কিন্তু নম্রতার এই ঘটনাটা লিখব কি করে রে বাবা! গল্প হতে চাইছে নম্রতা। নিদারুণ ঝড়ে বিপর্যস্ত ওর বাইশ বছরের জীবনটাকে নিয়ে ও কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। হাওয়ায় আঁচল উড়ে যাচ্ছে ওর। নম্রতা বলতে লাগল—
কোথা থেকে যেন বিটোফেনের সেভেনথ সিম্ফনির সুর শোনা যেতে লাগল। নম্রতার কথার সঙ্গে সঙ্গে অর্কেস্ট্রার সুর কখনও উঁচুতে উঠছে কখনও নামছে। তরুণের বা আমার কানে ভেসে আসে এই সুন্দর সুর। অন্ধ সঙ্গীতকারের এই সুরবদ্ধ সিম্ফনিতে মনে হয় কখনও যেন পাপীরা সমুদ্রে স্নান করছে। আমিই তরুণ নাম দিয়ে শুরু করেছিলাম এই গল্প বা চিত্রনাট্যটা। নম্রতার সঙ্গে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের লনে সেই যে বসেছিলাম তা প্রায় কুড়ি বছর আগের কোনও একদিন। যেন চোখের সামন ভাসছে সেদিনটা। যেন থমকে আছে সেদিনের বাতাস, সবুজ মাঠ আর তার প্রান্ত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়ি ও অন্যান্য নগর-দৃশ্য। সেই আশির দশকে দৃশ্য-দূষণের সচেতনার যুগ তখনও আসেনি।
সিম্ফনিটা বাজছে—পাপীদের জলস্নাত হয়ে পবিত্র হওয়া। নাবিক ও সমুদ্র রঙ্গের মাখামাখি।
শুধু সমুদ্রের চিত্রনাট্যে অবধারিত ভাবেই এরকম ভাবে বিটোফেনের আসার কথা ছিল।
নম্রতা আবারও বলল, এমনি মাঝে মাঝে বেশ ভালো ব্যবহার করত। সন্ধ্যেবেলা সি বিচে বেড়াতে নিয়ে যেত।
সমুদ্র উত্তাল হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে ইন্ডিয়া গেট সংলগ্ন বাঁধান এলাকায়।
আমি মনের চোখে সি বিচ কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। আরব সাগরের বিস্তৃত জলরাশি আর বষের তীরভূমির মেলামেশা। সেই কুড়ি বছর বয়েসে আমি তখনও বম্বে দেখিনি। আরব সাগরও না। কোনও সমুদ্রই তখনও আমার দেখা হয়নি। এখন বম্বের সমুদ্র আমার দেখা। কুড়ি বছর আগের নম্রতার কথাগুলো যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। মুম্বাইয়ের সমুদ্র। ইন্ডিয়া গেটসংলগ্ন বাঁধান তটে তার দুরন্ত উচ্ছ্বাসে আছড়ে পড়া কিংবা জুহু বিচের বালির বিস্তৃত বিছানায় নির্দ্বিধায় সমুদ্রের কিছুটা এগিয়ে এসে আবার ফিরে যাওয়া। অন্যদিকে পর্যটকদের নিয়ে উত্তাল সমুদ্রের মধ্যে ঢুকে যাওয়া লঞ্চ। মুম্বাইয়ের সমুদ্র বলতে এসবই এখন একসঙ্গে মনে পড়ে।
বহু দিন থেকেই চলচ্চিত্র পরিচালক বা ফিল্মমেকার হওয়ার ইচ্ছে ছিল। তাই চোখের সামনে স্ব কিছু সিনেমার মতো করে দেখার অভ্যাস হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লন-এ বসে নম্রতার সঙ্গে কথা বলছিলাম। তারপর কত সময় পার হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ পরিবর্তিত। নম্রতা যখনই সি বিচে বেড়ানোর কথা বলে, তখনই যেন একটা আছড়ে পড়া সমুদ্রের দৃশ্য বসে গেল মনের মধ্যে। চিত্রনাট্য লিখলে বা চলচ্চিত্র পরিচালনা করলে এ রকমই একটা দৃশ্য বা সিকোয়েন্স আমি রাখতাম।
সমুদ্রের নিটোল জীবন্ত ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে ইন্ডিয়া গেটের বাঁধান ঘাটে। প্রতিহত হয়ে ফিরে যেতে গিয়ে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ছে পরবর্তী ঢেউ। ভিজে যাচ্ছে কংক্রিট। মানুষের বাঁধ দেওয়ায় বিরক্ত সমুদ্র।খুশি মানুষ। ঘাটের একটু নিচে নামলে সমুদ্রের জল ছিটকে আসছে। ভয়ঙ্কর আকর্ষণ সমুদ্রের। নিরলস প্রকৃতির নিয়মে মাঝ সমুদ্র থেকে কিছুটা কালো ও ঘোলা জলের ঢেউয়ের প্রবাহ প্রবল শক্তিতে ছুটে আসছে তীরের দিকে। সমুদ্রের মতোই মানুষের মনও বিক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মাঝে মাঝে। বিক্ষুব্ধ মানুষকে দেখার জন্য অনেক সময় বেশি কেউ থাকে না ধারে কাছে। কিন্তু নম্রতাকে দেখতে হতো তার মারমুখী স্বামীকে।
কিন্তু তোকে ও মারতো কেন?
