-সে একটা যা তা কথা। অনেকেই শুনতে উৎসাহী হল। সৌরভ আর সমরেশকে তারা ঘিরে ধরল, কথাটা জানার জন্য। কেউই বলতে চায় না। অপ্রস্তুত দুজনেই। মাঝখান থেকে শ্যাম বলল, কথাটা তেমন কিছুই নয়। আসলে সৌরভ সস্ত্রীক একটু একা হতে চায় আজ। এবং সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আবার একটা হাসির হররা উঠল ঘরে। অমিতাভের নেভি ব্লু রঙা মারুতিতে সবার আগে উঠে বসেছে শ্যাম। আসার সময় ওর গাড়িতেই এসেছে ওরা। একটু পরেই অমিতাভ আর কল্পনা উঠল গাড়িতে। শ্যাম জানলা দিয়ে সকলকে বিদায় জানাচ্ছে আবার তাড়াতাড়ি দেখা হওয়ার একটা উপলক্ষ খুঁজতে বলছে বন্ধুদের। শিবাজী আর সমরেশদের গাড়ি দুটো এগিয়ে গেল। অমিতাভ ওর গাড়ি স্টার্ট করতে গিয়েই নজর করল, দীপা নেই গাড়িতে। কল্পনাই দেখল দীপাকে প্রথম। একটু দূরেই সামান্য আলাদা হয়ে ও দাঁড়িয়ে। শ্যামও দেখল তারপর তার বউকে। রোগা হাত বার করে হাতছানি দিয়ে ডাকল ওকে। রসিকতা করল সামান্য, বলল, এ কী হল? থেকে যাচ্ছ না কি? উত্তরে দীপা সামান্য হাসল। বলল, একেবারে ভুলে গেছ? কী কথা ছিল ফেরার সময়? ছোট মাসির বাড়ি ঘুরে যাব না?
শ্যাম ধরতেই পারল না দীপার চালটা। সে সরলভাবে জিজ্ঞেস করল, সে আবার কী? এখন বারুইপুর যাবে? এমন কথা আবার কখন হল? অমিতাভ এবং কল্পনা দুজনেই বলল, আজ থাক না দীপা। অন্য আর এক দিন না হয় এসো। দীপা বলল, তোমরা কিছু মনে কোরো না। এতখানি এসে ছোটমাসিকে না দেখে ফিরতে ইচ্ছে করছে না। ওঁর শরীর খুব খারাপ।
অগত্যা ব্যাজার মুখে শ্যামকে নামতেই হয়। কোনও মানে হয়? কথাটা দুবার বলল শ্যাম। সৌরভ আর অনিন্দিতা তখনও ওখানে দাঁড়িয়ে। অমিতাভ শ্যামকে বলল, আরে ব্যাটা নামলি কেন? তোদের স্টেশনে ড্রপ করে দিচ্ছি। শ্যাম ফের। গাড়িতে উঠতে যেতেই বাধা দিল দীপা। বলল, না, না, এটুকু রাস্তা হেঁটেই যাব। ভীষণ ভাল লাগছে। সৌরভ হাসল কথাটা শুনে। বলল, আজ চারদিকে বেশ প্রেমের হাওয়া বইছে। নরেন্দ্রপুর স্টেশনে দীপা আর শ্যাম বসে আছে। বারুইপুর নয়, বালিগঞ্জের টিকিটই কেটেছে শ্যাম দীপার কথামতো। এবং এতটা পথে দীপা এই একটা কথাই বলেছে। শ্যাম বেশ বুঝতে পারছে দীপার মন বজ্রগর্ভ মেঘে ছেয়ে গেছে। এখন ঘন বিদ্যুৎ চমকাবে আর বজ্রপাত হতে থাকবে। সারাটা দিনের জমা আনন্দ ধুলো কাদায় নষ্ট হয়ে যাবে।
আড়চোখে সে বউকে দেখে তাই বারবার। চা খাবে। ঝড় জলের পূর্বাভাস বুঝতেই শ্যাম প্রশ্নটি করে। দীপা কোনও উত্তর দিল না। বেশ বাড়িটা হয়েছে কিন্তু সৌরভদের তাই না? নিখাদ, নির্ভেজাল, সরল এবং অকপট একটি বাক্য শ্যাম প্রায় স্বগতোক্তির মতোই বলে। তোমার ভাল লেগেছে? ঠাণ্ডা আইসক্রিমের মতো মোলায়েম স্বর দীপার। মেঘ বুঝি তা হলে কাটল। খুশি হয় শ্যাম, দীপার পাশে সাহস করে আরও একটু ঘন হয় সে। এক কথায় অনবদ্য। আমার তো ফিরতেই ইচ্ছে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছি থেকে যাই।
–থাকলে পারতে।
—আরে সৌরভ তত বারে বারে বলছিল, অন্তত তোরা দুজনে আজ রাতটা এখানে কাটিয়ে যা।
–কাটালে না কেন?
