আমি খুব বিরক্ত হয়েছিলাম। বালক বয়সে যে বাবাকে হারিয়েছি, তাকে নিয়ে আক্ষেপ কিছু ছিলো না। রাজনীতি করতেন। না থাকতেন বেশি ঘরে, না দিতে পারতেন ছোট্ট সংসার চলার মতো টাকা পয়সা। মা মাস্টারী করে যা পেতেন, কষ্টে চলতো। মাথার জোরে বুয়েটের ছাত্র হয়েছিলাম।
সে বছর ছেলেমেয়ের সংখ্যা পঞ্চাশ। জারা গুলশানের মেয়ে। পোশাকে যতো আপটুডেট ঝকমকে ছিলো, মগজে ততো নয়। আমি ওকে ডিজাইনে, মডেলিং-এ বলতে গেলে সব কিছুতেই সাহায্য করতাম। বিয়ের প্রোপোজাল আমিই দিয়েছিলাম। তবে ভালোবাসার কথা ওই প্রথম বলেছিলো। ওর বাবা-মা অমত করেনি। শর্ত শুধু একটি, জারার সঙ্গে গুলশানে থাকতে হবে আমাকে। ওর মা খুব নরোম করে বলেছিলেন, আমাদের বাবা সন্তান বলতে দুটি মেয়ে। ফারাহ বিদেশে। জারাকে বাইরে দিয়ে এত বড় ক্যাসেলের মতো বাড়িতে বুড়োবুড়ি দম বন্ধ হয়ে মরবো।
আমার নয়, আপত্তি ছিলো আমার মাস্টার মায়ের। কিন্তু গ্রাহ্য করাটা বোকামি মনে হয়েছিলো। আরকিটেকচর পাস করার পর ফার্ম খুলে বসলাম। দিনভর এক সঙ্গে থাকা, কাজ করা। মনে হচ্ছিলো পৃথিবীতে দুঃখ বলে কিছু নেই। ঈশান কোণে মেঘ জমছিলো টের পাইনি। এম এস করার জন্য দুজনই এপ্লাই করেছিলাম। এআইটিতে চান্স পেলো জারা। বাবা মার সঙ্গে আমাকে ক্যাসেলে রেখে চলে গেল থাইল্যাণ্ড। প্রথম বছরের ছুটিতে বেড়াতে এলো। স্বপ্ন দেখালো ফিরে এসে আরও জমকালো করবে ফার্মের চেহারা।
ভাবলাম একটাই তো বছর আর। দেখতে দেখতে চলে যাবে।
ব্যক্তিগত কথার চেয়ে জারার চিঠিতে পরের বস্ত্র বেশি জায়গা নিতে শুরু করলো থাইল্যান্ডে ভূস্বর্গ চিয়াংমাই ভ্রমণ, পাতাইয়া, ফুকেত, ফ্যান্টাসিল্যান্ড শ্যায়াম ওয়াটার পার্কের আনন্দময় বিবরণ-জানো জামিল গোল্ডেন ট্রাঙ্গেল চিয়াংমাইতে বেড়াতে গিয়ে দু’চোখের পাতা আর এক করতে পারি না। লালে লাল পপি, নীল সমুদ্র, সবুজ পাহাড়। তবে নিসর্গ তখনি অর্থময় যখন পাশে থাকে একান্ত কাঙ্ক্ষিত কেউ।
চিঠি নয়, অস্থির হয়ে ফোনে জানতে চাইলাম, কাদের সঙ্গে ঘুরছো? বন্ধুদের। দল বেঁধে বেড়াতে যাই গো, দল বেঁধে।
চৈতন্যে মেঘলা আকাশ। শেষের অন্তরঙ্গ টানা সুরটিতে কেটে যেতে দেরি হয় না। কিন্তু তক্ষণি ক্যানো যে চোখ যায় টিভির মাথায় আমাদের বাঁধানো যুগল ছবিটার দিকে। থার্ড ইয়ারে বুয়েট থেকে এসকারশন ট্রিপে আমরা ভারতে গেছিলাম। সেখানকার যে যে শহরে রয়েছে প্রাচীন এবং অতি আধুনিক অট্টালিকা, সেইসব দর্শন ছিল এই ভ্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য। বাঙ্গালোরের চমৎকার এক স্থাপত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা দুজন। খুব ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে। যেন হঠাৎ ঝলকানির মতো মনে পড়লো ঐ ট্যুরের এক শুক্লপক্ষের সন্ধ্যায় আরব সাগরের পাড়ে জারা আমায় ভালোবাসার কথা বলেছিলো। প্রথম ভালবাসার বার্তা নয়ত, মহাকাশ থেকে আসা দুরাপ মদুবাক্য।
