ্য বা সারি সারি মানুষ বাস করার মেশিন। কিন্তু এই সবুজ মাঠটায় মাঝেমাঝেই টের পাওয়া যাচ্ছে কিছুটা বাতাসের
স্পর্শ আর সঙ্গে সঙ্গে নম্রতার শাড়ির আঁচলের কিছু ব্যর্থ ওড়াউড়ি। ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা কেউ কেউ দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। কেউ কেউ বাড়ি যাচ্ছে বা অন্য কোথাও এদিক ওদিক চলাফেরা করছে। আর কেউ লক্ষ না করলেও অনেক ওপরে আকাশে কয়েকটি মেঘের টুকরো কোথায় যেন ছুটে যাচ্ছিল সেই সময়।
—বল কি শুনবি বল?’ নম্রতা বলল।
—তুই যা বলবি। এম. এ ইংরেজির ছাত্র তরুণ যেন শিশুর মত বলে উঠল।
—”কিছু শুনেছিস আমার সম্পর্কে?
—হ্যাঁ, তোকে তোর হাজব্যান্ড মারত।
–হুঁ ঠিকই শুনেছিস।
-কিন্তু কেন?
–এমনি।
-হ্যাঁ, রে। সব সময় যে মারত তা নয়। মাঝেমাঝে বেড়াতে নিয়ে যেত। সন্ধ্যেবেলা আমরা সি-বিচে যেতাম। কিন্তু মাঝেমাঝেই বাড়িতে ফিরে এসে, শোবার সময় ড্রিংক করত, তারপর মারত।
একুশ বছরের তরুণ কিছু বুঝতে পারে না। এত সুন্দর ফুলের মতো মেয়েটাকে মারতে কেন একটা লোক? আসলে বিয়ে, বিয়ে ব্যাপারটা সম্পর্কেই বিশেষ ধারণা নেই ওর। এত অল্প বয়েস, পড়াশুনো নিয়ে থাকে—এ সব কিছু বোঝে না। বাড়িতে কোনও বোনও নেই যে তাকে কেন্দ্র করে কোনও বিয়ের পরিস্থিতি বা আবহাওয়া তৈরি হবে। একটু আধটু ব্যাপারটা বুঝতে পারবে তরুণ।
—আবার কি জানিস তো, কখনও কখনও মারার পর পায়ে ধরে ক্ষমা চাইত।
তরুণ তার চারপাশের একটু দেখা জীবন, ইংলিশ অনার্সের নাটক, উপন্যাস—এ সবের ভেতরের কাহিনীর সঙ্গে মনে মনে মেলানোর চেষ্টা করে নম্রতার এই ব্যাপারটাকে। কিন্তু কোথাও কোনও মিল নেই। না সেক্সপিয়রে, না ডিকেন্সে, না শেরিডনে। ইবসেনের সঙ্গে বোধহয় একটু মিল আছে। দি ডলস হাউস নাটকের নোরার সঙ্গে। সেই যে নোরা বেরিয়ে এল স্বামীকে ছেড়ে। বলল, কারুর স্ত্রী, কারুর মেয়ে, কারুর মা—এসবের চেয়েও আমার প্রথম এবং আসল পরিচয় আমি নারী। আমি বাবার ঘরেও একটা পুতুল ছিলাম আর তোমার কাছেও একটা পুতুল হয়েই আছি, তাই এই পুতুল-ঘর ভেঙে দিয়ে আমি চললাম। না, নম্রতা ঠিক নোরার মতো অতটা র্যাডিকাল নয়। ও বিয়ে করে সংসার করতেই চেয়েছিল। কিন্তু স্বামীর অত্যাচারে ওকে চলে আসতে হল। না ওর বিয়েটা আবার কাকিমা, পাড়ার মিনু বৌদি কারুর সঙ্গেই মিলছে না।