—না-না, তা কী করে হয়! ওদের গৃহপ্রবেশের দিন আজ। তবে হ্যাঁ। ওরা তো এখানে থাকবে না সবসময়। সৌরভ তাই বলছিল আমাকে, মাঝে মাঝে এখানে এসে থাকতে পারিস শ্যাম, লিখতে টিখতে তো শুনি ফাঁকা আর নিরিবিলি জায়গার দরকার হয়। যখন ইচ্ছে হয় আসিস।
—আসবে নিশ্চয়ই। শ্যাম বুঝতে পারছে না দীপা কোনদিকে আলোচনাটা নিয়ে যেতে চায়। মনে হচ্ছে উগ্রপন্থী হানা একটা হবে এবার। শ্যামের কোনও বেফাস কথাকে বাগে পেলেই কথার মেশিনগান চালিয়ে ঝাঁঝরা করে দেবে দীপা। শ্যাম তাই সভয়ে চুপ করে থাকে।
আজ রব্বিার। কিছু গাড়ি বাতিল বোধ হয় আজ। বালিগঞ্জের ট্রেন আসতে তাই দেরি হচ্ছে। বারুইপুরের দিকে একটা প্রায় জনশুন্য ট্রেন চলে গেল। আর তখনই হাঁদারামের মতো কথাটি পাড়ল শ্যাম এবং দীপার আক্রমণের পাল্লার মধ্যে পা দিল। খুবই আন্তরিকভাবে বলল, বারুইপুরে যেতে চাইছিলে, ঘুরে গেলেই হত। কলকাতার গাড়ি কখন আসবে কে জানে? অমিতাভর গাড়িতে গেলে এতক্ষণে বাড়িই পৌঁছে যেতাম। দীপা একটু নড়ে চড়ে বসল। শ্যামের দিকে অপলক দৃষ্টি তার। প্ল্যাটফরমের বিষণ্ণ আলোতে দীপার চোখ দেখল শ্যাম, বুঝল দীপার মেশিনগান রেডি। ট্রিগারে আঙুল রেখে বসেছে সে। শুধু সময়মতো টেনে দেওয়ার অপেক্ষা। পরের গাড়ি আর পরের বাড়ি দেখে আর কতদিন এ ভাবে আহাদে আটখানা হবে? কত বয়স হল তোমার খেয়াল আছে? শ্যাম মরিয়া হয়ে একটা চা ওলাকে ডাকল চেঁচিয়ে। যতক্ষণ লোকটার সঙ্গ পাওয়া যায় দীপাকে আড়াল করতে। চা-ওলা কাছে এল ধীর পায়ে, চা গরম হবে ভাই? শ্যাম জানতে চায় একটু আগে বানানো, নিস্পৃহ জবাব দেয় লোকটা। বাঃ, দাও তো ভাই একটা। তোমার বাড়ি কতদূর? এখানেই? চা-ওলাটা বেরসিক। ভাড়ে চা ঢালতে লাগল সে ভাবলেশহীন ভাবে। শ্যামের প্রশ্ন শোনার কোনও ইচ্ছে নেই তার। ভাড়টা শ্যামের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, একটাকা। শ্যাম চায়ে চুমুক দেয় শব্দ করে। তারপর লোকটাকে জিজ্ঞেস করে বালিগঞ্জের গাড়ির কোনও খবর আছে নাকি? জানি না, শ্যাম দ্বিতীয় চুমুকটি দিয়ে ভাবে এরপর তার কী করা উচিত হবে? চা-ওলা দাঁড়িয়ে আছে পয়সার প্রতীক্ষায়। শ্যাম দিচ্ছি দেব করছে দেখে দীপা তার হ্যাম্ব্যাগ খুলছে। একটা কয়েন বার করে লোকটাকে দিতেই সে শ্যামকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত করে দিয়ে চলে যায়। এবং দীপা আবার নতুন উদ্যমে ফিরে আসে রণক্ষেত্রে।
