“বই-কি, তা বলে এত! এই দেখ না; হাঁটুর কাছটা ঘাগরা মতন হয়ে গেছে, আর পিঠের কাছটায় বড্ড বেশি কাপড় রেখেছে, বুকের কাছে একটা কুঁচি দিয়ে দিতে হবে নিজেকেই!” পুতুল একে একে টুকটাক খুঁত ধরিয়ে দিচ্ছে।
হিমাংশুকে উঠতে হয়। এত খুঁত যখন, তখন একবার ভালো করে দেখতে হয় অবশ্য। মেয়ের কাছটিতে এসে দাঁড়ায় ও। মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে। ফ্রকের। কাপড়ের ঝুলের অংশটা একবার উঁচু করে একটু। মেয়ে বলে, “হ্যাঁ–ওই পর্যন্ত হলে ভালো হত।” হিমাংশু মাথা নাড়ে, “ঠিক।” তারপর বুক। হিমাংশু বুকের দু পাশের কাপড় দু-হাতের আঙুলে আলতো করে ধরে কাপড়ের বিস্তৃতিটা পরখ করে, সঙ্কুচিত করে বুকের বস্ত্রাংশটা।—”কুঁচি দিয়ে নিলে কি ভালো দেখাবে রে–বরং একটু ছোট করতে দিয়ে এলে হয়।”—”না না, দরকার কি,” পুতুলের আপত্তি, “আমি হাতেই এমন সুন্দর করে একটা হনিকম্বের কাজ করে নেবে। দেখো-।” এরপর কোমর। সত্যি বেঢপ বড়ো করেছে, কাপড় রেখেছে একরাশ। হিমাংশুর দুই বিঘতের মধ্যে পুতুলের কোমরটা আঁট হয়ে থাকে। কি সরু, সুন্দর কোমর পুতুলের হিমাংশু পরখ করে, ভাবছে, “তুই এবার একটু আধটু নাচ শিখলেই ত পারিস, পুতুল—যা সরু কোমর তোর”…পুতুল আনন্দে আত্মহারা : “সত্যি নাচ শিখতে ভীষণ ইচ্ছে আমার। আমাদের ক্লাসের রেখা, ছন্দা ওরা ত শেখে, কোথায় যেন। কিন্তু আমি যেন একটু ভারী বাবা; ওরা বেশ হাল্কা।”… “ভারী?” হিমাংশু হো হো করে হেসে ওঠে, টপ করে কোমরে বিঘত জড়িয়ে শূন্যে তুলে নেয় মেয়েকে। আচমকা মাটি থেকে পা উঠে যেতেই পুতুল ভয়ে হিমাংশুকে আঁকড়ে ধরে—তার হাত হিমাংশুর মাথার চুলে ঘাড়ে-টলে পড়ে। ক্রিমসন রঙের লুজ ফ্রকের আড়ালে হিমাংশুর নাক, চোখ, মুখ সব ঢাকা পড়ে গেছে। শুধু একটা অট্টহাসির অনেকখানি শব্দ ঘরের বাতাসে।
পুতুলকে নামিয়ে দিতেই সে গা মুখ ঘুরিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে গিয়ে হঠাৎ কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে গেল। অধস্ফুট শব্দ বেরুল, “মা!”
তাকাল হিমাংশু। দরজার গোড়ায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যুথিকা আর শিপ্রা। মনে হল, ওরা অনেকক্ষণই এসে দরজার কাছে দাঁড়িয়েছে।
‘কখন এলেন আপনারা?” হিমাংশু শিপ্রার মুখে চোখ ফেলে হাসল,“আসুন–”
“এসেছি অনেকক্ষণ, মেয়ে নিয়ে যা মত্ত ছিলেন, বুঝবেন কি করে?” শিপ্রার ঠোঁটের পাশে একটু বাঁকা হাসি খেলে গেল।
আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই যুথিকা শিপ্রাকে টেনে পাশের ঘরে চলে যায়।
আগের দিন কিছু না বললেও আজ শিপ্রা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কথা তুলল, “তোর মেয়ের বয়স কত হল রে যুথি?”
