তো, তা তুমি কি করছে?
ঘরসংসার।
রেসা হেসে পরক্ষণে বল্লেন, বলবে তো মান্ধাতা আমলের একঘেয়ে কাজ। তুমি বলেছিলে ঢাকায় নিয়ে গ্রুপ থিয়েটারের সঙ্গে জোট বেঁধে দেবে। সংসার করবো। আবার প্রতিভা দিয়ে সমাজ সংস্কৃতি বোও করবো।
কিন্তু আমি না হয় কথা রাখতে পারি নি।
আর একজনের বেলাও সেটা আশা করা যায় না। তুমি তো বু শহুরে হয়েছিলে ও একেবারেই মফস্বলের মানুষ।
শুনেছিলাম ট্রাকের বড় ব্যবসায়ী।
পয়সা মেলাই আছে। কিন্তু স্ত্রীকে স্টেজে দেবার উদারতা কি থাকে সবার মধ্যে। তা সখ পুরণ না হোক। ভেবে দেখেছি এই দেশে ঘরে ঘরে শিল্পী। তাদের কেউ খুবই উন্নতি করতে যদি সুযোগ পেতো। তা পায় তো লক্ষে একজন। আমি তা আশা করে ব্যর্থ হয়ে সামলে নিয়েছি।
তাহলে তুমি সুখী মনোয়ারা।
তা বলতে পারো। মানুষটা ভালো। শাশুড়ীদের সঙ্গে থাকতে হয় না। আধপূরান একটা ফিয়াট আছে নিজস্ব। হাতখরচাও মাসে মন্দ পাই না।
মা এলেন খাবার হাতে। ফ্যাকাশে হেসে বল্লেন, তুই কি এসব শোনাতেই সাত তাড়াতাড়ি ছুটে এসেছিস?
উম চাচী। সুখটা কারো একার সম্পত্তি নয়, তোমার ছেলেকে না শুনিয়ে শান্তি পাচ্ছিলাম না। ভয় হচ্ছিলো আবার কবে আসবে বা উড়াল দেবে ফিরতি ট্রেনে কে জানে। যে অস্থিরমতি ছেলে তোমার। তাই দৌড়ে আসা।
মনোয়ারা স্পষ্টবাদী কিছু ছিলো, কিন্তু এতোটা নয়। আমি অপমানিতবোধ করেছি কিন্তু রেগে উঠতে পারিনি। প্রিয়-প্রত্যাখ্যানের যে তাপ একদিন ওকে দমে দমে বহন করতে হয়েছে সেই জ্বালা এখন আমার বুকে। যে দহন মা নয়, বন্ধু নয় কেউ কমাতে পারে না। এটা ডিসেম্বর অব্দি ভোগ করতেই হবে। ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে জারা চলে আসবে।
পরীক্ষার মধ্যেই জারা জানালো ওর আসা হবে না। এআইটিতে ও একটা চাকরি পেয়েছে। তাছাড়া, সে চলে এলে রকির পাস করে বেরুনো মুশকিল হবে।
অনাহূত আমিই গেলাম বড়দিনের ছুটিতে। জারা এবং রকি পার্টটাইম চাকরি করছে। দুজনে মুখোমুখি ফ্ল্যাট ভাড়া করে আছে। ওদের প্ল্যান ছিলো ট্রেনে করে মালয়েশিয়া ভ্রমণ। দলের সঙ্গে রকি গেল, জারা রইলো। ভয়ংকর রাগ হলো। বল্লাম, চাকরির কি তোমার কোনও দরকার ছিলো? আর কোথাকার কোন রকি পাশ কি ফেল করলো তাতে তোমার কি যায় আসে? উম।
জারা চোখ নাচিয়ে জবাব দিলো, যায় আসে বৈকি, ও ভালো থাকলে আমি ভালো থাকি।
আর আমি যে এদিকে জ্বলে অংগার হয়ে যাচ্ছি।
অত মিন হচ্ছে ক্যানো?
কারণ আমি তোমায় ভালোবাসি।
ভালোবাসার মানুষ ভালো থাকলে তো খুশী হবার কথা।
সে যুগ পাল্টে গেছে।
তার মানে?
