পরের বাড়ি দেখতে আর গাড়ি চড়তে খুব আহাদ না? আমার তো লজ্জায় মাথা কাটা যায়। মুখ দেখাতে ইচ্ছে করে না কোথাও। তার গল্পের নায়ক নায়িকাদের মুখে সংলাপ বসাতে শ্যামের কখনও অসুবিধে হয় না। কিন্তু দীপার কথার পিঠে কথা বসানো ভারী হুজুরে ব্যাপার, মিনমিন করল শ্যাম বন্ধুরা কি পর? ওরা কত ভালবাসে আমাকে তা জান?
ওই আনন্দেই থাকো। ওদের করুণাকে তোমার ভালবাসা মনে হয়। ওদের পাশাপাশি তোমার কতটা দাঁড়ানোর যোগ্যতা হিসেব করেছ কখনও? দীপার গলায় বেশ একটা নাটকীয় ব্যাপার আছে। নানা অভিব্যক্তি চমৎকার ফোটে। গলার রেঞ্জ বেশ শক্তিশালী। এত কথা বলছে, তবু সুর বাধা এমন স্কেলে যে শ্যাম ছাড়া সে কথা। আর কারও কানে পৌঁছবে না। পৌঁছলে ভারী লজ্জা পেত শ্যাম। বেশ কিছু লোকজন জমে গেছে ইতিমধ্যে প্ল্যাটফর্মে। তবে তারা কেউই নজর করছে না ওদের।
খোলা উদোম প্ল্যাটফর্মে উত্তরে বাতাস বয়ে যাচ্ছে অবিরল। শ্যামের একটি হাফহাতা সোয়েটার। হাতের দু’চেটো ঘষতে ঘষতে দীপাকে প্রশ্ন করল, তোমার শীত করছে না দীপা? সামান্য চেষ্টা, যদি অন্যমনস্ক হয় এতে। কিন্তু দীপার আক্রোশ এখনও কমেনি। দক্ষ টেবিল টেনিস খেলোয়াড়ের মতোই সে শ্যামের প্রতিটি কথাকে স্ম্যাশ করতে থাকে। না। দাঁতে প্রায় দাঁত দিয়ে বলল ও। আমার কোনও বোধই আর নেই শুধু দুটো ছাড়া। লজ্জা আর ঘেন্না। লজ্জা এই হাঘরে অবস্থার জন্য। আর ঘেন্না করি তোমাকে। নিষ্কর্ম, উদ্যমহীন আহম্মক কোথাকার। বন্ধুদের পা চেটে কতদিন আর কাটাবে?
চা শেষ হয়ে গেছিল। ভাড়টা দুরে ছুঁড়ে দেয় শ্যাম। শান বাঁধানো প্ল্যাটফর্মে পড়েও ভাঙল না, একটা কুকুর এসে চাটতে লাগল সেটা। দৃশ্যটা দেখে মনে বল। আসে। সামান্য মাটির ভাঁড়। কিন্তু আঘাত সয়ে নিল দিব্যি। দীপার রাগ কিংবা গজরারি সময় শ্যামের মাথায় চিন্তার মিছিল চলে। যে গল্পের নামকরণ হয়নি, সে গল্পের নাম খোঁজে। দীপা আর পাপুনের অভাব অভিযোগ মেটানোর রাস্তা তৈরি করে। বন্ধুদের সমস্যার কথা ভাবে। ভাবে শাকউলি-মাসির মেয়ের বিয়েতে কিছু টাকা সে ধরে দেবে। এরকম সময় তার এইসব ভাবনা চিন্তার সুইচ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কার্যকর হয়ে ওঠে।
.
ও বোঝে দীপার কথা তাকে সইতেই হবে। দীপা কি সহ্য করে না? সারাদিন ওই দেড়কামরার বাড়িতে মুখ গুঁজে থাকা। হাত-পা খেলানোর জায়গা নেই। কোনও বিনোদন নেই। নেই অহঙ্কার দেখানোর মতো কোনও কিছুই, প্রতি মুহূর্তে সে লোকসমাজে কুণ্ঠা, জড়তা আর অস্বস্তির শিকার হয়। এর মূলে শ্যাম নিজেই কি নয়?