এমনিই হঠাৎ করে।
এমনিই!
হ্যাঁ। আবার কখনও পায়ে ধরে ক্ষমাও চাইতো। কাঁদতো। আমি আমার বউদিকে জানিয়েছিলাম ব্যাপারটা। বৌদি আমাকে কিছু ট্যাবলেট পাঠিয়েছিলেন। রোজ একটা করে খেতাম। ও এসব জানতো না। ওর ধারণা ছিল আমি ওর বাচ্চা ক্যারি করছি।
আজ বুঝতে পারি নম্রতা সেদিন আমাকে অনেক কিছু বলেনি। আমিও জিগেস করিনি। আমার তখন একুশ বছর বয়স। নম্রতারও এই রকম। তার ওপর ওই রকম হেনস্থার পর নতুন জীবন শুরু করেছে ও। তাই তখন আর বিবাহিত জীবনের গোপন কথা জিগেস করার কথা মনে হয়নি। একটা নিষ্পাপ সুন্দরী শিক্ষিতা মেয়ে স্বামীর হাতে প্রায় প্রতিদিন মার খাচ্ছে এটা ভাবতেই আমার রক্ত জল হয়ে যাচ্ছিল তখন।
আজ চিত্রনাট্য লিখতে বসে মুম্বাইয়ের সমুদ্র যেন ঢুকে পড়ছে নম্রতাদের ঘরে। বিছানার ওপর আছড়ে পড়ছে। উথাল-পাথাল ঢেউ উঠছে ঘরের হাল্কা অন্ধকারে।
পালিয়ে এলি কি করে?
এ ব্যাপারে আমাকে শাশুড়ি কিছুটা সাহায্য করেছিলেন। একদিন আমার দাদা এল কলকাতা থেকে। ও তো দাদার সামনেই চুলের মুঠি ধরে মারতে লাগল। দেখে তো দাদা রেগে আগুন। যাই হোক ও দোকানে বেরিয়ে গেল। দাদা সেই সময় আমায় নিয়ে চলে এল কলকাতায়। শাশুড়িও তাই চেয়েছিলেন। শাশুড়ি মানুষটা বেশ ভালো ছিলেন।
দোকানে মানে—ও কি করত?
ওর তো কাপড়ের দোকান ছিল। শোনা যায় ফিল্মস্টার অরুণা ইরানির সঙ্গে ওর একটু সম্পর্কও ছিল।
কাপড়ের দোকানদার। কাপড়ের দোকানদারকে তুই বিয়ে করলি! নিজে ফিলসফিতে অনার্স পড়ছিস। তুই কি রে? ওর পড়াশোনা কতদূর ছিল?
ক্লাস ফাইভ।
ওঃ–ক্ষোভ, অবাক হওয়া আর অসহায় ভাবটা জমাট বেঁধে বেরিয়ে এল আমার মুখ থেকে।
অনুরোধে মানুষ টেকি গেলে শুনেছিস? আমি অনুরোধে পেঁকি গিলেছিলাম? তবে আমার মনে হয়েছিল পড়াশোনা কম হলেই একজন মানুষ খারাপ হবে তার কোনও মানে নেই।
