আর তুমি?
আমার কি হবে জানি না। সহজে সব পেয়ে কিছুই আর ভালো লাগে না আমার।
রকিকেও নয়?
সেও ফিকে হয়ে গেছে। পরকীয়া
আমি উদাস নিরিখে, কণ্ঠস্বরে দুঃখি দুঃখি সুর ফুটিয়ে বললাম, একজনের জন্য। পরম আনন্দের। অপর পক্ষের জন্য চরম যন্ত্রণার। কাল বেলার সেই সময় বোধহয়। কাটিয়ে উঠেছি। জারা—
দুকাধে ঝাঁকানি রেখে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বাকি বক্তব্য রাখলাম, দাগ দুজনেরই ছিল। ধরা যাক সুদে আসলে মিটে গেছে! সব ভুলে জীবন কি আবার বদল করা—
অসমাপ্ত কথার মধ্যে হেয়ার স্টাইল ঝাঁকিয়ে জারা প্রায় চেঁচিয়ে বললো, না না এবং না। আমরা পরস্পরের প্রতি ব্যক্তি শ্রদ্ধা হারিয়েছি। আর হয় না।
জারা চলে যাবার পর জীবন অতিষ্ঠ হবে, ভয় পেয়েছিলাম। নাহ, নতুন দেশ, পরিবেশ, কম্পিউটার কোর্সে ভর্তি হওয়া, তিন বেকার বাঙালী যুবকের দু’রুম শেয়ার করা জীবন, মোটামুটি মানানসই। দুঃখ একটাই ব্যর্থ পরিণয়। এদেশে যে বিষয়ের কোনও তোয়াক্কাই নেই। আর গ্লানি, যে জারা এতো যন্ত্রণার কারণ, তারই দান হাত পেতে নিলাম। এটা নিয়ে যুদ্ধ হয় নিজের সঙ্গে। গোপন রক্তক্ষরণ..
এর মধ্যে সমবেত ধ্বনি উঠলো। কেউ ছুটলো সমুদ্রের একেবারে কিনারে। কেউ উঠে দাঁড়ালো পাথরে। সুর্যাস্ত দেখবে। আমরাও এগুলাম। চলতে চলতে জামিল প্রশ্ন রাখলো, বলতে পারেন এ ক্ষরণ কবে শেষ হবে? জীবন আবার কবে সহজ হবে আগের মতো?
লোকটা – আশিস সান্যাল
লোকটাকে দেখলে সত্যি করুণা হয়। সব সময় কেমন যেন একটা মনমরা ভাব। কারও সঙ্গে কখনও মন খুলে কথা বলে না। কাজের ফাঁকে সময় পেলেই চুপচাপ বসে বসে কি যেন ভাবে। এ নিয়ে কম বিদ্রূপ আর গালিগালাজ সইতে হয় না।
কাজ করে লোকটা একটা দর্জির দোকানে। মেয়েদের ব্লাউস সেলাই করাই তার কাজ। কোনটা আটত্রিশ আর ছত্রিশ, এই হিসেবের মধ্যেই তার সময় বাঁধা। মাঝে মাঝে আবার আটত্রিশ সাইজের ব্লাউস ছত্রিশ আবার ছত্রিশকে আটত্রিশ করবার ঝামেলাও এসে পড়ে। দোকানের মালিক এসব কাজ তাকেই দেয় বেশি। তার কাজ নাকি সবচেয়ে ভালো। কিন্তু এসব ছত্রিশ আটত্রিশের মাঝে হাঁপিয়ে ওঠে সে। মাঝে মাঝে ভাবে, এসব মেয়েগুলো কোথা থেকে আসে? নিজের বউটা কিছুতে তেত্রিশের উপর উঠলো না।
মালিক যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ একটুও চুপ করে বসে থাকবার উপায় নেই। দুপুরে মালিক যখন খেতে যায় বাড়িতে, তখন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে সে। একটা পুরানো খাতা বের করে আনমনে কি সব পড়ে। আবার মাঝে মাঝে পেন্সিল দিয়ে লেখে কিসব হিজিবিজি। মালিক আসবার আগেই সব গুটিয়ে রেখে দেয়।