ভালোবাসার মানুষ পরকীয়ায় ভালো থাকলে আমি ভালো থাকতে পারি না। তার ভালো থাকা দেখে আমার চোখ টাটায়, বুক জ্বলে, বিষাক্ত হয়ে যায় দিবারাত্রির স্বাদ।
নাঃ স্বীকার করতেই হয় গুলশানের ক্যাসেলে থেকে তুমি অনেক সাহসী এবং পরিপুষ্ট হয়েছে।
কথার ভেতর আইব্রাসে চোখের পাতা লালচে করতে করতে বললো, কি শব্দটা বপ্নে যেনো-পরকীয়া। উম বাংলায় ঐ একটি চমৎকার শব্দ আছে, ছোট্টর ভের যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। হা করি পরকীয়া। স্বাদটা যে নিষিদ্ধ ফল খাবার মতো সর্বনেশে সুন্দর তুমিও তো জান।
আমি?
ইস এরই মধ্যে ভুলে গেলে। মনোয়ারার সঙ্গে বিয়ে না হোক, আমার সঙ্গে প্রেম করার পর যন্ত্রণা সে কি কোনও স্ত্রীর চেয়ে কম পেয়েছিল?
হাবিজাবি কথা রেখে স্পষ্ট বলল কি করতে চাও?
আমার যদ্দিন ভালো লাগবে আমি এমনি জীনযাপন করবো।
তাহলে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়াই তো ভালো।
হোক এক্ষণি।
চোখের পাতায় বাড়তি কয়েকটা পলক ফেলে বললো, যদি তুমি চাও।
মুখে যাই বলি, বুকে জোর পাই না। কি করব সে সিদ্ধান্তেও আসতে পারি না। তবে এটা পরিষ্কার আমার মধ্যে জারার জন্য যে ভালোবাসার গাঢ় অনুভূতি ছিলো, সেটা ফিকে হচ্ছে। ক্ষয় ধরেছে সম্পূর্ণ স্ট্রাকচারে। ভেতরের দাহ, বাইরের অপমান। ঘনিষ্ট বলয়ে ব্যর্থ বিয়ে একটি মজাদার প্রসঙ্গ। মাঝে মাঝে মার সেই কথাই মনে হয়, বিয়ে সমানে সমানে হলে সম্মানের হয়।
ক্রিসমাসের ছুটি সে কাটায় রকির সঙ্গে নাচানাচি করে, আমি নানা রং-এর বোতল টেনে কুঁদ হয়ে পড়ে থাকি অফিসে।
গুমোট পরিস্থিতি হঠাৎ কাটলো যেনো। জারা ফোনে বললো, এ্যাই ইমিগ্রান্ড হয়ে আমি সিডনি যাচ্ছি। এই সুযোগে তোমাকেও আনতে পারি। আসবে?
জানি না ক্যানো রাজী হয়ে গেলাম। মা এবার চোখের পানি ঝরিয়ে ছোট্ট করে বললেন, তবু তো চোখের কাছে ছিলি।
কি করবো আমার কোনও কন্ট্রোল নেই বুঝি নিজের ওপর। জারা এয়ারপোর্টে রিসিভ করলো। দুঘরের সাজানো ফ্ল্যাট। জানালা থেকে নীল সমুদ্র দেখা যায়। বিশ্বের দুর্লভ স্থাপত্য অপেরা হাউসের খানিকটা।
জারা দুরে থাকলে দুশ্চিন্তায় ভুগি। কাছে এলে সব ভুলে যাই। বুঝি না কি ওর মতলব। কুয়েত-ইরাক যুদ্ধের পর এখানকার অর্থনীতির অবস্থা নাজুক। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। ডিগ্রী-মতো কাজ হচ্ছে না। কম্পিউটারের যুগ। সে বিষয়ে নতুন করে পড়ছে কেউ কেউ। ডাল ভাতের ভাবনা আমাদের ছিলো না। এদেশে না খেয়ে কেউ মরে না। বেকার ভাতায় চলে যায়। চাকরির সিকে কখনো ছিড়বে না এমনও নয়। জারা মাস দুই কাটিয়ে বললো, তুমি থাকো। আমি ঢাকা ফিরে যাই।
আসবে তো আবার?
না। তোমার জন্য একটা খুঁতখুঁতি ছিলো। তুমিও বিদেশ বিদেশ করতে। রাস্তা একটা ধরিয়ে দিয়ে গেলাম। এবার নিজে চলবে।