“পনরো।” বিরস, গম্ভীর মুখ যুথিকার।
“দেখলে যেন আরো একটু বেশি মনে হয়। তা বড়-সড় হয়েছে; ওকে ফ্রক পরিয়ে রাখিস কেন? চোখে কটকট করে লাগে।”
“সাধ করে কি পরিয়ে রাখি?” যুথিকা অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে তিক্তস্বরে বলছে, “ওর বাবার শখ, মেয়েকে শাড়ি পরতে দেবে না।”
“বাবার শখ?” ঠোঁট উলটে শিপ্রা একটা বিশ্রী শব্দ করল, “হিমাংশুর এই শখ নিজের চোখেই দুদিন দেখলাম।” আবার একটু থামল শিপ্রা তারপর গলার স্বর নীচু করে যেন উপদেশ দিচ্ছে এমনভাবে বলল, “জিনিসটা মোটেই ভালো নয়, যুথি। এসব আসকারা তুই দিবিনে। এ এক ধরনের কমপ্লেক্স!”
যুথিকা শেষ কথাটা বুঝল না। শিদির চোখের দিকে তাকাল।
“মানে?”
“মানে–? ও, সে তুই বুঝবি না।” শিপ্রা যুথিকার অজ্ঞতাকে উপেক্ষা জানিয়ে অনুকম্পার হাসি টেনে আনল, ঠোঁটে, “আসলে যুথি…এই—এই–ধরনের রুচি কি বলব যেন একে হ্যাঁ, এই ধরনের রুচি খুব খারাপ, নোংরা।”
যুথিকা কয়েক মুহূর্ত ফ্যাকাশে, অর্থহীন চোখে তাকিয়ে থাকে শিদির মুখের দিকে। তারপর উঠে দাঁড়ায় আস্তে আস্তে। আলমারি খুলে টাকা বের করে। খান পাঁচেক দশটাকার নোট এনে শিপ্রার মুঠোর মধ্যে গুঁজে দেয়।
“এতে হবে তোমার?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ; যথেষ্ট। আমি তাহলে উঠি যুথি। বেশি রাত হলে বাড়ি খুঁজতে বিপদ। হবে। টাকাটা তোকে দিল্লী ফিরে গিয়ে পাঠাব কিন্তু।”
“সঙ্গে কাউকে নিয়ে যাও না!”
“না, না, দরকার নেই। একাই বেশ যেতে পারব। চলি, হা—।” শিপ্রা চলে যায়। নীচে নেমে বিদায় দিয়ে আসে যূথিকা।
ওপরে উঠে শাড়িটা বদলে নিয়ে কোনোরকমে বাথরুমে গিয়ে তপ্ত চোখেমুখে, হাতে-পায়ে অনেকখানি জল ঢালে, তারপর সেই সপসপে ভিজে অবস্থাতেই বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে। বাতি নিভিয়েই।
যুথিকা যে সেই শুয়ে পড়ল আর উঠল না, কথা বলল না। রাত বাড়ল। পুতুল এসে ডাকল মাকে। কেমন একটা আচ্ছন্নতার মধ্যে ভাঙা চাপা গলায় যুথিকা বলল, “তোমরা খেয়ে-দেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়। রাসমণিকে বল, সব গোছগাছ করে নীচের চাবি রেখে দিয়ে যাবে।”
রাত বেড়ে চলেছে। ঘড়িতে দশটা বেজে গেল। পুতুল এসে শুয়ে পড়ল মার পাশে। ধোয়া-মোছা সেরে রাসমণি ওপরে এসে চাবি রেখে গেল। বাইরে থেকে ভেজিয়ে দিল দরজা। হিমাংশু অনেকক্ষণ হল পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকেছে। ও-ঘর এ ঘরের মধ্যে যে দরজা তাতে কপাট থাকলেও সে কপাট বন্ধ হয় না; একটা পর্দা শুধু ঝোলে। ও-ঘরেই হিমাংশু শোয়, তার নিজস্ব কাজকর্ম করে। স্বামীর শোয়া বসার জন্য, পুতুল বড়ো হবার পর, যুথিকা নিজের হাতেই এব্যবস্থা করেছে।
হিমাংশুর ঘরে আলো জ্বলছে। নিশ্চয়ই সে ঘুমোয়নি। হয় কোনো বইয়ে, না হয় ক্রসওয়ার্ড পাজলে ডুব দিয়েছে।
