‘একি খাচ্ছ না কেন?’ সৌরভ নিজে হাজির হয়ে জিজ্ঞেস করল দীপাকে। দীপা হাসল বলল, ‘খাচ্ছি তো মশায় চেয়ার ছেড়ে উঠিনি তো এখনও। তবে আয়োজন যা করেছেন, তাতে শেষ পর্যন্ত কী হবে কে জানে?’
—মাছটা বেশি করে খাও, এক্সপোর্ট কোয়ালিটি। সায়েবদের পেটেই যেত। আমার খুব পরিচিত বলে জোগাড় করেছি। সৌরভের কথা শুনে হাসল দীপা। মাছটা ভাঙল একটু। সামান্য মাছ মুখে তুলতে গিয়ে ওর চোখ পড়ল ভীষণ দর্শনার দিকে। দুটো চিংড়ি নিয়েছে পাতে। এর মধ্যেই প্লেটে মুর্গির হাড় আর চিংড়ির ছিঁড়ে এত জমা হয়েছে পাতে, দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা প্লেন ক্রাশ হয়েছে বুঝি। আবার শ্যামকে দেখে সে। এমন মাছ কি জীবনেও খেয়েছে লোকটা? গোটা মাছ প্রায় আতই পড়ে আছে বকবকানি চলছে অনর্গল। দীপার পাশে বসলে ও ঠিক মাছটা ওকে খেয়ে নিতে বলত।
খাওয়ার পর পান বুিচ্ছিল অনিন্দিতা। চাপা ঠোঁট খুব লাল হয়েছে। মেয়েটা বড়ো সুন্দর। টুকটুকে ঠোঁট ফাঁক করে কথা বলতে গিয়েই সামলে নিল। অভ্যেস নেই। পানের পিক পড়ছিল আর একটু হলেই। কোমরের চাবি আর হারে চুরি শব্দ তুলে দৌড়ে গেল ও বেসিনের দিকে। ছেলেবেলার কথা হঠাৎ মনে পড়ল দীপার, ঠাকুমা বলত, ‘পান খেয়ে যে মেয়ের ঠোঁট যত বেশি লাল সে তত বেশি সুখি হবে।‘ ছেলেবেলায় পান মুখে নিলেই তাই ও দাঁড়িয়ে দেখত নিজেকে আয়নায়। এই মুহূর্তে দীপা নিজের ঠোঁটের রঙ দেখতে পাচ্ছে না। তাই সে অন্যদের পান খাওয়া ঠোঁট দেখতে কৌতূহলী হল। না, অনিন্দিতার মতো আর কাইকেই লাগছে না।
পানের পিক সামলে অনিন্দিতা এল। বেশ সুখের মেদ জমেছে ওর। দিনে দিনে যেন আরও ফর্সা হচ্ছে ও। অনিন্দিতা জনে জনে জিজ্ঞেস করতে লাগল, সকলে ভাল করে খেয়েছে কি না। প্রত্যেকেই খাবারের প্রশংসা করল। ওদের এলাহি আয়োজনের সুখ্যাতিও হল এর সঙ্গে। অনিন্দিতার মুখে একটা তৃপ্তির ছবি ফুটল। বলল, যাক শেষ অবধি সব ভালয় ভালয় মিটল।
দীপা জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা তো নিটে রাত এ বাড়িতে কাটাবে? একটা নিয়ম আছে না সেরকম?’
হ্যাঁ শাশুড়ি বলছিলেন। দেখি কি হয়। সমরেশের স্ত্রী ভাল গান গায়। টিভি প্রোগ্রাম হয়ে গেছে কয়েকবার। নিজেকে খুব গুটিয়ে রাখে মেয়েটা। ওর স্বামী আই আর এস. কাস্টমসের ডেপুটি কালেক্টর। স্বামীর চাকরি নিয়ে একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব আছে ওর। ওর গান শোনানোর কথা ছিল আজ। হয়নি। অনিন্দিতা দুঃখ প্রকাশ করল তাই। বলল, শীত থাকতে থাকতে এ বাড়িতেই একটা গানের আসর বসাব। তোমার একক সঙ্গীত অনুষ্ঠান হবে সেদিন। সমরেশের স্ত্রী জয়তী বলল, বাঃ ভুলে গেলে? ও অফিসের থেকে একটা ট্রেনিং-এ স্টেটসএ যাচ্ছে না। তিনমাসের জন্যে? কেউ পায় না এই চান্স। বড় কর্তা খুব ভালবাসেন বলেই ওর যাওয়াটা হচ্ছে। আর সঙ্গে আমিও।
তোমার বুঝি এই প্রথম বিদেশ যাওয়া?