—অনিন্দিতাই বলল আমাকে খাওয়ার সময়, এবার তোমরাও কিছু করো একটা। তোমাদের থাকার মতো সুন্দর একটা বাড়ি হলে, আমাদেরও ভাল লাগে। অনিন্দিতার কথাগুলি বেশ মোলায়েম ভাবে ওর মতো করেই বলল সে। শ্যাম ভাবল দীপা স্বাভাবিক হচ্ছে। ভাবাসে তো, তাই ওরা ভাবে যে আমার জন্য, দরদ মাখা কথা শ্যামের। দীপা ফের ফিরে গেল তার নিজস্ব রেঞ্জে। কেন? কেন এসব কথা আমি শুনব? বাড়ি করার ভার আমার? তোমার মতো কেরানির চাকরি করে আর কেউ বাড়ি করছে না? তোমারই হয় না কিছু। লোকের কাছে ভাল সেজে থাকা। আর ছেলে বউ-এর ব্যাপারে উদাসীন। তোমাকে স্পষ্ট বলছি, আমার এই শেষ। এরপর থেকে তোমার কোনও বন্ধু বা তার বউদের মুখদর্শন করব না আমি, ওদের বড়লোকি আমার অসহ্য লাগে।
শ্যামকে বাঁচাতে ট্রেন আসছে অবশেষে। কুয়াশার ভিতর দিয়ে হলদেটে আলো দেখা গেল। শ্যাম উঠে পড়ে জায়গা ছেড়ে। দীপাও এগোল ওর পাশে পাশে। রাতে কিছু খেল না শ্যাম। বলল, খিদে নেই। ছেলের সঙ্গে জমে গেল দিব্যি গল্পে। নতুন বাড়ি। খাওয়া দাওয়া এবং নানা লোকজনের বর্ণনা দিল গুছিয়ে। দীপা রান্নাঘরে যাচ্ছে আবার ঘরে ফিরে এসে টুকিটাকি কাজ সারছে, শ্যাম আড়চোখে দু’একবার দেখেছে ওকে। তোম্বা ভাবটা কাটছে না মোটে। আজ আর কথাবার্তা হবে না। কালকেও হবে কি না সন্দেহ। আসলে খুবই মনে লেগেছে। ওর মন ভাল করে দিতে চাই একটা ছোট্ট বাড়ি। পারবে না শ্যাম, অফিস নোন, দুচারটে গয়না, এতে হয় না একটা বাড়ি? কাল অফিসে গিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখবে। অনেকেই তো করছে। পৃথিবীটা দেখতে দেখতে বাড়িতে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। কত অজস্র সাজানো আলো ঝলমলে দোকানপাট। কত ভোগ্য সম্ভারের হাতছানি রাস্তায় বেরোলে। পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, মানুষ বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারা ব্যতিক্রম হয়ে থাকবে চিরকাল? একটা প্রতিজ্ঞার ছাপ ফোটে শ্যামের মুখে।
মাঝ রাতে ঘুম ভাঙল দীপার। তেষ্টা পেয়েছে। বিছানা ছেড়ে উঠতে গিয়ে সে দেখে শ্যাম নেই। শোওয়ার আগে ওকে ছেলের ঘরে বসে বই পড়তে দেখেছিল। এখনও পড়ে যাচ্ছে বোধহয়। জল খেয়ে সে উঁকি মারল পাশের ঘরে। আলো জ্বলছে, ছেলে ঘুমিয়ে আছে কাদা হয়ে। পাশে ঘেঁষাঘেষি করে তার বাবা। গায়ের কম্বল সরে গেছে। মাথার কাছে ভোলা খাতা। বালিশে বুক দিয়ে উপুড় হয়ে অঘোর ঘুমচ্ছে লোকটা? অভ্যেস যাবে কোথায়? এত গালমন্দ তবু ঠিক লিখতে বসেছিল। ঘুমন্ত শ্যামের অসহায় চেহারা দেখে হঠাৎই মায়া হয় দীপার। এত খারাপ কথা রাগারাগি তু সবকিছু নীরবে মেনে নেয় লোকটা। সাবধানে খাতাটা তুলে নেয় দীপা। কিছুটা আঁকিবুকি কেটে অভ্যেস মতো একটা গল্প শুরু করেছে শ্যাম। আগ্রহ নিয়ে পড়তে শুরু করল ও। মাত্রই একপাতা লেখা। শুরুটা করেছে এ এইভাবে। একটা নতুন বাড়ি দেখলেই মানুষের মন ভাল হয়ে যায়। সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু মেয়েটির ব্যাপারে ঘটলো ঠিক উলটো টা। ওদের সবাইকে রান্নাঘরটা… পড়া শেষ করে কম্বলটা শ্যামের গায়ে চাপা দিয়ে বাতিটা নিভিয়ে দিল ও। তারপর ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। শ্যামের জন্য মাঝরাতে এক অদ্ভুত গর্ব অনুভব করে দীপা। এ গর্বের ভাগ সে কাউকে দিতে চায় না। এ তার একান্ত নিজস্ব।
লজ্জা – রবিন দে
আজকালকার দরজায় ল্যাচ্-কি লাগানো একটা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুবিধে আছে। কোথাও যেতে আসতে গেলে টুক করে টেনে দিলেই দরজা বন্ধ।
