কেন, কি হয়েছে? খুব অসহায় ভাবে জিজ্ঞেস করলো লোকটি।
ঘরে গেলে বুঝতে পারবে। মালিক সব কটা সেলাই করা ব্লাউস ফেরত দিয়ে গেছে। আর বলে গেছে, ও কটা ঠিক করে দিয়ে আসতে। দোকানে আর যেতে হবে না।
আমার ভুল হয়েছে? অসম্ভব।
হঠাৎ লোকটার মুখে এমন পুরুষোচিত কথা শুনে সবাই হকচকিয়ে গেলো। গিন্নি কিন্তু সুর আরো চড়িয়ে বললো
তাহলে কি মালিক অমনি অমনি ফেরত দিয়ে গেছে?
ভুল যদি হয়ে থাকে, তবে ওরই হয়েছে। আমার হয়নি। আজ কুড়ি বছর হলো একাজ করছি, আমি জানিনা কোনটা কি?
উগ্রমূর্তি ধারণ করলো লোকটা। বউয়ের গলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গলা চড়াতে লাগলো সে। প্রায় হাতাহাতি ব্যাপার। গিন্নি চিৎকারে না পেরে ঘরে গিয়ে নোকটার ছাড়া জামার পকেট থেকে একটা খাতা বের করে নিয়ে এলো। তারপর বেশ বিকৃত সুরে সকলকে শুনিয়ে খাতায় লেখা কবিতার কয়েকটা পংক্তি পড়তে লাগলো। মুহূর্তে কেমন যেন মিইয়ে গেলোলোকটা। তার সেই উগ্র চেহারা আর থাকলো না। একটা করুণ অসহায় রূপ ফুটে উঠলো সর্বাঙ্গে। গিন্নি বিকৃত সুর করে করে পড়ছে, আর লোকটার মুখ চোখ ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে উঠছে। কয়েকটা লাইন এরকম বিকৃত করে পড়ে গিন্নি বলে উঠলো—
তাও যদি বের হতো পত্রিকায়। বস্তা বস্তা লিখে কি চিতার আগুনে দেবে?
লোকটার চোখ দুটি ছলছল করে উঠলো। ঠিক সেই সময় মালিক এসে দাঁড়ালো সেখানে। গিন্নির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বললো।
এই সব ছাই ভস্ম লিখে কি পেট ভরবে? আর তার জন্য শনি রবি দুদিন কাজ কামাই করে যেতে হবে ক্যানিং? যতসব বাজে কাজে সময় নষ্ট করা।
অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলোলোকটা। কোনও কথার উত্তর দিতে পারলো সে। কেবল চোখ দুটি ছলছল করছিলো। মালিক চুপচাপ তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রেশ রাগত ভাবেই বললো–
হয়েছে ওই ব্লাউসগুলোর রিপেয়ারের কাজ? সব কটা ভুল হয়েছে। যাবার জন্য আর কাজে মন ছিলো না।
অসম্ভব। ভুল আমার হয়নি। হতে পারে না। চিৎকার করে বলে উঠলো লোকটা। মালিক প্রত্যুত্তরে বললো–
তবে কি ভুল হয়েছে আমার?
হ্যাঁ আপনার। চলুন মিলিয়ে দিই।
তখনকার মতো শান্ত হয়ে গেলো সব। আমার খুব অদ্ভুত লাগলো, লোকটার আচরণ দেখে। যখনই কবিতার কথা উঠছে, তখন মিইয়ে যাচ্ছে লোকটা। অসহায় ভাবে তাকিয়ে থাকছে। কিন্তু কাজের ভুলত্রুটির কথা উঠলেই ফোঁস করে উঠছে সে।
দুদিন পরে দুপুরবেলায় দোকানটার সামনে দিয়ে যাচ্ছি, দেখি লোকটা একটা খাতা বের করে কি সব লিখছে। আমি যেতেই লুকিয়ে ফেললো খাতাটা। আমি
সেদিনের প্রসঙ্গ তুলে জিজ্ঞেস করলুম।
আচ্ছা, আপনার কবিতা নিয়ে যখন ওরা বিদ্রূপ করে, তখন উত্তর দেন না আপনি। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন। কিন্তু কাজের ত্রুটির কথা উঠলেই কেন গর্জে ওঠেন। ওদের এরকম বিদ্রূপ সহ্য করেন কেন আপনি?