শনি আর রবিবার এলেই লোকটার মন কেমন যেন ছটফট করে ওঠে। ও দুদিন কিছুতেই তাকে আটকানো যায় না। চলে যায় ক্যানিংয়ে মাতলা নদীর পাড়ে। সেখানে কে যেন আছে তার। মাতলার মাতাল ঢেউ আর লোনা বাতাসে ওর বুকটা নাকি জুড়িয়ে যায়। যাদু আছে মাতলার ঢেউ আর বাতাসে।
দুদিন কাটিয়ে যখন বাড়ি ফিরে আসে, তখন এক হুলুস্থুল ব্যাপার। গিন্নি ঝাটা নিয়ে সাদর সম্বর্ধনা জানিয়ে খেকিয়ে ওঠে।
এলেন বাবু রাজ্যজয় করে। আসার কি দরকার ছিলো। পিরিতের লোকটার সঙ্গে থাকলেই হতো।
কোনও উত্তর দেয়না লোকটা। চুপচাপ ঘরে গিয়ে ওঠে। তারপর ভাগ্য ভালো থাকলে দু মুঠো খেয়ে চলে যায় কাজে। আর যদি ভাগ্য প্রসন্ন না হয় তো, না খেয়েই চলে যায় সেদিন। কোনও উচ্চবাচ্য করে না। কিন্তু গিন্নির গলা ফাটানো চিৎকার চলতেই থাকে।
কি পোড়াকপাল আমার! নইলে এমন লোকের হাতে পড়তে হয় আমার। সারাটা জীবন খাটতে খাটতেই গেলো। একটু সুখের মুখও দেখতে পারলাম না কোন দিন। ওই মিনসেটা যতদিন থাকবে, ততদিন সুখ নেই কপালে।
ছোট মেয়েটা ঠিক বুঝতে পারে না, মা কেন বাবাকে এত গালাগালি করছে। মাঝে মাঝে না খেয়ে গেলে সেই দুপুরে একটা বাটিতে খাবার নিয়ে যায় দোকানে বাবার জন্য। কিন্তু লোকটা নির্বিকার। এত রোদে ছোট মেয়েটা যে এতদূর কষ্ট করে এলো, তা নিয়ে ভাবনা নেই কোনও। দিব্যি খাবার খেয়ে বাটিটা দিয়ে দেয় মেয়েটার হাতে। কাছে টেনে মেয়েটাকে ও একটু আদর করবে তাও পর্যন্ত করে না।
সেবার পুজোর সময় দোকানে কাজের খুব ভিড়। মালিক বললো।
এবার কিন্তু ছুটি হবে না। বিস্তর কাজ।
কিন্তু আমাকে যে যেতেই হবে। বললো লোকটা।
যেতে হবে বললেই যেতে দেওয়া যায়? বলি দোকান লাটে উঠলে খাবে কি? বৌ আর মেয়ের মুখে কি দেবে?
সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
মানে?
মানে আমি সব কাজ সেরে যাবো। রাত জেগে করে যাবো সব কাজ।
বেশ। যে কটা কাজ দিয়েছি, শেষ করে যেতে হবে।
রাতদিন খেটে নোকটা কাজ শেষ করলো। শনিবারের ভোরের ট্রেনেই চলে গেলো ক্যানিং। দুদিন সেখানে কাটিয়ে সোমবার সকালে যখন সে বাড়ি পৌঁছলো, তখন সে এক কুরুক্ষেত্র। গিন্নির চিৎকারে পাড়া প্রতিবেশী সব সচকিত হয়ে উঠলো। প্রতিবারই এরকম শুনে তাদের অভ্যেস। কিন্তু এবারের গণ্ডগোলটা যেন একটু অন্য ধরনের। গিন্নি গলা ফাটিয়ে বলছে।
পুজোর সময় সবাই দু’চার পয়সা বেশি কামায় আর উনি হরিশ্চন্দ্রের বেটা হরিশচন্দ্র। মাগমেয়ের পরনে কাপড় না জুটুক, তাতে কি এসে যায়! পিরিতের লোক আছে তার। কবিতা লিখে পড়াতে যান পিরিতের লোককে, কিন্তু এদিকে যে সংসারে আগুন লাগতে শুরু করেছে।