অমিতাভের স্ত্রী কল্পনার প্রশ্ন।
সবাই জানে ব্যবসা বাড়াতে অমিতাভ প্রায়ই ফরেন টুর করে। কল্পনাও গেছে বেশ কয়েকবার ওর সঙ্গে। স্টেটস-এর প্রসঙ্গ ও-ই নিয়ে এল আরও জোরদার ভাবে। ওরা চারজনেই এক সঙ্গে এরপর স্টেটস-এর আলোচনায় যোগ দিল প্রাণ মন ঢেলে। দীপারই শুধু কিছু বলার নেই। সে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসে ফের দাঁড়াল ব্যালকনিতে। ব্যালকনিতে এখন পড়ন্ত রোদের আলো। শীতের শেষ বেলার সূর্য কী নরম, কত মায়াময়। অথচ এই সূর্যই কয়েক মাস পর এসে ছারখার করতে থাকবে সব কিছু। অসহ্য গরম আর প্যাঁচপেচে ঘাম। দীপাদের বাড়ির তিনটি প্রাণীই তখন ভুগবে ঘামাচিতে। তারপর আসবে বর্ষা। শরৎ এবং শীতও আসবে পালা করে পরপর। যেন মানুষের জীবন। সুখ, দুঃখ প্রেম, ঈশ্বৰ্য্য, অহঙ্কার এসবই মানুষের জীবনে আসে আর যায়, ঠিক ঋতুর মতোই। দীপা খুব দ্রুত ভেবে যাচ্ছিল এই সব নিয়ে। আর শেষমেষ সে সিদ্ধান্তে এল, তার জীবনটা কাটল শুধুই খরতাপের ভির।
ঘনালে মেঘ, না হল বর্ষা, না এল শীরে কুয়াশা। চারপাশের এই আনন্দ আর সুখের মাঝে নিজেকে বিষম রকম বেমানান লাগল তার। বুকে একটা চাপ বাধা কষ্ট। কোথাও গিয়ে একটু গড়িয়ে নিলে হত। কিন্তু কোনও ঘরে ঢুকতে তার একেবারেই ইচ্ছে করছে না। শ্যামকে বহুক্ষণ দেখছে না দীপা। একবার দেখতেও এল না, দীপা কী করছে। বকে চলেছে নিশ্চয়ই। পারেও বটে। বকে বকেই জীনটা উচ্ছন্নে গেল নিজের। ভবিষ্যতের কথা ভাবতে বয়ে গেছে তার। বন্ধুদের দেখেও কি তার একটু ভালভাবে বাঁচতে ইচ্ছে করে না? চাকরি কমজোরি, টিউশনি করেও তো বহুলোক অবস্থা ফেরায়। লাজলজ্জাহীন মানুষটার সে ইচ্ছেই নেই। হয় বই নয় খাতা কলম-এর বাইরে ওর আর কোনও চাওয়া পাওয়া নেই। শ্যামের প্রতি অন্ধ আক্রোশে দীপার সারা শরীর জ্বালা করে ওঠে। বাইরে আরও অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। শ্যামের হঠাৎ ঘড়ি দেখার সময় হল। আন্তরিকভাবে সে সকলকে বলল, ‘এবার বেরিয়ে পড়তে হয়। বাড়িতে বাচ্চরা অনেকক্ষণ একা আছে। সৌরভের ইচ্ছে আরও এক রাউন্ড করে চা হোক। কিন্তু মেয়েদের কাছ থেকে তেমন সাড়া না পেয়ে ওরা ধীরে ধীরে আড্ডার জায়গা থেকে উঠতে লাগল। সৌরভের দু’এক জন আত্মীয় আর চার বন্ধু ছাড়া সকলেই চলে গেছে। সমরেশ সৌরভের কানে কী একটা গুনগুনিয়ে বলতেই সৌরভ হই হই করে উঠল। অনিন্দিতা শোন। শুনে যাও, সমরেশ হারামজাদাটা কী বলছে। ‘ অনিন্দিতা সামনেই ছিল। ও চেঁচাল কী বলছে গো?’
