–যাও না, তুমি এ্যাকাডেমিতে বন্ধুদের সাথে নাটক দেখে এস।
–না, না, সে কি হয় নাকি? তুমি স্নিগ্ধকে নিয়ে একা থাকবে। তাছাড়া তোমার তো কোথাও যাওয়াও হয় না।
—পাগল? এইটুকু ছেলেকে নিয়ে আমি নাটক দেখতে যাব? তাছাড়া ঐসব আঁতলামি নাটক আমার ভালও লাগে না। তুমি যাও আমি কিছু মনে করব না।
কনাদ পূর্ণ দৃষ্টিতে বউয়ের দিকে তাকায়। এই তো জীবনসঙ্গী। কনাদের কবিতা লেখা, গান শোনা, গ্রুপ থিয়েটার দেখা কোন কিছুতেই এষা বাধা দেয় না, উৎসাহই দেয়।
কনাদ আবার গ্লাসটা টেনে নেয়। আসলে কিছুদিন পর থেকেই কনাদের সঙ্গে এষার কোনরকম সংঘাত না থাকলেও কোথায় যেন একটা বিরাট ফাঁক সৃষ্টি হয়েছে। এষার ধরণটাই অন্য রকমের। কনাদের মতো অন্তমুখী নয়। পাড়ার প্রত্যেকের সঙ্গে ভীষণ মেলামেশা। আশপাশের প্রতিবেশী, ক্লাবের চ্যাংড়া ছেলে, মুদি, ফেরিওয়ালা সবাইয়ের ও বৌদি। আর ছোটদের কাকিমা। কনাদও এষার হাতে সংসারের দায়ভার ছেড়ে নিশ্চিন্ত। গ্রুপ থিয়েটারে অভিনয়, পড়াশোনা, কবি সাহিত্যিক মহলে আচ্ছা, এল. টি.সি. নিয়ে যেখানে লোকে যায়না সেখানে বৌবাচ্ছা নিয়ে বেড়াতে যাওয়া দিব্যি চলছিল।
কনাদের চোখটা যেন কী রকম বুজে আসছে। গাড়োয়ালে দেবপ্রয়াগে এই হোটেলে আসতেই তো ধকল কম যায় নি। এক সেই পরশু হাওড়া থেকে ট্রেনে ওঠা। সকালে ঋষিকেশে নেমে আজকেই চলে আসা। বেড়ানোর আনন্দে আগেও এখানে এসেছে। তখন হিমালয়ের চপল গাম্ভীর্যে ঢুকে মন কখনও দাপাদাপি করতো, কখনও বা শান্ত তাপসের মতো সৌন্দর্যে অবগাহন করতো। কিন্তু এবারে? নিজের কাছে ভীষণ ভাবে হেরে গিয়ে পালিয়ে এসেছে ও। ওরা এখন কী করছে কে জানে। হয়তো এষার বাপের বাড়ির লোকেরা, হয়তো কণিষ্ক নামের ছেলেটা—আর ভাবতে পারে না কনাদ। শরীরটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করছে।
ঠক্ ঠক্ ঠক্। দরজায় আওয়াজ হয়।
–সাব, রাতকো কেসা খানা? বেয়ারার গলা।
—মেরা তবিয়ত ঠিক নেহি। রাতকো খানা মৎ দেনা। কাদের জড়ানো স্বর। পাহাড় কোলের ছোট হোটেলটা খারাপ নয়। আসলে ধর্মশালার বেটার সংস্করণ। কনা নিজের পরিচয় লিখিয়েছে, মাণিক সামন্ত। ১০, স্টেশন রোড, রামগড় ক্যান্টনমেন্ট। জেলা হাজারিবাগ, ঝাড়খণ্ড।
খুঁজুক না। যত খুশি খুঁজুক। হাওড়ার কাসুন্দিয়ার বাড়িতে বসে এষা, সম্বন্ধী ঋতুদা, শ্বশুরমশাই কিংবা কণিষ্ক-ও, কেউ খুঁজে পাবে না।
আচ্ছা, এষা কেন অন করতে গেল? এষা যেমন কনাদের ব্যাপারে মাথা ঘামাত না, কাদও এষার স্বাধীনতায় হাত দিত না। তবে, দুজনের একটা অলিখিত চুক্তি ছিল। ওরা কেউই বিশ্বাস ভাঙবে না। স্বামী-স্ত্রী দুজনের শাশ্বত যে সম্পর্ক—সেটা অটুট রাখবে। কনাদ ব্যাপারটা ভীষণভাবে মেনে চলত। এষা সেটা পরীক্ষা করে দেখেছে স্বীকারও করতো।