পরদিন সকালে আবার দেখা হতে আমি বলিছিলাম, জানো কাল সারারাত আমি শুধু চাঁদ দেখেছি।
কি আশ্চর্য আমিও তো।
আর গুনগুন করেছি, আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়, মনে পড়ে মোরে প্রিয়…
ধাৎ, আমি গেয়েছি লাভ ইজ হেবেন, লাভ ইজ লাইফ।
ঐ একই হলো। যাদের মনের মিল হয় তাদের চিন্তা ভাবনাগুলোও একই দিকে শাখা প্রশাখা মেলতে থাকে।
নো ডিয়ার এটা ঠিক নয়। ভালোবাসা মানে একে অন্যের পদদাস বনে যাওয়া নয়। আমরা দুটি আলাদা মানুষ কিন্তু সবকিছুতে মিল থাকবে এমন ভাবা বোকামি। আসলে তুমি এদ্দিন আমার সঙ্গে আছো মিডল ক্লাস নেচারটা থেকে পুরোপুরি বেরুতে পারছে না। মানে যাকে বলে ফুল এডজাস্টমেন্ট।
নির্মোহ মাপকাঠিতে যুক্তিগ্রাহ্য কথাগুলো আমাকে কেমন কারেন্ট শক খাওয়াতো। কিন্তু মগ্ন আচ্ছন্নতাই জয়ী হতে শেষ পর্যন্ত।
জারার এখনকার জীবন নিয়ে বাঁকা চোখে দেখা মানে রদ্দি ভাবনায় যাওয়া। কিন্তু যা চাই না সেই বলয় ক্রমাগত ধাবমান আমারই দিকে। প্রকৃতির সঙ্গে একজন পুরুষ স্পষ্ট হচ্ছে প্রতি হপ্তার চিঠিতে জানো–জামিল এ বছর আইটিতে জয়েন করেছে। জুনিয়র ব্যাচের রকি। দুর্দান্ত আবৃত্তিকার। নাচে দক্ষ। মে দিবসের জন হেনরীর নৃত্যনাট্যে নাম ভূমিকায় সে, প্রেয়সী স্ত্রীর রোলে জারা। হাতে-গলায়-মাথায় শ্বেত ফুলের মালিকায় অশ্রুময়ী জারা সত্যি যেনো কাঁদছে হাতুড়ি ধরা মৃত স্বামীর জন্য।
ছবিটা দেখতে দেখতে জ্বলি। জ্বলতে জ্বলতে হাতের পিঠে চোখ মুছি। আর সন্দেহ নেই। জারা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।
কোথাও স্বস্তি শান্তি নেই। ব্যাপারটা এমন কাস্ত্রে বন্ধুকেও বলা যায় না চট করে? বড়জোর কেউ বলবে ভুল দেখছি। কেউ করবে বিদ্রূপ।
হঠাৎই মনে পড়লো মাকে। কতোদিন যেতে বলেছেন। কান দেইনি। এখন খুব জরুরী মনে হচ্ছে তার সান্নিধ্য। কিছু উপহার নিয়ে মফস্বলে গেলাম। জিনিসপত্রের দিকে ফিরেও তাকালেন না। শুধু বঙ্গেন, টেলিপ্যাথির ডাক সত্যি শুনেছি। গোলাপবাস আমগাছে এবার এতে ফল এসেছে ঘড়ি ঘড়ি তোকেই শুধু মনে পড়ছে।
কি আশ্চর্য মফস্বলের এই ছোট্ট শহরে ঢাকায় পড়তে যাবার আগে আমার যে একজন ফিয়াসে ছিলো তার কথা একবারও মনে হয়নি। পৌঁছানোর দু’ঘণ্টার মধ্যে মনে করাতে সেই এলো। একটু চটকদার বেশভূষা ছাড়া পরিবক্স তেমন চোখে পড়লো না বল্লো, এদ্দিন পর আমাদের মনে পড়লো।