প্রশ্নটা শুনে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করলো লোকটা। এমন প্রশ্ন কেউ তাকে কোনদিন করবে ভাবতে পারেনি। একটু ভেবে নিয়ে তারপর আস্তে আস্তে বললো–
কাজ হলো এক ধরনের দক্ষতা। আজ কুড়ি বছর ধরে রাউস তৈরি করছি। সুজ্জং মোটামুটি একটা দক্ষতা আমার এসে গেছে। আমি জানি, কতটুকু করতে পারি আমি। কিন্তু সৃষ্টি সম্বন্ধে কি কখনও নিশ্চিত হওয়া যায়? কেউ কি বলতে পারে, তার লেখা কবিতা বা গল্প কেমন হয়েছে। আসলে জানেন, সৃষ্টির কাছে প্রত্যেক স্রষ্টাই অসহায়।
আমি কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে। মনে মনে ভাবলাম, প্রত্যেক শিল্পীর মনেই ওই লোকটার মতো একটা অসহায় ব্যক্তিত্ব লুকিয়ে থাকে।
শিউলি বনে গন্ধরাজ – গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়
অনেক ঘুরে, অ-নেক পরিশ্রমে যোগাড় করার ঝক্কি পোয়াতে হয়েছে। আর এখন? হাতের নাগালে, বলতে গেলে মুঠোর মধ্যে। কনাদ উপুড় হয়ে শুয়ে, বুকে বালিশ দিয়ে, অভ্যাস মতো বই খুলে পড়তে যায়। নীরদ সি. চৌধুরীর লেখা। মন বসাতে পারে না। এষার মুখটা মনে পড়ে। হাতটা সামনে রাখা গ্লাসটার দিকে এগিয়ে যায়। একসাথে কয়েকটা চুমুক।
সামনের চুলটা সেদিন বিশ্রি ভাবে কেটে এল এষা, অফিসের ক্যাশিয়ার বাবু প্রশান্তদার কাছে আসা সস্তা মেয়েটার মুখ আর এষার মুখের মধ্যে কোন তফাত খুঁজে পায়নি কনা। প্রতিবাদ করতেই এষা বলেছিল, কনাদের মতো বুড়োটে লোকের নাকি হাল ফ্যাশন সম্বন্ধে কোন আইডিয়াই নেই।
রগটা কি রকম দপদপ উঠল কনাদের। আরও দু ঢোঁক।
মধ্য চল্লিশ কনাদের সঙ্গে মধ্য ত্রিশ এষার বয়সের ব্যবধান সংখ্যার হিসাবে একযুগের কম হলেও দু-জনের চিন্তাভাবনা, মানসিক ব্যবধান দু যুগের।
অথচ প্রেমের প্রথম পর্বে-যদিও সে প্রেম ছমাসের বেশি স্থায়ী হয়নি—এষার মুগ্ধ হয়েনাদের কবিতা শোনা, বিস্ময়ে কনাদের মুখের দিকে চেয়ে থাকা, কনাদকে এক অদ্ভুত ভালোলাগায় আচ্ছন্ন করতো। সরকারি চাকরি করা কনাদ তাই আর দেরি করেনি। ধুমধাম করেই বিয়ে করেছিল।
গ্লাসটা টেনে নেয় কনাদ।
প্রথম প্রথম কি সুন্দর ছিল দিনগুলো। অফিস থেকে ফেরার সময় এষার গ্রিল ধরে অপেক্ষা। কনাদ যেটা খেতে ভালোবাসতো তৈরি করে রাখা। স্কুটারে চেপে ছোট্টো স্নিগ্ধকে নিয়ে তিনজনে এদিক ওদিক হারিয়ে যাওয়া। কনাদ আর স্নিগ্ধর ভাল-মন্দ, সুখ-স্বাচ্ছন্দের দিকেই এষার সর্বদা নজর। স্নিগ্ধর সমস্ত ব্যাপার এষা একলাই সামলায়।