ছেলের সুইমিং ক্লাব, আঁকা শেখা, ক্রিকেটার তৈরির কারখানা, ছেলের বন্ধুর মা বাবার সঙ্গে পড়াশোনার বিষয়ে লেনদেন, চুল কাটাতে নিয়ে যাওয়া স্ব দায়িত্ব এষার। এষা এ কাজ ভালও বাসতো। সময়ে সময়ে আত্মপ্রসাদ লুকিয়ে দুষ্টু চোখে। বলতে ছাড়তে না।
—ছেলেটা তো আমার। ব দায়িত্বও আমারই।
ছেলেও মার অন্ধ ভক্ত। বাবার সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা ভালবাসা, অনেকটা সম্রম, বেশিটা লজ্জা। শখ আবদার ব মায়ের কাছেই।
স্নিগ্ধ এখন এইটে পড়ে। লম্বা, সুন্দর, একমাথা চুল। পড়াশোনায় যথেষ্ট ভাল। আসলে ভাল হবে নাই বা কেন? কণিষ্ক ওকে ভীষণ ভাবে কেয়ার নেয়। কণিষ্ক—এবারে একসঙ্গে তিন–চারখানা।
বেশ চলছিল। সেদিন কেন মরতে অফিসে মিত্তিরদের বেকার শালাকে দয়া করে পিওরসিল্ক শাড়িটা কিনতে গেল। মিত্তিরদাই বললেন,
—চ্যাটার্জী, বউ-এর জন্য তো এবছর কিছুই হাতে করে নিয়ে গেলে না। বউ ভালবাসবে কি করে? শাড়িটা গিয়ে নিয়ে বউ এর একটু মন ভোলাও। টাকা না হয় তুমি যখন ইচ্ছে দিও।
সত্যিই তাই। সত্যি বলতে কি কনাদ নিজের, আর কখনও সখনও ছেলের পোষাক আষাক ছাড়া কিছুই কোনদিন কেনেনি। মহিলাদের জিনিস পছন্দের ব্যাপারে ও ভীষণ অজ্ঞ। বিয়ের পর প্রথম দিকে দোকানে গিয়ে ও যে শাড়িটা পছন্দ করতে এষা মিষ্টি হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলতো,
দূর, ঐ শাড়ি এখন আর চলে না। ব্যক ডেটেড্।
শরীরের চড়াই উত্রাই ফুটিয়ে তোলা শাড়ি পছন্দ করে এষা ডগমগ হয়ে ফিরতো। কনাদ মনে মনে আহত হলেও নিজেদের প্রাচীন পন্থী, রক্ষণশীল ভেবে ব্যাপারটা মেনে নিত।
মেনে না নিলেই কি চলে নাকি? এষার উৎসাহেই স্নিগ্ধ সাঁতারে ডিস্ট্রিক্ট রানার্স, নেতাজি ইন্ডোরে ছবি আঁকতে যায়, বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউশানের মতো স্কুলে স্ট্যান্ড করে, ক্রিকেটটাও মোটামুটি খেলছে। পাশের বাড়ির আকিঞ্চন বাবুদের বাড়িতেই স্নিগ্ধ ছোট থেকে মানুষ। আকিঞ্চন বাবুর ছোট ছেলে কণিষ্ক ইংরেজিতে ফার্স্ট ক্লাস এম.এ.। বক্স ছাব্বিশেক বয়স। রুজিরোজগারের চেষ্টায় আছে। ঝকঝকে স্মার্ট চ্যাটার্জীদা আর বৌদির বাড়িতে অবাধ গতি, যখন তখন চায়ের আবদার। স্নিগ্ধর পড়াশোনার সব দায়িত্ব ওর। যেহেতু, স্নিগ্ধর ও কোকো কাকু তাই মাইনে কড়ির ব্যাপারই নেই। অবশ্য এষাও আকিঞ্চনবাবুদের সঙ্গে আত্মীয়ের মতো মেশা, খাবার দাবার, পুজোয় জামাকাপড়-যতটা পারে করে।
